ঢাকা: রাজধানীর কামরাঙ্গীরচর থানার বেড়িবাঁধ এলাকায় ডাকাতির প্রস্তুতিকালে প্রধান আসামি তৈয়বসহ ৭ ডাকাত সদস্যকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এই ঘটনায় প্রধান আসামি মো. তৈয়ব আলী সর্দার ৪৫ মামলার আসামি। জামিনে বেড় হয়ে সে দীর্ঘদিন ধরে মাদারীপুরে অবস্থান করে ঢাকার সমস্ত ঘটনাগুলো ঘটাচ্ছিল। কিছু ঘটনায় সে প্র্যাক্টিক্যালিও থাকত। একই সঙ্গে রাজধানীতে বেশকিছু ঘটনায় তৈয়বের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে।
রোববার (১৬ আগস্ট) বিকেলে রাজধানীর ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সন্মেলনে এসব জানান অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (এস্টেট, ডেভেলপমেন্ট ও আইসিটি) মোহাম্মদ ওসমান গণি।
তিনি বলেন, রাজধানীর কামরাঙ্গীরচর থানার বেড়িবাঁধ এলাকায় অভিযান চালিয়ে সংঘবদ্ধ ডাকাত দলের সাত সদস্য গ্রেফতার করেছে ডিবি লালবাগ বিভাগ। এসময় বিদেশি পিস্তলসহ ডাকাতি কাজে ব্যবহৃত গাড়ি ও নানা সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়।
মোহাম্মদ ওসমান গণি বলেন, ঢাকা শহরে বেশ কিছুদিন ধরে ডিবি, র্যাব পুলিশ পরিচয় দিয়ে বিভিন্ন সন্ত্রাসীরা অপরাধ করছে। পুলিশ-ডিবির ড্রেস পরে, নকল পিস্তল, আসল পিস্তল দিয়ে বিভিন্ন জায়গায়, বিভিন্ন রাস্তায় তারা টাকা বা মূল্যবান সম্পদ বহনকারী যাত্রীদেরকে ভয়ভীতি দেখিয়ে, আটকিয়ে ছিনতাই করতেছিল, ডাকাতি করতেছিল।
তিনি আরও বলেন, গত ১৩ আগস্ট রাত থেকে ১৫ই আগস্ট পর্যন্ত, টানা দুই-তিন দিন আমরা অপারেশন করে ঢাকা শহরের সাতজন দুর্ধর্ষ ছিনতাইকারী, ডাকাত আমরা গ্রেফতার করেছি। গ্রেফতারকৃত দুর্ধর্ষ ছিনতাইকারী, ডাকাতদের মধ্যে প্রধান ব্যক্তি হচ্ছে তৈয়ব। যার নামে সারা বাংলাদেশে ৪৫টা ডাকাতি, ছিনতাই মামলা আছে। আমরা তাকে অনেকদিন ধরে খুঁজতেছিলাম। সম্প্রতি বেশ কয়েকটা ঘটনা ঢাকা শহরে ঘটে গেছে। এর প্রেক্ষিতে তার নাম বারবার আসতেছিল। তার নামে ৪৫টা মামলা, কিন্তুু সে জামিনে ছিল। তার একটা গ্রুপ ছিল। দীর্ঘদিন ধরে মাদারীপুরে অবস্থান করে ওখান থেকে রিমোট কন্ট্রোল নেড়ে এই সমস্ত ঘটনাগুলি ঘটাচ্ছিল। সে প্র্যাক্টিক্যালিও থাকত।
পুলিশের এই কর্মকর্তা বলেন, আমরা গত ১৩ তারিখ দিবাগত রাতে আসামি তৈয়ব দলবল নিয়ে কামরাঙ্গীরচরে বুড়িগঙ্গা ব্রিজের দক্ষিণ পাশে ডাকাতির প্রস্তুতি নিচ্ছিল। আমাদের টিম সেখানে যাওয়ার পরপরই প্রথমে তৈয়ব ডাকাতকে গ্রেফতার করা হয়, বাকিরা পালিয়ে যায়। এসময় তৈয়বকে তল্লাশি করে দুইটা মোবাইল পাওয়া যায়, একটা পকেট রাউটার পাওয়া যায়। গ্রেফতারের পর তাকে জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে সে স্বীকার করে এবং অন্যদের
তথ্য দিলে উত্তরখান থেকে পাভেল সরদার-কে গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতারের পর তার দুইটা মোবাইল ফোন, র্যাবের লোগোযুক্ত আইডি কার্ড হোল্ডার, দুইটি সেনাবাহিনীর ফিল্ড ক্যাপ, একটি কালো লেজার লাইট এবং কয়েকটা পকেট রাউটারসহ আরও অন্যান্য সরঞ্জামাদি উদ্ধার করি।
তিনি বলেন, পাভেল ও তৈয়ব-কে জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে তারা স্বীকার করে, উত্তরা, উত্তরা সেন্টার পয়েন্টে যে মল আছে, মলের ওদিকে তাদের একটা ডেরা আছে, সেখানে বাকিরা অবস্থান করছে। সেখানে অভিযান চালিয়ে ডাকাত দলের সদস্য সাইফুর রহমান, রাব্বি আলম, ইমরান হোসেন ভূঁইয়া, নুরুল ইসলাম এবং মোহাম্মদ ইসমাইল এই পাঁচজনকে গ্রেফতার করি। তাদের জিজ্ঞাসাবাদের ভিত্তিতে উত্তরা সেন্টার পয়েন্টে ওই মল থেকে একটা কালো ওয়াকিটকি সেট, বাংলাদেশ পুলিশের লোগোযুক্ত একটা হ্যান্ডকাফ, গাড়ির দুইটা ভুয়া নম্বর প্লেট, তিনটি ‘র্যাব’ লেখা ভেস্ট, একটি ‘ডিবি’ লেখা ভেস্ট, দুইটি রিফ্লেক্টিং ভেস্ট, পাঁচটি কালো রঙের রিফ্লেক্টিং স্টিকার, পাঁচটি হলুদ রঙের রিফ্লেক্টিং স্টিকার, একটি কালো রঙের পিস্তল কাভার, একটা খেলনা পিস্তল, তিনটা স্মার্টফোন এবং কিছু রাউটার উদ্ধার করি। এই সব সরঞ্জামাদিগুলো তারা ডাকাতি এবং ছিনতাইয়ের কাজেব্যবহার করত। পরে গ্রেফতারকৃত ইমরানকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে একপর্যায়ে স্বীকার করে তার একটা পিস্তল আছে। পিস্তলটা রূপগঞ্জে তার বাড়িতে। পরে রূপগঞ্জ থেকে একটা ইটালিয়ান পিস্তল, ছয় রাউন্ড গুলি আমরা উদ্ধার করি।
তিনি আরও বলেন, গত কয়েক মাসে ঢাকা শহরে যে ছিনতাইগুলো বা ডাকাতিগুলো হয়েছিল, এগুলো ডিটেকশন করা আমাদের উদ্দেশ্য ছিল। গত মে মাসে যাত্রাবাড়ীতে ২৩ লাখ ২০ হাজার টাকার একটা ছিনতাই হয়েছিল। সেই ঘটনায় গ্রেফতারকৃত আসামিরা তৈয়বের নাম বলছিল এবং পাভেল সরদারের নাম বলছিল। জুলাই মাসের ১৪ তারিখে কুরিয়ার সার্ভিসে ১২ লাখ টাকা ছিনতাই হয়েছিল। সেটাও আমাদের কাছে ইনফরমেশন ছিল—এই গ্রুপটা করেছে। আমরা ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করলে তারা সবকিছু স্বীকার করেছে। ধানমন্ডি থেকে ডাকাতির কাজে ব্যবহৃত গাড়ি ও একাধিক নাম্বার প্লেট উদ্ধার করা হয়। বিভিন্ন সময়ে এই ভিন্ন ভিন্ন নাম্বার প্লেটগুলো ব্যবহার করে তারা অপরাধ করতো।
সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, তৈয়বের নামে ৪৫টা মামলা আছে। বিভিন্ন ক্যাটাগরির মামলা। এই দুর্ধর্ষ ডাকাতি এবং ছিনতাইকারী প্ল্যানার, এই ৪৫টা মামলায় ৪৫ বার সে জেলে গিয়েছে এবং ৪৫ বারই তিন মাস, চার মাস, পাঁচ মাস পর পর সে জামিন নিয়ে চলে এসেছে। আমাদের দুর্ভাগ্য হচ্ছে, আমরা বারবার ধরে দিচ্ছি, আমরা গ্রেফতার করে দিচ্ছি, কিন্তু তারা জামিন পেয়ে যাচ্ছে অজানা কারণে।