সাতক্ষীরা: ছোট্ট হাতে ক্যানোলা পরিয়ে দেওয়া হচ্ছে স্যালাইন। কিছুতেই কান্না থামছে না। হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডের বাইরের করিডোরে নানির কোলে ছোট্ট জুবায়ের, পাশে হাত দিয়ে স্যালাইনের প্যাকেট উঁচু করে ধরে রেখেছেন নানা। গত তিন দিন ধরে এভাবেই চলছে তাদের। নানি আয়েশা বলেন, ‘আমাদের তো খাওয়া ঘুম নাই। আমরা তিন দিন ধরে হাসপাতালে রাত কাটাচ্ছি। নাতির ডায়রিয়া হলে আমরা সদর হাসপাতালে ভর্তি করি। হাসপাতালের ডাক্তার দেখে তাকে স্যালাইন দিয়েছেন। তখন থেকে কান্না শুরু হয়েছে, থামানো যাচ্ছে না। এদিকে মাঝে মাঝে পায়খানা করছে। ডাক্তার দেখার পর এখন একটু ভালো আছে।’
পাশেই তিন বছরের আবু তাহাকে নিয়ে হাসপাতালে মেঝেতে জায়গা হয়েছেন মা সুবর্ণা। তিনি বলেন, ‘আমরা দুই দিন হলো হাসপাতালে ভর্তি হয়েছি। ছেলের পাঁচ দিন আগে ডায়রিয়া শুরু হয়। আমরা গ্রামের ডাক্তারের কাছে নিয়ে গিয়েছিলাম, কিন্তু ছেলে সুস্থ হচ্ছিল না। পরে আমরা হাসপাতালে এসে ওয়ার্ডে ভর্তি হই। এখন ছেলেটা কিছুটা ভালো আছে। তবে খুব চিন্তায় পড়ে গিয়েছিলাম। যে গরম পড়ছে তার মধ্যে বিদ্যুৎ থাকে না। সবমিলিয়ে অবস্থা খারাপ।’
জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বাড়ছে গরম
সাতক্ষীরা আবহাওয়া অধিদফতরের আবহাওয়াবিদ জুলফিকার আলি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সাতক্ষীরাতে গরম বেশি পড়ে। এই জেলা উপকূলবর্তী হওয়ায় এই জেলায় আবহাওয়া ও জলবায়ুর একটা বড় প্রভাব এই এলাকার মানুষের মাঝে বিরাজমান। শীতের ভাগটা যেমন আগাম আসে তেমনি গরমের ভাগটা অন্যান্য জেলার তুলনায় এই জেলায় বেশি পড়ে।
তীব্র গরমে যে যে রোগ নিয়ে ভর্তি হচ্ছে হাসপাতালগুলোতে
সাতক্ষীরা জেলা সিভিল সার্জন অফিসের সোমবারের তথ্য মতে, সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালে ডায়রিয়া আক্রান্ত রোগী ভর্তি আছেন ২৫ জন, কলারোয়া উপজেলায় ভর্তি আছেন ৪ জন, কালিগজ্ঞে ভর্তি আছে ৪ জন, শ্যামনগরে ভর্তি আছে ৪ জন এবং তালা উপজেলায় ভর্তি আছে ৪ জন রোগী। এদিকে গত তিন মাসের সাতক্ষীরা সিভিল সার্জনের তথ্য মতে সাতক্ষীরায় ডায়রিয়া আক্রান্ত রোগী সেবা নিয়েছেন ১০,৭২৯ জন।
ডায়রিয়া রোগ হলে কি করবেন?
সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজের শিশু বিশেষজ্ঞ ডা শামসুর রহমান বলেন, শীতে ও প্রচন্ড গরমের ডায়রিয়া রোগী বেড়ে যায়। যেহেতু এখন বাচ্চাদের ডায়রিয়া প্রভাবটা বেশি দেখা যাচ্ছে। এই কারনে ডায়রিয়া হলে বেশি চিন্তা না করে মা বাবার সচেতন থাকতে হবে। ৬ মাসের নিচে বাচ্চার যদি ডায়রিয়া হয় তাহলে শুধু মাত্র মায়ের দুধ খাওয়ানো যেতে পারে আর যদি বেশি সমস্যা হয় তাহলে খাওয়ার স্যালাইন খাওয়ানো যেতে পারে। যদি বাচ্চার অতি মাত্রায় বমি, মাথা ব্যাথা, পায়খানা বেশি হয়। প্রস্রাব কমে যায় তখন অতি দ্রুত নিকটস্থ স্বাস্থ্য কেন্দ্রে ভর্তি করাতে হবে। তাহলে সেই বাচ্চার দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শে ভালো হয়ে যাবে।

ডায়রিয়ায় যেসব খাবার থেকে দূরে থাকবেন
সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজের শিশু বিশেষজ্ঞ ডা শামসুর রহমান বলেন, দুগ্ধজাতীয় খাবার খাওয়া যাবে না
তেল যুক্ত খাবার যেমন- ভাজাপোড়া চপ, সিংগারা, ফুচকা, চটপুটি, ও মশলাযুক্ত খাবার খাওয়া যাবে না
গরমে কফি, চা, কোমল পানীয়, রাস্তার পাশের দোকান থেকে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে তৈরি শরবত খাওয়া যাবে না। তাহলে আপনি বা আপনারা ডায়রিয়া রোগ থেকে ভালো থাকতে পারবেন।
ডায়রিয়া কমাবে যেসব খাবার খেলে
শিশু বিশেষজ্ঞ ডা শামসুর রহমান বলেন, প্রচণ্ড গরমে প্রচুর পরিমাণে পানি পান করবেন। শরীর থেকে যত ঘাম বের হবে ততই পানি খাবেন, সাথে খাবার স্যালাইন খাবেন।
পাশাপাশি ডাবের পানি, ভাতের মাড়, চিড়ার পানি, তাজা ফলের রস খাবেন। যাতে করে আপনার শরীর প্রচণ্ড গরমে শীতল করে। তৃষ্ণা না পেলেও প্রচুর পানি পান করুন। পানি ছাড়াও ডাব, জুস, লাচ্ছি, লেবুপানি, দই প্রভৃতি খেতে পারেন। এতে শরীর আর্দ্র থাকবে।
কোথাও যাওয়ার আগে সঙ্গে পানি অবশ্যই নেবেন।
সুযোগ থাকলে একাধিকবার গোসল করতে পারেন। বিশেষ করে, ঘুমানোর আগে গোসল করে দিলে শরীরের তাপমাত্রা কম থাকবে।
হিট স্ট্রোক হলে তার লক্ষণ কি?
সাতক্ষীরা জেলা সিভিল সার্জন অফিসার আব্দুস সালাম বলেন, হিট স্ট্রোক সাধারণত শরীরের উচ্চ তাপমাত্রা অধিক মাত্রায় বেড়ে গেলে বা উঠে গেলে মানুষের হয়ে থাকে। প্রধান লক্ষণ ধরা হয়েছ প্রচণ্ড গরমেও ঘাম বন্ধ হয়ে ত্বক শুষ্ক ও লালচে হওয়া, প্রচণ্ড মাথাব্যথা, দ্রুত শ্বাস-প্রশ্বাস, বমিভাব, খিঁচুনি, বিভ্রান্তি ও অচেতন হয়ে যাওয়া।
হিট স্ট্রোকের প্রাথমিক চিকিৎসা
আব্দুস সালাম বলেন, আক্রান্ত ব্যক্তিকে যত দ্রুত সম্ভব ঠান্ডা করার চেষ্টা করুন। ঠান্ডা পানির ভেজানো নরম কাপড় জড়িয়ে রাখা যেতে পারে। দ্রুত ছায়াযুক্ত স্থান বা শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘরে নিয়ে যান। শরীরের ভারী বা অতিরিক্ত পোশাক খুলে ফেলুন এবং ঢিলেঢালা পোশাক পরান। পুরো শরীর ঠান্ডা পানি দিয়ে স্প্রে করুন বা ভেজা কাপড় দিয়ে মুছে দিন। শরীরে পানি দেওয়ার পর ফ্যানের বাতাস দিন, এতে শরীর দ্রুত ঠান্ডা হবে। রোগী যদি সচেতন ও জ্ঞানসম্পন্ন থাকে, তবে তাকে বারবার পানি, খাবার স্যালাইন বা লেবুর শরবত খাওয়ান। অচেতন হলে খাবার বা পানীয় দেবেন না। রোগীকে কাত করে শুইয়ে দিন, যাতে শ্বাস-প্রশ্বাস ঠিক থাকে।
প্রচণ্ড গরমে কীভাবে ভালো থাকবেন মানুষজন?
সাতক্ষীরা জেলা সার্জন অফিসার ডা আব্দুস সালাম বলেন, সরাসরি রোদে যাওয়া থেকে বা অধিক পরিশ্রম থেকে বিরত থাকুন। বিশেষ করে বেলা ১১টা থেকে তিনটা পর্যন্ত সরাসরি রোদে যাবেন না। এই সময়টা দিনের সবচেয়ে বেশি গরম থাকে।
সূর্যের আলো থেকে চোখ সুরক্ষার জন্য রোদচশমা ব্যবহার করুন। এ ছাড়া সূর্যের আলোয় সরাসরি যাওয়ার পরিবর্তে মাথায় ছাতা, টুপি, পায়ে জুতা-স্যান্ডেল ব্যবহার করুন।
সাতক্ষীরা জেলা সিভিল সার্জন অফিসার আব্দুস সালাম আরো বলেন, আমরা সদর হাসপাতালসহ প্রতিটি উপজেলা হাসপাতাল ও বিভিন্ন কমিউনিটি ক্লিনিক এবং ইপিআই সেশনে স্বাস্থ্য শিক্ষা জোরদার করেছি।
আমাদের পর্যাপ্ত স্যালাইন মজুত আছে। যে-কোনো পরিস্থিতি মোকাবিলা করার মতো প্রস্তুতি আমাদের আছে। সুতরাং আপনাদের কোনো রোগী ডায়রিয়া আক্রান্ত হলে সরাসরি আমাদের স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে ভর্তি করেন পাশাপাশি সঠিক সেবা পাবেন।