ঢাকা: বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দাম বাড়ানোর ফলে দেশের মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন চাপ তৈরি হবে বলে মনে করছে গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)।
সংস্থাটি বলছে, বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম কমার প্রবণতা শুরু হওয়ার পরও দ্বিতীয় দফায় জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রয়োজন ছিল না। একই সঙ্গে সাম্প্রতিক বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির প্রভাব শিল্প উৎপাদন থেকে শুরু করে ভোক্তা পর্যায় পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়বে।
বৃহস্পতিবার (৪ জুন) রাজধানীর ধানমন্ডিস্থ সিপিডির কার্যালয়ে ‘২০২৫–২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ অর্থনীতি: উত্তরণকালীন সময়ে বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে এসব পর্যবেক্ষণ তুলে ধরা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেন, দেশের অর্থনীতি এখনো নানা ধরনের ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। অভ্যন্তরীণ কাঠামোগত দুর্বলতা ও বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার কারণে অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ আরও জটিল হয়ে উঠেছে। এর মধ্যে উচ্চ মূল্যস্ফীতি অন্যতম বড় সমস্যা।
তিনি বলেন, গত এপ্রিল মাসে দেশের মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৯ দশমিক ০৪ শতাংশে পৌঁছেছে। জ্বালানি, পরিবহন ও বিভিন্ন সেবার ব্যয় বৃদ্ধির কারণে মূল্যস্ফীতির চাপ অব্যাহত রয়েছে। অন্যদিকে মজুরি বৃদ্ধির হার মূল্যস্ফীতির তুলনায় কম থাকায় সাধারণ মানুষের প্রকৃত আয় ও ক্রয়ক্ষমতা কমে যাচ্ছে।
সিপিডির বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত বছরের ডিসেম্বর থেকে চলতি বছরের মে মাস পর্যন্ত ডিজেলের দাম প্রায় ১৫ শতাংশ বেড়েছে। একই সময়ে পেট্রল, অকটেন ও কেরোসিনের দাম বেড়েছে প্রায় ২০ শতাংশ। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব সরাসরি পরিবহন খাতে পড়েছে। এতে যাত্রী ও পণ্য পরিবহন ব্যয় বেড়ে বাজারে পণ্যের দামের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়েছে।
রান্নার গ্যাসের ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। সিপিডির তথ্য অনুযায়ী, মার্চ মাসে ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ছিল ১ হাজার ৩৪১ টাকা। জুনে তা বেড়ে ১ হাজার ৮৮৫ টাকায় পৌঁছেছে, যা ৪০ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি।
সংস্থাটি বলছে, শুধু জ্বালানি নয়, বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং সরবরাহ শৃঙ্খলের নানা সীমাবদ্ধতাও মূল্যস্ফীতিকে উসকে দিচ্ছে। ফাহমিদা খাতুনের ভাষ্য, মধ্যস্বত্বভোগীর একাধিক স্তর থাকায় খুচরা পর্যায়ে অনেক পণ্যের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। এর ফলে সীমিত আয়ের মানুষ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন।
সংবাদ সম্মেলনে সিপিডির জ্যেষ্ঠ গবেষণা সহযোগী হেলেন মাশিয়াত বলেন, দ্বিতীয় দফায় জ্বালানির দাম বাড়ানোর যৌক্তিকতা ছিল না। তার মতে, কম বিদ্যুৎ ব্যবহারকারী গ্রাহকদের সুরক্ষা দিয়ে বেশি বিদ্যুৎ ব্যবহারকারীদের জন্য পৃথক মূল্যহার নির্ধারণ করা যেতে পারত।
সিপিডির মতে, বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির ফলে শিল্প ও উৎপাদন খাতের ব্যয় বাড়বে। এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত ভোক্তা পর্যায়ে গিয়ে মূল্যস্ফীতি আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। একই সঙ্গে রাজস্ব আহরণে ঘাটতি, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা এবং আর্থিক খাতের নানা সমস্যার কারণে অর্থনীতির ওপর চাপ রয়ে গেছে।
সংবাদ সম্মেলনে সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি প্রত্যক্ষভাবে ভোক্তাদের ওপর বাড়তি বোঝা সৃষ্টি করবে। তবে সরকার উপযুক্ত নীতিগত পদক্ষেপ নিলে এর কিছু নেতিবাচক প্রভাব প্রশমিত করা সম্ভব।
সিপিডি আরও বলেছে, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের রাজস্ব আহরণ লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় পিছিয়ে রয়েছে। পাশাপাশি খেলাপি ঋণ কিছুটা কমলেও ব্যাংকিং খাতের সামগ্রিক পরিস্থিতিতে উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি। এ অবস্থায় সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নবম পে-স্কেল বাস্তবায়ন করা হলে বাজারে চাহিদা বাড়ার মাধ্যমে মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন চাপ তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছে সংস্থাটি।