রংপুর: রংপুরের মাছুয়াপাড়ায় অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী ও তার পরিবারের চার সদস্য হত্যার ঘটনায় পুলিশের তদন্ত ও বক্তব্যকে ‘সাজানো নাটক’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও বিশিষ্ট নাগরিকরা।
সোমবার (২৪ আগস্ট) বিকেলে রংপুরে বিক্ষোভ ও সড়ক অবরোধ করেছেন তারা। প্রশাসনকে তিন দিনের আলটিমেটাম দিয়ে বলা হয়েছে, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে প্রকৃত অপরাধীদের গ্রেফতার না করা হলে নগরী অচল করে দেওয়া হবে।
রংপুর জিলা স্কুলের সাবেক শিক্ষক শফিয়ার রহমান পুলিশের বক্তব্যকে হাস্যকর আখ্যা দিয়ে বলেন, ‘দুইজন মাদকসেবী স্রেফ ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়ায় পরপর চারজনকে শ্বাসরোধে হত্যা করেছে, এরপর শান্ত মাথায় গোসল করে খাবার খেয়েছে এমন আজগুবি গল্প কেউ বিশ্বাস করবে না। এই পুরো ঘটনা একটি সাজানো নাটক ছাড়া আর কিছুই নয়।’
সাবেক শিক্ষার্থী শরিফুল পুলিশের তথ্যের অসঙ্গতি তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘পুলিশ কমিশনার বলেছেন, প্রার্থীর চোয়াল ভেঙে গেছে এবং চোখ বের হয়ে এসেছে। কিন্তু ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক জানিয়েছেন, এমন কোনো আলামত পাননি। পুলিশের শীর্ষ কর্মকর্তার বক্তব্যের সঙ্গে চিকিৎসকের তথ্যের সরাসরি সংঘাত হলে আমরা কীভাবে পুলিশের তদন্তের ওপর আস্থা রাখব?’
সাংস্কৃতিক কর্মী ডলার বলেন, ‘পুলিশ যে দুই যুবককে গ্রেফতার করে খুনি সাজিয়েছে, তাদের দিয়ে এই কাজ করানো সম্ভব কি না তা নিয়ে জনমনে সন্দেহ রয়েছে। ৩ দিনের মধ্যে প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটন ও আসল খুনিদের গ্রেফতার না করা হলে রংপুর নগরী পুরোপুরি অচল করে দেওয়া হবে।’
মহিলা পরিষদের রংপুর জেলা সভাপতি রুমানা জামান বলেন, ‘মাত্র দুইজন মানুষ কয়েক মিনিটের মধ্যে কোনো চিৎকার বা ধস্তাধস্তি ছাড়া চারজন সুস্থ মানুষকে মেরে ফেলল এটা বাস্তবে সম্ভব নয়। আমরা চাই প্রকৃত খুনিরা শনাক্ত হোক, কোনো বলির পাঁঠা দিয়ে এই মামলা ধামাচাপা না দেওয়া হোক।’
রংপুর মহানগর নাগরিক কমিটির সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট পলাশ কান্তি নাগ বিচার বিভাগীয় তদন্তের দাবি জানান।
ময়নাতদন্তের তথ্যে অসঙ্গতি
রংপুর মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক বিভাগের ডা. বাবলু কিশোর বিশ্বাস জানান, প্রাথমিকভাবে মনে হচ্ছে চারজনকেই শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়েছে। তবে পুলিশের বর্ণনার সঙ্গে নিহত প্রার্থীর শারীরিক অবস্থার কিছু অমিল রয়েছে। তার চোয়াল ভাঙা বা চোখ বের হয়ে আসার কোনো চিহ্ন আমরা পাইনি। শরীরে কোনো রাসায়নিক বা এসিড ব্যবহারের আলামতও মেলেনি।
পুলিশ যা বলছে
রোববার (২৩ আগস্ট) দুপুরে সংবাদ সম্মেলনে রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আব্দুল মাবুদ হত্যাকাণ্ডের বর্ণনা দেন। তিনি দাবি করেন, বৃহস্পতিবার গভীর রাতে সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ ওই বাড়ির ছাদে ইয়াবা সেবন করছিল। গণপতি বাধা দিলে তারা তাকে ও একে একে পরিবারের সবাইকে গামছা পেঁচিয়ে শ্বাসরোধে হত্যা করে। খুনিরা সারারাত ওই বাড়িতে অবস্থান করে গোসল ও খাবার খায় এবং ডাকাতি বলে চালাতে আসবাবপত্র তছনছ করে।
সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের কোনো প্রশ্ন করার সুযোগ দেওয়া হয়নি এবং আসামিদের জবানবন্দি বা আদালতে তোলার বিষয়েও বিস্তারিত জানানো হয়নি।
ঘটনায় সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়ে কারাগারে আছেন। পুলিশ দ্রুত অভিযোগপত্র দাখিলের কথা জানিয়েছে।
গত বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) রাতে নগরীর মাছুয়াপাড়ায় নিজ বাড়িতে নৃশংসভাবে খুন হন রংপুর জিলা স্কুলের সাবেক শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী (৬৫), তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী (৫০), স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করা মেয়ে আগামী চক্রবর্তী প্রার্থী (২৩) ও পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র প্রিয়ম চক্রবর্তী (১২)। শনিবার (২২ আগস্ট) রাতে তাদের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।