Sunday 28 June 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

পরিবেশ সুরক্ষায় কঠোর আইন প্রয়োগের বিকল্প নেই: ড. ফজলে রাব্বি

স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট
২৮ জুন ২০২৬ ১৪:৫৪ | আপডেট: ২৮ জুন ২০২৬ ১৫:৫৭

ঢাকা: পরিবেশ ও জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় কেবল নীতিমালা প্রণয়ন নয়, কার্যকর বাস্তবায়ন, শক্তিশালী রাজনৈতিক অঙ্গীকার এবং সুশাসন নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন সাবেক অতিরিক্ত সচিব ও জলবায়ু বিশেষজ্ঞ ড. ফজলে রাব্বি সাদিক আহমেদ। তিনি বলেন, বাংলাদেশের পরিবেশগত অবক্ষয়ের অর্থনৈতিক ক্ষতি জিডিপির প্রায় ১৭ দশমিক ৫ শতাংশ। তাই উন্নয়ন পরিকল্পনার প্রতিটি স্তরে পরিবেশকে মূলধারায় আনতে না পারলে টেকসই উন্নয়ন সম্ভব হবে না।

রোববার (২৮ জুন) জাতীয় প্রেস ক্লাবের মওলানা আকরাম খাঁ হলে সোসাইটি ফর ন্যাশনাল চ্যারিটি আয়োজিত ‘পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন: বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক প্রেক্ষিত’ শীর্ষক সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে তিনি এসব কথা বলেন।

বিজ্ঞাপন

ড. ফজলে রাব্বি বলেন, বাংলাদেশ উন্নয়নশীল এবং পরবর্তীতে উন্নত দেশে পরিণত হওয়ার লক্ষ্য নিয়ে এগোলেও সেই উন্নয়ন অনেকাংশেই অবকাঠামোকেন্দ্রিক হয়েছে। এর ফলে মাটি, পানি ও বায়ুসহ প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি হয়েছে। একই সময়ে দারিদ্র্য হ্রাস ও জিডিপি প্রবৃদ্ধির গতি কমে যাওয়ায় পরিবেশগত ক্ষতির প্রভাব আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
বিশ্বব্যাংকের এক মূল্যায়ন অনুযায়ী, পরিবেশ দূষণ ও অবক্ষয়ের কারণে দেশের অর্থনীতিতে প্রতিবছর বিপুল ক্ষতি হচ্ছে। শুধু বায়ুদূষণের কারণেই জিডিপির প্রায় ৪ শতাংশের সমপরিমাণ ক্ষতি হচ্ছে, যা অর্থমূল্যে কয়েক লাখ কোটি টাকার সমান।

মূল প্রবন্ধে তিনি বাংলাদেশের পরিবেশগত সংকটকে পাঁচটি প্রধান খাতে ভাগ করেন- ভূমির অবক্ষয়, পানিদূষণ ও পানির সংকট, বায়ুদূষণ, জীববৈচিত্র্যের ক্ষয় এবং জলবায়ু পরিবর্তনজনিত দুর্যোগ।

তিনি বলেন, বায়ুদূষণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ, বিশেষ করে ঢাকা, বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত শহরগুলোর একটি। ক্ষুদ্র বস্তুকণা-এর মাত্রা আন্তর্জাতিক মানের বহু গুণ বেশি। এর ফলে শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি হাঁপানি, ফুসফুসের ক্যানসার, হৃদরোগ, সিওপিডিসহ নানা অসংক্রামক রোগ বাড়ছে।

তিনি অভিযোগ করেন, দেশে পরিবেশ সুরক্ষায় আইন, নীতিমালা ও মাস্টারপ্ল্যান থাকলেও দুর্বল সুশাসন, আইনের যথাযথ প্রয়োগের অভাব, দুর্নীতি এবং রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের কারণে সেগুলোর কার্যকারিতা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠানে নির্গমন ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বিধানও যথাযথভাবে মানা হচ্ছে না।

পানিসম্পদ বিষয়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশ ক্রমেই পানি নিরাপত্তার ঝুঁকির দিকে এগোচ্ছে। ভূগর্ভস্থ পানির অতিরিক্ত উত্তোলন, আন্তঃসীমান্ত নদীর পানিপ্রবাহ কমে যাওয়া, জলাভূমি ধ্বংস এবং নদীদূষণের কারণে পরিস্থিতি উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে। রাজধানী ঢাকার চারপাশের নদীগুলোর দূষণের মাত্রা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে বছরের কিছু সময়ে সেখানে জলজ প্রাণী টিকে থাকার মতো দ্রবীভূত অক্সিজেনও থাকে না।

তিনি আরও বলেন, প্রতিদিন উৎপাদিত বিপুল পরিমাণ কঠিন বর্জ্য ও শিল্পবর্জ্যের বড় অংশ যথাযথভাবে ব্যবস্থাপনা না হওয়ায় তা নদী-খাল ও জলাভূমিতে গিয়ে পড়ছে। এতে ভারী ধাতুসহ নানা বিষাক্ত উপাদান খাদ্যশৃঙ্খলে প্রবেশ করে জনস্বাস্থ্যের জন্য দীর্ঘমেয়াদি হুমকি তৈরি করছে।

ভূমি ও কৃষি নিয়ে আলোচনায় ড. ফজলে রাব্বি বলেন, দেশে অতিরিক্ত রাসায়নিক সার, কীটনাশক ও আগাছানাশকের ব্যবহার মাটির জৈব উপাদান কমিয়ে দিচ্ছে। এতে মাটির উর্বরতা হ্রাস পাচ্ছে এবং খাদ্যের পুষ্টিমানও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। একই সঙ্গে দ্রুত নগরায়ণ ও অবকাঠামো নির্মাণের কারণে কৃষিজমিও কমে যাচ্ছে।

জলবায়ু পরিবর্তন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বৈশ্বিক গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণে বাংলাদেশের অবদান খুবই সামান্য হলেও ক্ষতিগ্রস্ত দেশের তালিকায় বাংলাদেশ অন্যতম। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, খরা ও অনিয়মিত বৃষ্টিপাতের কারণে উপকূলীয় অঞ্চলের কোটি মানুষের জীবন-জীবিকা হুমকির মুখে পড়ছে। ভবিষ্যতে জলবায়ুজনিত অভিবাসনও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।

তিনি বলেন, ২০৫০ সাল পর্যন্ত জলবায়ু অভিযোজন বাস্তবায়নে বাংলাদেশের বিপুল অর্থায়নের প্রয়োজন হবে। এজন্য জাতীয় উদ্যোগের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক জলবায়ু তহবিল, প্রযুক্তি ও সহযোগিতা আরও কার্যকরভাবে কাজে লাগাতে হবে।

প্রবন্ধের সুপারিশে ড. ফজলে রাব্বি বলেন, উন্নয়ন পরিকল্পনার প্রতিটি স্তরে পরিবেশকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। একই সঙ্গে পরিবেশ আইন কঠোরভাবে বাস্তবায়ন, সুশাসন নিশ্চিত, রাজনৈতিক অঙ্গীকার জোরদার এবং আন্তঃসীমান্ত পানি ও বায়ুদূষণ মোকাবিলায় আঞ্চলিক সহযোগিতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। বাংলাদেশে পরিবেশ রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় আইন ও নীতি রয়েছে। এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন সেগুলোর কার্যকর প্রয়োগ এবং পরিবেশকে জাতীয় উন্নয়নের কেন্দ্রীয় অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করা।

আয়োজক সংগঠনের চেয়ারম্যান ড. খন্দকার রাশেদুল হকের সভাপতিত্বে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মানারাত বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. মোহাম্মদ আবদুর রব, ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ড. শামসুল আলমসহ অন্যান্যরা।

সারাবাংলা/এমএমএইচ/এনজে
বিজ্ঞাপন

আরো

সম্পর্কিত খবর