Monday 29 June 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

লবণাক্ততাকে হার মানিয়ে সবজি চাষ, বদলে দিলেন গ্রামের চিত্র

মৃত‌্যুঞ্জয় রায়
২৯ জুন ২০২৬ ০৮:০৭

সবজিখেতে কৃষক মনোতোষ মণ্ডল। ছবি: সারাবাংলা

সাতক্ষীরা: দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় অঞ্চলের প্রত্যন্ত হাটছালা গ্রাম। পাশেই দেওল ও শংকরকাটি গ্রাম। সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার এই জনপদগুলোর বুক চিরে বয়ে গেছে নোনা পানির চুনা খাল। একসময় অতিরিক্ত লবণাক্ততার কারণে এসব এলাকায় বছরে একটি ফসলের বেশি উৎপাদন সম্ভব হতো না। অধিকাংশ জমি বছরের বড় সময়জুড়েই পড়ে থাকত অনাবাদি।

কিন্তু আজ সেই চিত্র বদলে গেছে। চারদিকে সবুজের সমারোহ, জমিজুড়ে নানা ধরনের শাক-সবজির চাষ। আর এই পরিবর্তনের পেছনে রয়েছেন স্থানীয় কৃষক মনোতোষ মণ্ডল। তার দূরদর্শিতা, কঠোর পরিশ্রম ও উদ্ভাবনী উদ্যোগ বদলে দিয়েছে শতাধিক পরিবারের জীবনযাত্রা।

দীর্ঘ সংগ্রামের গল্প

বিজ্ঞাপন

প্রায় তিন দশক আগে হাটছালা গ্রামের অধিকাংশ জমিতে বর্ষা মৌসুম ছাড়া কোনো ফসল হতো না। লবণাক্ততার কারণে কৃষকেরা ধীরে ধীরে চাষাবাদে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছিলেন। এমন সময় ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নেন মনোতোষ মণ্ডল।

প্রথমে তিনি নিজের বাড়ির আঙিনায় সীমিত পরিসরে শাক-সবজি চাষ শুরু করেন। তবে সফলতার পথ সহজ ছিল না। লবণাক্ত মাটিতে সবজি উৎপাদনের জন্য তাকে দীর্ঘদিন পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও সংগ্রাম করতে হয়েছে।

জমি প্রস্তুত করছেন কৃষক মনোতোষ মণ্ডল। ছবি: সারাবাংলা

জমি প্রস্তুত করছেন কৃষক মনোতোষ মণ্ডল। ছবি: সারাবাংলা

যেভাবে বদলে গেল গ্রামের চিত্র

মনোতোষ মণ্ডল বলেন, একসময় এলাকার মাটিতে লবণের পরিমাণ এত বেশি ছিল যে সাধারণভাবে সবজি চাষ করা সম্ভব ছিল না। তখন তিনি পার্শ্ববর্তী কালীগঞ্জ উপজেলার কৃষ্ণনগর এলাকা থেকে ট্রলিতে করে সবজি চাষের উপযোগী মাটি এনে জমিতে ফেলে উঁচু করেন। এরপর সেখানে বীজ রোপণ শুরু করেন।

কিন্তু আরেকটি বড় সমস্যা ছিল সেচের পানি। চারপাশে ছিল শুধু লবণাক্ত পানির উৎস। তাই আশপাশের জমি কেটে পুকুর খনন করে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের ব্যবস্থা করেন তিনি। সেই সংরক্ষিত মিষ্টি পানি ব্যবহার করেই বর্ষা মৌসুমের বাইরেও সবজি চাষ শুরু হয়।

মনোতোষ মণ্ডল বলেন, ‘সেই সংরক্ষিত পানি ব্যবহার করেই আমাদের দিন বদলের শুরু। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি।’

তিনি জানান, একসময় তিনি ফেরি করে শাঁখা-পলা বিক্রি করতেন। পরে দেড় বিঘা জমিতে সবজি চাষ শুরু করে সাফল্য পান। ২০১৪ সাল থেকে আধুনিক পদ্ধতিতে বাণিজ্যিকভাবে চাষাবাদ শুরু করেন। বর্তমানে তার জমিতে সারা বছরজুড়ে বিভিন্ন ধরনের সবজি উৎপাদিত হয়। এছাড়া বর্তমানে এই গ্রামে উচ্ছে, আলু, ফুলকপি, বাঁধাকপি, ওলকপি, বেগুন, ঢেঁড়স, টমেটো, লাউ, বোম্বাই মরিচ, কাঁচামরিচ, লালশাক ও পালংশাকসহ নানা ধরনের সবজি উৎপাদিত হচ্ছে। সব খরচ বাদ দিয়ে বছরে তার প্রায় ৬ থেকে ৭ লাখ টাকা লাভ হয়।

মনোতোষের হাতে বদলে গেল অন্যদের জীবন

মনোতোষ মণ্ডল ৮০ শতাংশ জমির মালিক। তার দেখানো পথে হেঁটে বর্তমানে হাটছালা গ্রামের অন্তত ১০০টি পরিবার বছরজুড়ে বিভিন্ন ধরনের শাক-সবজি চাষ করে স্বাবলম্বী হয়েছে।

শুধু পরামর্শ দিয়েই তিনি থেমে থাকেননি। শুরুতে মাটি নির্বাচন থেকে শুরু করে নিজের খরচে অনেক কৃষককে বিনামূল্যে সবজির বীজ দিয়েছেন। মাঠে নেমে হাতে-কলমে চাষাবাদের কৌশল শিখিয়েছেন এবং প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও সহযোগিতা করেছেন।

কৃষক শিবব্রত মণ্ডল বলেন, ‘আগে আমাদের সংসারে অনেক অভাব-অনটন ছিল। মনোতোষ দাদা আমাদের বাড়ির আঙিনায় সবজি চাষ করতে উৎসাহ দেন। তিনি বিনামূল্যে বীজ দিয়েছেন, নিয়মিত পরামর্শ দিয়েছেন। আজ তার কারণেই আমাদের সংসারের চিত্র বদলে গেছে। দুই মেয়েকে বিয়ে দিয়েছি, বড় ছেলেকে প্রতিষ্ঠিত করেছি, ছোট ছেলে এখনও লেখাপড়া করছে।’

কৃষক প্রদীপ কুমার মণ্ডল বলেন, ‘মনোতোষ দাদা হাতে-কলমে শিখিয়েছেন কীভাবে জমি প্রস্তুত করতে হবে, কীভাবে পরিচর্যা করতে হবে। তার পরামর্শ অনুসরণ করে দুই বিঘা জমিতে উচ্ছে ও অন্যান্য সবজি চাষ করে গত বছর প্রায় সাড়ে ৭ লাখ টাকা আয় করেছি।’

কৃষক অনুপ মণ্ডল বলেন, ‘মনোতোষ কাকা না থাকলে আমরা হয়তো এখনও বছরে একবার ধান চাষ করেই জমি ফেলে রাখতাম। এখন নিজের জমিতেই কাজ করে ভালো আয় করছি। আগে দিনমজুরি করতে হতো, এখন নিজের জমির ফসলেই সংসার চলে।’

চাষাবাদের প্রধান সংকট সেচের পানি

মনোতোষ মণ্ডল বলেন, কৃষকদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এখনও সেচের পানির সংকট। বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করে কিছুটা চাহিদা পূরণ করা গেলেও শুষ্ক মৌসুমে পাশের গ্রাম থেকে বেশি দামে পানি কিনে সেচ দিতে হয়।

অনুপ মণ্ডল বলেন, ‘আমরা ছোট দুটি পুকুরের পানি দিয়ে সবজি চাষ করি। কিন্তু গরমের সময় পুকুর শুকিয়ে গেলে পলিথিনের পাইপ দিয়ে অন্য এলাকা থেকে পানি টেনে আনতে হয়।’

একইসুরে কথা বলেন ওই গ্রামের কৃষক মকবুল মিয়া বলেন, ‘গরমের সময় অন্য গ্রাম থেকে পানি আনতে হয়, এতে খরচ ও শ্রম দুটোই বেড়ে যায়। এলাকায় যদি স্থায়ী মিষ্টি পানির আধার গড়ে তোলা হয়, তাহলে চাষাবাদ আরও সহজ হবে।’

হাটছালার কৃষি বিপ্লব নিয়ে যা বলছেন সংশ্লিষ্টরা

শ্যামনগর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ওয়ালিউল ইসলাম জানান, হাটছালা গ্রামে প্রতিবছর প্রায় ১ হাজার ৩৮৪ মেট্রিক টন সবজি উৎপাদিত হয়, যার বাজারমূল্য প্রায় ৫ কোটি ৫০ লাখ টাকা।

তিনি বলেন, ‘একজন সাধারণ কৃষকের স্বপ্ন, সাহস ও অধ্যবসায় কীভাবে একটি গ্রামের ভাগ্য বদলে দিতে পারে, তার উজ্জ্বল উদাহরণ হাটছালা গ্রাম। আর এই পরিবর্তনের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন কৃষক মনোতোষ মণ্ডল।’

তিনি আরও জানান, লবণাক্ত জমিতে মনোতোষ মন্ডল যেভাবে সবজি চাষ করে একটি গ্রামকে বদলে দিয়েছেন, তা সত্যিই প্রশংসনীয়। উপকূলীয় অঞ্চলের কৃষকরা তার পদ্ধতি অনুসরণ করলে এ অঞ্চলের কৃষি অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হবে।

স্থানীয় সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান শেখ লিয়াকত আলী বাবু বলেন, ‘মনোতোষ মণ্ডলের উদ্যোগ ও দূরদর্শিতায় হাটছালা গ্রামের চিত্র বদলে গেছে। তিনি শুধু একজন সফল কৃষক নন, এ অঞ্চলের কৃষকদের কাছে অনুপ্রেরণার প্রতীক।’

বিজ্ঞাপন

আরো

মৃত‌্যুঞ্জয় রায় - আরো পড়ুন
সম্পর্কিত খবর