চট্টগ্রাম ব্যুরো: সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছাড়াই গ্রেফতারের পর মৃত্যুর মুখোমুখি হওয়ার মতো এক বিভীষিকাময় পরিস্থিতির শিকার হয়েছিলেন শিক্ষানবীশ আইনজীবী সমর কৃষ্ণ চৌধুরী। তার অভিযোগ, কথিত ক্রসফায়ারে তাকে হত্যার সব আয়োজন সম্পন্ন করেছিল পুলিশ। মৃত্যু নিশ্চিত ধরে নিয়ে তিনি সৃষ্টিকর্তার নাম স্মরণ করতে শুরু করেছিলেন। হঠাৎ অজ্ঞাত এক ফোন কলে বেঁচে যায় তার প্রাণ। সেদিনের বিভীষিকাময় পরিস্থিতির কথা আরজিতে তুলে ধরে আদালতে ৮ পুলিশসহ ১১ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন সমর কৃষ্ণ চৌধুরী।
২০১৮ সালের ২৭ মে সন্ধ্যায় আদালত থেকে নামার পথে চট্টগ্রাম নগরীর কোতোয়ালি থানার লালদিঘীর পাড় এলাকা থেকে সাদা পোশাকে একদল পুলিশ সমর কৃষ্ণ চৌধুরীকে মাইক্রোবাসে তুলে নেয়। পরে তাকে ইয়াবা ও অস্ত্রসহ গ্রেফতারের কথা জানিয়ে সংবাদ বিজ্ঞপ্তি পাঠায় জেলার বোয়ালখালী থানা পুলিশ। পকেটে কলম নিয়ে আইনজীবীর বেশে থাকা সমরের ছবি গণমাধ্যম এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে সারাদেশে তোলপাড় ওঠে। গণমাধ্যমে একের পর এক সংবাদ পরিবেশিত হতে থাকে, টেলিভিশনের টকশোতেও গুরুত্ব পায় ঘটনাটি। এতে চাপের মুখে পড়ে পুলিশ।
এক পর্যায়ে তৎকালীন ডিআইজি এস এম মনিরুজ্জামানের সঙ্গে ঘটনার নেপথ্য ইন্ধনদাতা লণ্ডনপ্রবাসী সঞ্জয় দাশের ঘনিষ্ঠতার তথ্য উঠে আসে গণমাধ্যমে। বদলি করা হয় ডিআইজিকে। তদন্তের মাধ্যমে বোয়ালখালী থানার অভিযুক্ত পুলিশ সদস্যদের সাময়িক বরখাস্ত ও বদলি করা হয়। ওই বছরের ১২ জুলাই জামিনে মুক্তি পান সমর কৃষ্ণ চৌধুরী।
সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) সমর চট্টগ্রাম মহানগর হাকিম আবু সালেম মো. নোমানের আদালতে একটি মামলা দায়ের করেছেন। মামলায় যাদের অভিযুক্ত করা হয়েছে, তারা হলেন- বোয়ালখালী থানার সাবেক ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হিমাংশু কুমার দাশ, পরিদর্শক (তদন্ত) মাহবুব আলম আখন্দ, উপ-পরিদর্শক (এসআই) মো. আতিক উল্লাহ, আরিফুর রহমান, আবু বক্কর সিদ্দিকী, রিপন চাকমা ও দেলোয়ার হোসেন, সহকারী উপ-পরিদর্শক (এএসআই) আলাউদ্দিন, লণ্ডনপ্রবাসী সঞ্জয় দাশ, দক্ষিণ সারোয়াতলী গ্রামের সজল দাশ গুপ্ত এবং সারোয়াতলী ইউনিয়ন পরিষদে গ্রাম পুলিশ হিসেবে দায়িত্বরত দিদারুল আলম।
অভিযুক্ত আট পুলিশের সবাই ঘটনার সময় বোয়ালখালী থানায় কর্মরত ছিলেন। ঘটনার পর হিমাংশু, আতিক উল্লাহ, আরিফুরকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। বাকি পুলিশ সদস্যদের বদলি করা হয়। অভিযুক্ত সঞ্জয় দাশ দক্ষিণ সারোয়াতলী গ্রামের অসিত দাশের ছেলে। সজল দাশ গুপ্ত একই গ্রামের মৃত সমর দাশ গুপ্তের ছেলে এবং সঞ্জয়ের বাড়ির কেয়ারটেকার হিসেবে মামলার আরজিতে উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া সজল দাশ গুপ্ত বোয়ালখালী থানা পুলিশের সোর্স হিসেবে এলাকায় পরিচিত। দিদারুল আলমকেও ঘটনার পর চাকরিচ্যুত করা হয়।

মামলার আরজিতে মাইক্রোবাসে তুলে নেওয়ার পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহের বর্ণনা দিয়েছেন বাদি সমর কৃঞ্চ চৌধুরী। এতে বলা হয়েছে, ঘটনার দিন ইফতারির পর আদালত থেকে নেমে আসছিলেন সমর। তার সঙ্গে ছিলেন আইনজীবী জুয়েল দাশ, গৌতম চৌধুরী এবং এরশাদুর রহমান টিটু। নগরীর লালদিঘীর পাড় এলাকায় মালঞ্চ নামে একটি দোকানের কাছে হঠাৎ একটি মাইক্রোবাস এসে থামে তাদের সামনে। সাদা পোশাকে মাইক্রোবাস থেকে নেমে আসেন পুলিশ কর্মকর্তা আতিক উল্লাহ, আরিফুর রহমান, আবু বক্কর সিদ্দিকী, রিপন চাকমা ও আলাউদ্দিন। সঙ্গে নেমে আসেন সঞ্জয় দাশ ও সজল দাশ গুপ্ত।
সঞ্জয় ও সজল পুলিশ সদস্যদের সমরকে চিনিয়ে দেন। এসময় তারা দলবদ্ধভাবে সমরের পথরোধ করে মারধর শুরু করে। কিল-ঘুষি মারতে মারতে তাকে তুলে নেয় মাইক্রোবাসে। উপস্থিত আইনজীবীরা তাদের পরিচয় জানতে চাইলে এস আই আতিক উল্লাহ ও আরিফুর রহমান আইডি কার্ড বের করে দেখান। মাইক্রোবাসে তোলার সময়ই ছিনিয়ে নেওয়া হয় দুটি মোবাইল সেট। তাকে নেওয়া হয় বোয়ালখালী থানা হাজতে। রাত আনুমানিক ১০টা-১১টার দিকে বোয়ালখালী থানার ওসি হিমাংশু কুমার দাশ আসেন হাজতে। সমরকে দেখেই চিৎকার করে হিমাংশু বলেন, ‘শালা সমর চৌধুরী, তুই আমাকে অনেক কষ্ট দিয়েছিস।’ সমর তার পা জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কান্না করতে করতে বলেন, ‘আমি কি দোষ করেছি, কেন আমার ওপর এত অন্যায়-অত্যাচার করছেন ? আমার কোনো ছেলে সন্তান নেই, দুটি মেয়ে আছে। তাদের কি গতি হবে?’ ওসি হিমাংশু চিৎকার করে বলেন, ‘তোর বৌ-মেয়েকে আমি সুখে রাখব। তোকে আর চিন্তা করতে হবে না।’ একথা বলে সমরকে লাথি দিলে তিনি মেঝেতে লুটিয়ে পড়েন। এসময় ওসি হিমাংশু উপস্থিত পুলিশ সদস্যদের বলেন, ‘শালাকে মেরে ফেলে দিয়ে আয়।’
রাত প্রায় ১২টার সময় এসআই আতিক, আবু বক্কর, রিপন চাকমা ও আলাউদ্দিন থানা হাজতে ঢোকেন। এসআই আরিফুর রহমান ও আতিক মিলে গামছা দিয়ে সমরের চোখ বাঁধার চেষ্টা করেন। তখন সমর বাধা দিলে অভিযুক্ত অন্য পুলিশ সদস্যরা গিয়ে তাকে বেধড়ক পেটাতে থাকেন। এরপর তার চোখ বেঁধে, হ্যান্ডকাপ লাগিয়ে তাকে আবারও মাইক্রোবাসে তোলা হয়। চালক কোথায় নেবে জিজ্ঞেস করলে বোয়ালখালীর চরণদ্বীপে কর্ণফুলী নদীর পাড়ে নিয়ে যেতে বলা হয়।
কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে সমর কৃষ্ণ চৌধুরী সারাবাংলাকে বলেন, ‘ওসি হিমাংশু যখন মেরে ফেলে দিয়ে আসতে বলল, তখন আমি আতঙ্কিত হয়ে পড়ি। এরপর আমাকে যখন চোখ বেঁধে নদীর পাড়ে নিয়ে যাওয়ার কথা বলা হল, তখন আমি সৃষ্টিকর্তার নাম স্মরণ করতে শুরু করি। আমি নিশ্চিত হই, আমাকে মেরে ফেলার জন্য সেখানে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।’
মামলার আরজিতে আরও বলা হয়েছে, গাড়িতে করে চরণদ্বীপ নেওয়ার সময় সমর কান্নাকাটি করতে থাকলে তাকে আবারও মারধর করা হয়। তিনি ‘ভগবানের’ নাম জপতে থাকেন। গাড়ি থেকে নামানোর পর বাদির চোখ ও হাত খুলে দেওয়া হয়। এসময় এস আই আরিফুর রহমান তাকে বলেন, ১০ লাখ টাকা না দিলে তাকে ক্রসফায়ারে হত্যা করা হবে। সমর অপারগতা প্রকাশ করলে আরিফুর বলেন, ‘সোজা সামনের দিকে চলে যা।’ তিনি অন্ধকারের মধ্যে কোথায় যাবেন জিজ্ঞেস করলে আরিফুর রহমান বলেন, ‘বেহেস্তে যা, বেহেস্তে পাঠাবার জন্যই তো তোকে এখানে এনেছি।’ এসময় পুলিশ সদস্যদের সঙ্গে তিনি তর্কাতর্কি করতে থাকেন।

এর এক পর্যায়ে আরিফুর রহমানের মোবাইলে একটি কল আসে। পাঁচ মিনিট পর তিনি বলেন, ‘শালাকে (সমর) আবার চোখ-হাত বেঁধে গাড়িতে তোল।’ এরপর তাকে চোখ-হাত বেঁধে তার গ্রামের বাড়ি দক্ষিণ সারোয়াতলীতে নিয়ে যাওয়া হয়। ঘরের বন্ধ দরজা লাথি মেরে খুলে তাকে চৌকির ফ্রেইমের ওপর বসায়। সেখানে তাকে হঠাৎ বেদমভাবে মারধর শুরু করে। সমর কান্না শুরু করলে গভীর রাতে আশপাশের লোকজন ছুটে আসেন। গ্রাম পুলিশ দিদারুল আলম প্রতিবেশি গৌরাঙ্গ চৌধুরী ও ঝুলন চৌধুরীকে জোরপূর্বক ধরে আনেন। সমর গৌরাঙ্গের কাছে এক গ্লাস পানি চান। গৌরাঙ্গ পানি আনার পর সমরের মুখ থেকে লাথি মেরে গ্লাস ফেলে দিয়ে আরিফুর আবারও মারধর শুরু করে। এরপর গৌরাঙ্গ ও ঝুলনের কাছ থেকে ৩-৪টি সাদা কাগজে সই নেয়। এ সময় সমর আবারও আরিফুর রহমানের কাছে এক গ্লাস পানি চান। তখন আরিফুর একটি বোতলে প্রস্রাব করে তাকে বলেন, ‘নে, পানি খা।’ এরপর তাকে আবারও থানায় নিয়ে যাওয়া হয়।
পরদিন সকাল আনুমানিক ১০টার দিকে ওসি হিমাংশু এসে সমরকে বলেন, ‘তুই শালা বেঁচে গেলি।’ সমর তার স্ত্রী ও দুই মেয়ের কথা বললে হিমাংশু বলেন, ‘বৌ-মেয়েদের কথা চিন্তা করিস না। তাদের আমি সুখে রাখব।’ বিকেল আনুমানিক তিনটার দিকে তাকে ওসি’র অফিসকক্ষের সামনে এনে দাঁড় করানো হয়। তখন সেখানে সঞ্জয় ও সজল ছিলেন। তাদের কথামতো পুলিশ সমরের হাতে একটি অস্ত্র দেয়। সমর অস্ত্র নিতে না চাইলে পরিদর্শক (তদন্ত) মাহবুবুল আলম এসে তাকে লাঠি দিয়ে পিঠে আঘাত করে। হাতে অস্ত্র দিয়ে দুজন সিপাহী তাকে দুদিক থেকে ধরে রাখে এবং একজন ছবি তোলে। এরপর সেটি তারা ফেসবুকে প্রচার করে।
সমর কৃষ্ণ চৌধুরী সারাবাংলাকে বলেন, ‘আমি কোনো অপরাধ করিনি। সঞ্জয় দাশের সঙ্গে তার প্রতিবেশি স্বপন দাশের জমিজমা নিয়ে বিরোধ ছিল। পেশাগত কারণে আমি স্বপনকে আইনি সহায়তা দিয়েছিলাম। লণ্ডণপ্রবাসী সঞ্জয়ের অর্থবিত্ত আছে। সেসময়কার ডিআইজি এস এম মনিরুজ্জামানের সঙ্গে তার বিশেষ যোগাযোগ ছিল। আর সজল দাশ গুপ্ত তার বাড়ি কেয়ারটেকার হলেও নিজেকে বোয়ালখালী থানা পুলিশের সোর্স পরিচয় দিয়ে গ্রামে দাপট দেখায়। বিনা অপরাধে তারাই ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে আমাকে হয়রানি করেছে। আমার বিরুদ্ধে একে একে চারটি মামলা দিয়েছে। আমাকে ক্রসফায়ারের নামে হত্যার চেষ্টা করেছে। সাংবাদিকরা সঠিক সংবাদ পরিবেশন করায় দেশবাসী সোচ্চার হওয়ায় আমি প্রাণে রক্ষা পেয়েছি। তারপরও বিনা অপরাধে আমাকে দেড় মাস জেল খাটতে হয়েছে।’
আদালত সমর কৃষ্ণ চৌধুরীর মামলাটি আমলে নিয়ে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনকে (পিবিআই) তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন।