রংপুর: দিনাজপুর মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষাবোর্ডের ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষার ফলাফলে শূন্য পাসের কলঙ্ক ও পাসের হার কমে যাওয়ার দুঃসংবাদ সামনে এসেছে। পাশাপাশি, রংপুর ক্যাডেট কলেজের শতভাগ জিপিএ-৫ অর্জনের সাফল্য আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
দিনাজপুর শিক্ষাবোর্ডে পাসের হার কমেছে ৮ দশমিক ৯৮ শতাংশ। চলতি বছর এই বোর্ডে পাসের হার দাঁড়িয়েছে ৫৮ দশমিক ৫ শতাংশে, যা গত বছর ছিল ৬৭ দশমিক ৩ শতাংশ। বোর্ডের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষায় মোট পরীক্ষার্থী ছিল ১ লাখ ৮৩ হাজার ৬৯৪ জন। এর মধ্যে পরীক্ষায় অংশ নেয় ১ লাখ ৮০ হাজার ৭৫২ জন এবং উত্তীর্ণ হয়েছে ১ লাখ ৪ হাজার ৯২৫ জন। অর্থাৎ, ৭৮ হাজার ৭৬৯ জন পরীক্ষার্থী উত্তীর্ণ হতে পারেনি। এ ছাড়া, ২ হাজার ৯৪১ জন পরীক্ষার্থী পরীক্ষায় অনুপস্থিত ছিল।
সবচেয়ে বেশি উদ্বেগজনক তথ্য হলো, বোর্ডের অধীনস্ত রংপুর বিভাগের আট জেলার ১৮টি বিদ্যালয়ের কোনো শিক্ষার্থীই পাস করতে পারেনি। এরমধ্যে সর্বোচ্চ শূন্য পাসের বিদ্যালয় ৫টি ঠাকুরগাঁও জেলায়। এরপর কুড়িগ্রামে ৪টি, রংপুর, পঞ্চগড় ও গাইবান্ধায় ২টি করে এবং দিনাজপুর, লালমনিরহাট ও নীলফামারীতে ১টি করে বিদ্যালয় রয়েছে।
শূন্য পাস করা ১৮ বিদ্যালয়ের মধ্যে রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলার কুমারপুর উচ্চ বিদ্যালয় ও ঘাসিপুর উচ্চ বিদ্যালয়, গাইবান্ধার সাদুল্লাপুর উপজেলার উত্তর দামোদরপুর কাগজীপাড়া বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ও পলাশবাড়ী উপজেলার মনোহরপুর বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, নীলফামারীর ডোমার উপজেলার আমবাড়ী বহুমুখী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার তালতলা উচ্চ বিদ্যালয়, ব্রাহ্মণপাড়া উচ্চ বিদ্যালয়, ভুরুঙ্গামারী উপজেলার পাথরডুবি আদর্শ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় এবং সদর উপজেলার পূর্ব কুমারপুর আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়।
এছাড়া লালমনিরহাটের কালীগঞ্জ উপজেলার এ.এম. রথবাড়ী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, দিনাজপুরের নবাবগঞ্জ উপজেলার গোলাপগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়, ঠাকুরগাঁওয়ের সদরের আকছা আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়, অনভার দিঘী উচ্চ বিদ্যালয়, মাধবপুর বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, তওয়ারীগাঁও উচ্চ বিদ্যালয় ও হরিপুর উপজেলার রামপুর ভাটুরিয়া বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়।
অন্যদিকে পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলার বলরামহাট মডেল বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় এবং বোদা সরদারপাড়া বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়।
দিনাজপুর মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষাবোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ইলিয়াস আহমেদ ফল বিপর্যয়ের কারণ সম্পর্কে জানতে চাইলে বলেন, ‘ফলাফল কেন কমেছে, তার কারণ খতিয়ে দেখতে হবে।’
তিনি উল্লেখ করেন, মোটামুটি এবার সব শিক্ষা বোর্ডেই ফলাফল কিছুটা কমেছে। তবে, এসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতার মান, নিয়মিত ক্লাসের অনুপস্থিতি এবং প্রশাসনিক নজরদারির অভাবকেই অভিভাবক ও স্থানীয় শিক্ষানুরাগীরা এই বিপর্যয়ের মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
শিক্ষা বোর্ড কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, শতভাগ অকৃতকার্য হওয়া এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
রংপুর ক্যাডেট কলেজের সাফল্য
অপরদিকে, দিনাজপুর শিক্ষা বোর্ডের অধীনেই রংপুর ক্যাডেট কলেজ বরাবরের মতো এবারও এসএসসি-২০২৬ পরীক্ষায় ঈর্ষণীয় ফলাফল অর্জন করেছে। বিজ্ঞান বিভাগ থেকে ৪৭ জন এবং মানবিক বিভাগ থেকে ৩ জনসহ মোট ৫০ জন পরীক্ষার্থী এবার পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে এবং সকলেই জিপিএ ৫.০০ অর্জন করে।
রংপুর ক্যাডেট কলেজের অধ্যক্ষ এ এইচ এম ছেরাজুজ্জামান এই সাফল্যের পেছনে সেনাসদরের দিক নির্দেশনা, কলেজ অধ্যক্ষের নেতৃত্ব, উপাধ্যক্ষের তত্ত্বাবধান, শিক্ষক-কর্মকর্তাদের প্রচেষ্টা ও অভিভাবকদের সহযোগিতার কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ক্যাডেট কলেজের সুশৃঙ্খল পরিবেশ, গঠনমূলক অনুশাসন এবং শিক্ষক-কর্মকর্তাদের সার্বক্ষণিক তদারকি এই ভালো ফলাফলের অন্যতম অনুষঙ্গ।
রংপুরের শীর্ষ বিদ্যালয়গুলোর সাফল্য
এসএসসি পরীক্ষায় রংপুরের অন্যান্য শীর্ষ প্রতিষ্ঠানগুলোর ফলাফলও সন্তোষজনক। প্রতিষ্ঠান প্রধানরা শিক্ষকদের আন্তরিকতা, শিক্ষার্থীদের মনোযোগ ও অভিভাবকদের সহযোগিতাকে ভালো ফলাফলের কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। যেমন রংপুর জিলা স্কুলে ২২৩ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস ২১৭ জন, জিপিএ-৫ পেয়েছে ১৫০ জন। রংপুর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে ২৬৯ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস ২৬৪ জন, জিপিএ-৫ পেয়েছে ১৭৭ জন। অন্যদিকে রংপুর ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজে ৫৩৩ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস ৫৩০ জন, জিপিএ-৫ পেয়েছে ৩২৯ জন।
এছড়া পুলিশ লাইন্স স্কুল অ্যান্ড কলেজে ৫৭১ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস ৫৬৭ জন, জিপিএ-৫ পেয়েছে ৩২২ জন। এই প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ অধ্যাপক মো. ওবায়দুল আনোয়ার জানান, সিলেবাস শেষ হওয়ার পর মডেল টেস্টসহ নানা পরীক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের অধিকতর প্রস্তুত করা হয়েছিল।