ঢাকা: একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর। কিন্তু নির্বাচনে ভরাডুবির পর জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়— আগের রাতেই ভোট হয়ে গেছে। অর্থাৎ ৩০ ডিসেম্বরের ভোট ২৯ ডিসেম্বর রাতেই করে ফেলেছে ক্ষমতাসীনরা।
নিজেদের দাবির পক্ষে সারাবছর ক্যাম্পেইন করেছে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। বার বার ঘোষণা দিয়েছে ‘বড়’ সমাবেশ করার। সমাবেশের জন্য সোহরাওয়ার্দী উদ্যান চেয়েছে বেশ কয়েকবার। কিন্তু অনুমতি মেলেনি। ফলে ‘বড়’ সমাবেশ করা সম্ভব হয়নি তাদের পক্ষে।
যেহেতু ‘বড়’ সমাবেশ করতে চাইলে অনুমতি মেলে না। তাই ২৯ ডিসেম্বর দিনটিকে নির্বাচনের ‘বর্ষপূর্তি’র দিন হিসেবে ধরে নিয়ে রোববার দুপুর ২টায় অনুমতি ছাড়াই জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে সমাবেশ করার ঘোষণা দেয় জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। ২৩ ডিসেম্বর জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের স্টিয়ারিং কমিটির বৈঠক শেষে জেএসডি’র সভাপতি আ স ম আবদুর রব ঘোষণাটি দেন।
সেই ঘোষণা অনুযায়ী রোববার (২৯ ডিসেম্বর) দুপুর ২টায় জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের দফতর প্রধান জাহাঙ্গীর আলম মিন্টু পাঁচ/ছয় জন মধ্যম সারির নেতা এবং একটি ব্যানার নিয়ে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে আসেন। সেখানে আগে থেকেই সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ‘দপ্তরি কাম নাইট গার্ড’দের সংগঠন অবস্থান কর্মসূচি পালন করছিল।
দায়িত্বরত একজন পুলিশ কর্মকর্তা ‘দপ্তরি কাম নাইট গার্ড’র কিছু সংখ্যক সদস্য সরিয়ে একটু জায়গা বের করে দেন এবং সেখানে একটি বেঞ্চ ও কয়েকটি চেয়ার পেতে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নেতাদের বসার ব্যবস্থা করা হয়। দুপুর সাড়ে ৩টা পর্যন্ত জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ওই ৮/১০জন মধ্যম সারির নেতা বক্তব্য চালিয়ে যান।

বিকেল পৌনে ৪টায় সেখানে হাজির হন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের শরিক জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জেএসডি) সভাপতি আ স ম আবদুর রব, নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না, ঐক্যফ্রন্টের অন্যতম শীর্ষ নেতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. মঈন খান, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আবদুস সালাম, হাবিবুর রহমান হাবিব, জেএসডির সহসভাপতি তানিয়া রব, সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট সানোয়ার হোসেন তালুকদার, গণফোরামের নির্বাহী সভাপতি অধ্যাপক আবু সাঈদ ও প্রেসিডিয়াম সদস্য জগলুল হায়দার আফ্রিক।
সব মিলে নেতার সংখ্যা ১৩ জন। তবে সমাবেশে আসেননি জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতা ডা. কামাল হোসেন এবং মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
নির্বাচনের বর্ষপূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের এই সমাবেশে কর্মী-সমর্থকদের উপস্থিতি ছিল খুবই কম। সব মিলে শখানেক কর্মী-সমর্থকের বেশি হবে না— এমনটিই ধারণা উপস্থিত সবার। তবে সংবাদকর্মী, পুলিশ সদস্য, কৌতূহলী দর্শক এবং সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ‘দপ্তরি কাম নাইট গার্ডদের’র উপস্থিতির কারণে সমাবেশটা মোটামুটি বড়ই মনে হচ্ছিল।
সমাবেশে মোট ব্যানার ছিল চারটি। মূল ব্যানারটি ছিল জাতীয় প্রেস ক্লাবের দেয়ালে টাঙানো। বাকি তিনটি ব্যানার নিয়ে এসেছিলেন গণফোরামের নেতাকর্মীরা।
সমাবেশে কমসংখ্যক নেতাকর্মীর উপস্থিতির প্রতি ইঙ্গিত করে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নেতারা বারবার বলেন, ‘হয়তো আমাদের উপস্থিতি কম। কিন্তু আমাদের দাবির প্রতি সারাদেশের মানুষের সমর্থন রয়েছে। আমরা যদি মাঠে নামি, তাহলে জনগণের সমর্থন পাব।’
সমাবেশে দেওয়া বক্তব্যে ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, ‘আমি বিএনপিকে বলব, ওহির আশায় বসে থাকবেন না। আপনাদের নেত্রীকে বাঁচাতে হলে, দেশকে বাঁচাতে হলে এখনই মাঠে নামুন। মাঠে নেমে আন্দোলন না করলে অহির বরকতে ক্ষমতায় যেতে পারবেন না।’
বিএনপির দিকে ইঙ্গিত করে আ স ম আবদুর রব বলেন, ‘এই সরকারকে ঝেঁটিয়ে বিদায় করতে হবে। কিন্তু এককভাবে কোনো দল এ কাজ করতে পারবে না। গলাবাজি করে পারবেন না। এটা এককভাবে আদায় করা যাবে না। এ সরকারকে যদি বিদায় করতে হয়, জনগণের সরকার যদি কায়েক করতে হয়, মুক্তিযুদ্ধের সরকার যদি কায়েম করতে হয়, জাতীয় সরকার যদি কায়েম করতে হয়, তাহলে ঐক্যবদ্ধভাবে আন্দোলন করতে হবে। যত বড় দলই হোন না কেন, এককভাবে কেউ বাংলাদেশে জনগণকে মুক্তিযুদ্ধের সরকার উপহার দিতে পারবেন না।’
তিনি বলেন, ‘আজকেও ডাকসু ভবনের পাশে কয়েকটি ককটেল ফাটানো হয়েছে। কারা ফাটায়? প্রোক্টর সাহেব জানেন না? ভিসি সাহেব জানেন না? সারাবাংলাদেশে গুণ্ডামি করছে কারা? লুটপাট করছে কারা? এসব বুঝতে হবে।’
মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, ‘আমরা একবছর মাঠে নামতে পারিনি। আপনারা দাপট দেখিয়েছেন। আমরা এখন থেকে মাঠে থাকব। আজ আমরা এখানে সমাবেশ করছি। আগামীকাল বিএনপি সমাবেশ করবে। মৎস ভবনের সামনে গণতন্ত্র উদ্ধার নামের একটি সংগঠন সমাবেশ করবে।’
তিনি বলেন, ‘আমাদের ঘোষণা স্পষ্ট— গায়ের জোরে ভোট ডাকাতি করে ক্ষমতায় গিয়েছেন। আমরা এই সংসদ মানি না। আমরা এই সরকার মানি না। পুলিশ ছাড়া আমাদেরকে সমাবেশ করতে দিন, দেখুন কী হয়। পাটকল শ্রমিকদের দাবি যদি না মানা হয়, নারী নির্যানত যদি বন্ধ না হয়, আমরা যদি কথা বলতে না পারি, তাহলে কর্মসূচি দেবো।’
সমাবেশ শেষে প্রেস ক্লাবের সামনে থেকে একটি বিক্ষোভ মিছিল বের হয়। মিছিলটি কদম ফোয়ারা ঘুরে প্রেস ক্লাবের সামনে এসে শেষ হয়। মিছিলে জাতীয় এক্যফ্রন্টের শখানেক নেতাকর্মী-সমর্থক অংশ নেন। এ সময় পুলিশ সদস্যরা সতর্ক অবস্থানে ছিল।