ঢাকা: গাজীপুরের জয়দেবপুর থেকে পাবনার ঈশ্বরদী পর্যন্ত মিশ্র গেজ ডাবল লাইন নির্মাণে অর্থায়ন করতে আগ্রহ দেখিয়েছে জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সি (জাইকা)। এরইমধ্যে প্রকল্পটি দুইধাপে বাস্তবায়নের কথা জানিয়েছে সংস্থাটি। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, বিষয়টি নিয়ে জাইকার সঙ্গে আলোচনা চলছে। চূড়ান্ত হলে চুক্তির প্রক্রিয়া শুরু করা হবে। পাশাপাশি আখাউড়া থেকে সিলেট পর্যন্ত মিশ্র গেজ লাইন নির্মাণ প্রকল্পে অর্থদাতা খোঁজা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন তারা।
রেলপথ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০১৮ ও ২০১৯ সালে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) বৈঠকে অনুমোদন পায় জয়দেবপুর-ঈশ্বরদী ডুয়েলগেজ ডাবল রেললাইন নির্মাণ এবং আখাউড়া- সিলেট সেকশনের মিটারগেজ লাইনকে ডুয়েলগেজ লাইনে রূপান্তর করা এই দুই প্রকল্প। প্রকল্প দুইটির প্রস্তাবিত ব্যয় ছিল ৩০ হাজার ৩০৫ কোটি টাকা। এরমধ্যে জয়দেপুর-ঈশ্বরদী ডাবল লাইন নির্মাণ প্রকল্পে ১৪ হাজার ২৫১ কোটি টাকা এবং আখাউড়া- সিলেট ডুয়েলগেজ প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছিল ১৬ হাজার ১০৪ কোটি টাকা।
সূত্রে জানা যায়, প্রকল্প দুটি চীন সরকারের ঋণে বাস্তবায়নে জিটুজি পদ্ধতিতে চুক্তি স্বাক্ষর হয় এবং চীনের দুইটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানও নিয়োগ করা হয়। কিন্তু কাজ শুরুর আগে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে করা তদন্তে এই দুই প্রকল্পে বাড়তি ব্যয়ের বিষয়টি সামনে এলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দুই প্রকল্প থেকেই ব্যয় কমানোর নির্দেশ দেন। সে নির্দেশনা মেনে রেলপথ মন্ত্রণালয় ব্যয় যৌক্তিকিকরণ কমিটি গঠন করে।
সূত্রমতে, জয়দেবপুর-ঈশ্বরদী মিশ্র গেজ ডাবল লাইন প্রকল্পের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চায়না সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং কনস্ট্রাকশন করপোরেশন- সিসিইসিসি নিয়োগ করা হয়। প্রতিষ্ঠানটি প্রতি কিলোমিটার রেললাইন নির্মাণে প্রায় ৬১ কোটি টাকা ব্যয় নির্ধারণ করে দেয়। আর আখাউড়া-লাকসাম পথে ব্যয় ধরা হয় কিলোমিটার প্রতি ১৯ কোটি টাকা।
রেলপথ মন্ত্রণালয় বলছে, জয়দেবপুর- ঈশ্বরদী প্রকল্পে প্রতিটি সরঞ্জামের মূল্য প্রতিবছর ২৫ শতাংশ হারে খরচ বাড়বে ধরে ব্যয় নির্ধারণ করা হয়। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা পেয়ে যৌক্তিকিকরণ কমিটি তা ১০ শতাংশ করার প্রস্তাব করে। আর এতে ১ হাজার ৮৫ কোটি টাকা প্রকল্প খরচ কমে যায়। রেল কর্তৃপক্ষ অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) মাধ্যমে চীন সরকারকে ব্যয় কমানোর বিষয়টি জানিয়ে গত বছরের ১৭ জানুয়ারি চিঠি দেয়। এরপর কয়েকদফা আলোচনা ও চিঠি চালাচালির পর গত বছরের ২৪ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ সরকারের এই প্রস্তাবে কাজ করতে পারবে না বলে জানিয়ে দেয় চীনের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান।
অন্যদিকে আখাউড়া-সিলেট মিশ্র গেজ রেললাইন নির্মাণ প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয় ১৬ হাজার ১০৪ কোটি টাকা। এরমধ্যে মূল নির্মাণকাজের জন্য ১২ হাজার ৭৯ কোটি টাকা। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার পর যৌক্তিকীকরণ কমিটি ঠিকাদারের অংশ থেকে ৩ হাজার ৩৫৪ কোটি ৩১ লাখ টাকা ব্যয় কমানোর প্রস্তাব করে। এ প্রকল্পে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চায়না রেলওয়ে কনস্ট্রাকশন ব্রিজ ইঞ্জিনিয়ারিং ব্যুরো গ্রুপ কোম্পানি লিমিটেড (সিআরবিজি) প্রতি কিলোমিটার রেললাইন নির্মাণে ব্যয় ধরে দেয় ৫০ কোটি ৫১ লাখ টাকা। যৌক্তিকীকরণ কমিটি এখানেও কমিয়ে প্রস্তাব করে।
বাড়তি ব্যয়ের বিষয়টি সামনে এলে পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগ গঠিত কমিটি প্রকল্প ব্যয় বিশ্লেষণ করে দুই প্রকল্প থেকে ৪ হাজার ৮৫০ কোটি টাকা কমানোর প্রতিবেদন দেয়। ওই প্রতিবেদন আমলে নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রকল্প দুটি থেকে ব্যয় কমানোর নির্দেশনা দেন। এরপরই চীনা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান অর্থায়ন থেকে সরে দাঁড়ায়। এদিকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নির্দেশনা পাওয়ার পর ওই দুই প্রকল্পের জন্য অর্থসহায়তা পেতে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগকে অনুরোধ জানায় রেলপথ মন্ত্রণালয়। সরকার চীনের বিকল্প অর্থায়ন খোঁজা শুরু করলে একটি প্রকল্পে জাপান সরকারের প্রতিষ্ঠান জাইকা অর্থায়ন করতে আগ্রহ প্রকাশ করে।
এ প্রসঙ্গে রেলপথ মন্ত্রী নূরুল ইসলাম সুজন সারাবাংলাকে বলেন, প্রকল্প থেকে ব্যয় কর্তনের পর চীন চূড়ান্তভাবে জানিয়ে দিয়েছে অর্থায়ন করবে না। এরপর জাইকা আগ্রহ দেখিয়েছে। এটা নিয়ে জাইকার সঙ্গে প্রাথমিক আলোচনা হয়েছে। তারা একটা প্রকল্প দুইধাপে বাস্তবায়ন করতে চায়। প্রথম ধাপে জয়দেবপুর থেকে বঙ্গবন্ধু রেল সেতু পর্যন্ত এবং ঈশ্বরদী পর্যন্ত বাকি অংশ দ্বিতীয় ধাপে বাস্তবায়নের প্রস্তাব দিয়েছে। আমরা বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়কে জানিয়েছি। বিষয়টি এখনো চূড়ান্ত হয়নি।
এদিকে জয়দেবপুর থেকে ময়মনসিংহ হয়ে জামালপুর পর্যন্ত মিশ্র গেজ ডাবল লাইন নির্মাণ প্রকল্প বাস্তবায়নেও চীনা ঠিকাদারের সঙ্গে ব্যয় নিয়ে আলোচনা চূড়ান্ত হয়েছিল।
রেলপথ মন্ত্রণালয় সূত্র বলছে, এই তিন প্রকল্পের অর্থায়ন, ঠিকাদার নিয়োগের শর্ত, ব্যয় নির্ধারণ প্রক্রিয়া একই রকম ছিল। ফলে একটি প্রকল্প থেকে সরে গেলে অন্যগুলো নিয়েও অনিশ্চয়তা দেখা দেয়। এ প্রসঙ্গে রেলপথ মন্ত্রী বলেন, যেহেতু ওই প্রকল্প থেকে চীন সরে গেছে সেহেতু এটি নিয়েও আমাদের নতুন করে ভাবতে হবে।
উল্লেখ্য, ২০১৬ সালের অক্টোবরে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এর ঢাকা সফরের সময় ২৭টি প্রকল্প বাস্তবায়নে দেশটির সঙ্গে সমঝোতা চুক্তি সই করে সরকার। ওই ২৭ প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয় প্রায় ২২ বিলিয়ন ডলার। এরমধ্যে জয়দেবপুর- ঈশ্বরদী, আখাউড়া- সিলেট প্রকল্পও ছিল। প্রকল্প দুইটিতে ৮০ থেকে ৮৫ শতাংশ ব্যয় চীনের বহন করার কথা ছিল। আর জমি অধিগ্রহণ, পুনর্বাসন ও স্থানীয় ব্যয় হিসেবে বাকি অর্থায়নের কথা ছিল বাংলাদেশের। ঋণ চুক্তি শর্ত অনুযায়ী প্রকল্প দুইটিতে উন্মুক্ত দরপত্রের সুযোগ না থাকায় জি টু জি ভিত্তিতে চায়না সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং কনস্ট্রাকশন কোম্পানি – সিসিইসিসি এবং চায়না সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং কনস্ট্রাকশন কোম্পানি- সিআরবিজি ঠিকাদার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।