চট্টগ্রাম ব্যুরো: ফেসবুকে পেজ খুলে নিজেকে সাংবাদিক পরিচয় দেওয়া কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা উচিত বলে মত দিয়েছেন শিক্ষা উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল। ‘সংবাদপত্র ও সাংবাদিকতার নীতি-নৈতিকতা বিত্তশালীদের কাছে বন্দি হয়ে যাচ্ছে’ বলেও আক্ষেপ করেছেন তিনি।
বৃহস্পতিবার (২৩ সেপ্টেম্বর) চট্টগ্রাম সাংবাদিক ইউনিয়ন (সিইউজে) আয়োজিত চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের ব্যবস্থাপনা কমিটির সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল বলেন, ‘সাংবাদিক সমাজের জন্য দীর্ঘমেয়াদে সরকারকে চিন্তা করতে হবে। অনিয়ন্ত্রিত এবং অনিবন্ধিতভাবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে, ফেসবুকে পেজ খুলে সাংবাদিক পরিচয় দেওয়ার একটি প্রবণতা তৈরি হয়েছে। যেখানে-সেখানে সাইনবোর্ড লাগিয়ে সংবাদমাধ্যম বলা হচ্ছে— আদৌ সেখানে সাংবাদিকতার যে মান, সেটা রক্ষা হচ্ছে কি না, রাষ্ট্রকে অবশ্যই এসব বিষয় কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।’
তিনি বলেন, ‘বড় বড় শিল্প প্রতিষ্ঠানের মালিকরা সংবাদপত্রের মালিক হয়ে নীতি-নৈতিকতা নিয়ন্ত্রণ করছে। হাজার হাজার কোটি টাকার মালিক, যার গাড়ি-বাড়ি আছে, তারাই সংবাদপত্রের মালিক বনে গিয়ে সংবাদমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ করবেন এই প্রভাব থেকে সংবাদমাধ্যমকে মুক্ত করতে হবে। প্রতিবেশী দেশেও ৪৯ শতাংশের বেশি মালিকানা উদ্যোক্তাদের দেওয়া হয় না।’
‘বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যম এখনও প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় অর্থনৈতিকভাবে অনেক পিছিয়ে। এর কারণ দেশের গণমাধ্যম পুরোপুরি বিজ্ঞাপন নির্ভর। অথচ প্রতিবেশী দেশেও মিডিয়া, বিশেষ করে ইলেকট্রনিক মিডিয়াগুলো সাবস্ক্রিপশন ফি আদায় করে এর একটি অংশ সাংবাদিকদের দিতে পারছে। সাংবাদিক নেতৃবৃন্দ, আপনারা তথ্যমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করুন। সারাপৃথিবীতে সাবস্ক্রিপশন বেজড মিডিয়া থাকতে পারলে আমরা কেন পারব না’ বলেন শিক্ষা উপমন্ত্রী।
গঠনমূলক সমালোচনার তাগিদ দিয়ে মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল বলেন, ‘রাষ্ট্র, সমাজ, সরকার, অর্থনীতি, রাজনীতি, দেশকে সঠিকভাবে পরিচালনার জন্য সাংবাদিকদের কলম খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু গঠনমূলক সমালোচনা অনেকসময় পাওয়া যায় না। সেনসেশনাল নিউজ হয়। তবে ধীরে ধীরে সংবাদমাধ্যমের চেহারা পাল্টাচ্ছে। এখন ঢালাওভাবে সরকারের বা দলের সমালোচনা না করে ব্যক্তির দুর্নীতি ফোকাস করা হচ্ছে, প্রতিষ্ঠানের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার তথ্য প্রকাশিত হচ্ছে। এটি ইতিবাচক। উন্নয়নের জন্য এটি খুব গুরুত্বপূর্ণ।’
নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের সামষ্টিক উন্নয়ন হয় না মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘একদিনের যে গণতন্ত্র, একদিনের যে নির্বাচন, সেটি দিয়ে পৃথিবীর কোনো দেশে সামষ্টিক উন্নয়ন হয়নি। সামষ্টিক উন্নয়ন তখনই হয়, যখন স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা থাকে। একদিনের নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের সামষ্টিক কল্যাণ অনেক সময়ই হয় না। কারণ, তাতে রাজনীতির প্রাধান্য থাকে সবসময় বেশি।’
রাজনীতিতে স্বচ্ছতা আনতে সাংবাদিকদের সহযোগিতা চেয়ে তিনি বলেন, ‘রাজনীতিতে অর্থবিত্তের প্রভাব নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে রাজনীতি উন্নত হবে। এক্ষেত্রে সাংবাদিকদের গুরুদায়িত্ব আছে। তারা চাইলে রাজনীতিতে স্বচ্ছতা আনার জন্য লিখতে পারেন। রাজনৈতিক পদ-পদবি উপভোগ করার নয়, কঠিন দায়িত্ব’— বলে তিনি মনে করেন।
‘ব্যক্তিগত কোনো রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, পেশাগত উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নেই, সামনে কাজ করার অনেক সুযোগ আছে। তিনি কর্মী হিসেবে থাকতে চান। বিশাল বটবৃক্ষ হয়ে যাওয়া, নেতৃত্ব দেওয়ার মতো যোগ্যতা অর্জন করতে আরও অনেক সময় লাগবে। তিনি পদ পেয়েছেন বলেই যে জননেতা হয়ে গেছেন এমন নয়’ বলেন নওফেল।
নেতৃত্বের প্রতিযোগিতার প্রসঙ্গে নওফেল বলেন, ‘রাজনৈতিক নেতৃত্বের মধ্যে এমন প্রতিযোগিতা হয়, এমনকি দলের মধ্যেও হয়, তাতে অনেকসময় উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয়। প্রতিবছর চট্টগ্রাম মহানগরীতে জলাবদ্ধতা হচ্ছে। জলাবদ্ধতা নিরসনের কাজ চলছে। কিন্তু যে গতিতে কাজটা হওয়ার কথা, সেই গতিতে হচ্ছে না। এখানে অনেক প্রতিবন্ধকতা আছে। প্রধানমন্ত্রী চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারকে ইকোনমিক হাব হিসেবে চিন্তা করে কাজ এগিয়ে নিচ্ছেন। এখানে অনেক উন্নয়ন প্রকল্প হচ্ছে। কিন্তু আমরা যদি দায়িত্বটা সঠিকভাবে পালন না করি, তাহলে প্রধানমন্ত্রীর একার পক্ষে কিছু করা সম্ভব নয়। প্রকল্পগুলো সঠিকভাবে বাস্তবায়ন হচ্ছে কি না, তুলে আনার দায়িত্ব সাংবাদিকদের পালন করতে হবে।’
চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের বঙ্গবন্ধু হলে সিইউজে সভাপতি মোহাম্মদ আলীর সভাপতিত্বে প্রেসক্লাব সভাপতি আলী আব্বাস, বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের সহ-সভাপতি রিয়াজ হায়দার চৌধুরী, প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক চৌধুরী ফরিদ, সিইউজের সিনিয়র সহ-সভাপতি রতন কান্তি দেবাশীষ, সহ-সভাপতি অনিন্দ্য টিটো বক্তব্য রাখেন।