ঢাকা: বাংলাদেশে কাগজ-কলমে ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনার আধুনিক আইন থাকলেও মাঠপর্যায়ে এর প্রয়োগ পুরোপুরি শূন্য। ফলে প্রতি বছর দেশে উৎপাদিত প্রায় ৩০ লাখ মেট্রিক টন ই-বর্জ্যের মাত্র ১০ শতাংশের কম পুনর্ব্যবহারযোগ্য হচ্ছে। বিধিমালা বাস্তবায়নে এই চরম নিষ্ক্রিয়তার কারণে দেশ বছরে প্রায় ২০০ থেকে ২২১ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ সম্ভাব্য অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের সুযোগ হারাচ্ছে।
শনিবার (২৩ মে) রাজধানীর এনজিও ফোরাম ফর পাবলিক হেলথ মিলনায়তনে বেসরকারি অধিকার-ভিত্তিক উন্নয়ন সংস্থা ‘ভয়েস’ এবং ‘অ্যাসোসিয়েসন ফর প্রগ্রেসিভ কমিউনিকেশন (এপিসি)’-এর যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে আসে।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, জরিপে অংশ নেওয়া শতভাগ প্রতিষ্ঠান পরিবেশ অধিদফতরে নিবন্ধিত হলেও বিগত অর্থবছরে তাদের কেউই একটিও মেয়াদোত্তীর্ণ পণ্য সংগ্রহ করেনি। এছাড়া ৭৮ শতাংশ প্রতিষ্ঠানের কোনো টেক-ব্যাক বা পণ্য ফেরত নেওয়ার ব্যবস্থা নেই এবং মাত্র ২২ শতাংশ প্রতিষ্ঠান ক্ষতিকারক পদার্থ নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত ‘রোহস’ (RoHS) মান যাচাই করে। এমনকি বিপজ্জনক বর্জ্যের সঠিক সংরক্ষণ বা তথ্য সংরক্ষণের বালাই নেই কোনো প্রতিষ্ঠানেই। ই-বর্জ্যের এমন অব্যবস্থাপনার কারণে দেশে শিশুমৃত্যু, মাতৃমৃত্যু ও অকালমৃত্যুর মতো মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে বলে সভায় সতর্ক করা হয়।
অনুষ্ঠানে ভয়েস-এর নির্বাহী পরিচালক আহমেদ স্বপন মাহমুদ এই উদ্যোগের কৌশলগত প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ বর্জ্য (ই-বর্জ্য) ব্যবস্থাপনা বিধিমালা, ২০২১ প্রণয়নের মাধ্যমে বাংলাদেশ একটি ইতিহাস তৈরি করেছিল। কিন্তু শুধুমাত্র আইনগুলো কাগজ-কলমে থাকলেই তা সমাজ কিংবা পরিবেশকে রক্ষা করতে পারে না, এর জন্য প্রয়োজন সঠিক বাস্তবায়ন।
ই-বর্জ্যের ক্ষতিকর দিকগুলো তুলে ধরেন ভয়েস-এর ডেপুটি ডিরেক্টর (প্রোগ্রামস) মুশাররাত মাহেরা। তিনি বলেন, ই-বর্জ্য অব্যবস্থাপনার কারণে পরিবেশের ওপর মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাব পড়ছে। যার কারণে শিশুমৃত্যু, মাতৃমৃত্যু, অকালমৃত্যু বাড়ছে। এর ভয়াবহতা কমাতে দ্রুতই কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন।
প্রতিবেদনের মূল ফলাফল ও পদ্ধতি সম্পর্কে আলোচনা করেন প্রতিবেদনের মূল লেখক ভয়েস-এর বন্ধন দাস। তিনি বলেন, আমাদের প্রাপ্ত তথ্য একটি মিশ্র চিত্র তুলে ধরে। কাগজে আইনি সদিচ্ছা থাকলেও মাঠপর্যায়ে কোনো প্রয়োগ নেই। উৎপাদকের জবাবদিহিতা ব্যবস্থা প্রায় অকার্যকর এবং যে শ্রমিকরা স্বাস্থ্যগত সুরক্ষা ছাড়াই তা করছেন। এই প্রতিবেদনটি কেবল একটি নথি নয়, এটি নাগরিক সমাজের জন্য একটি জরুরি সতর্কবার্তা।
উন্নয়নধারা ট্রাস্ট-এর মো. আমিনুল রাসেল বলেন, পরিবেশগত বৃহত্তর প্রেক্ষাপট তুলে ধরে বলেন, “ই-বর্জ্য বিষয়টি প্রথমে ইতিবাচকভাবে তুলে ধরা হলেও, পরবর্তীতে বিভিন্ন দূর্ঘটনার পর নেতিবাচক বিষয়গুলো উঠে আসে।বিভিন্ন গবেষণায় দেখে গেছে, ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় বিভিন্ন নিয়ম থাকলেও বাস্তবিক ক্ষেত্রে সেগুলো মানা হয় না। তাই, নীতিনির্ধারকদের প্রভাবিত করতে ব্যাপক মিডিয়া কভারেজ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের মিহির বিশ্বাস দুইটি প্রস্তাবনা উল্লেখ করে বলেন, প্রথমেই সুনির্দিষ্ট চ্যালেঞ্জগুলোকে চিহ্নিত করা এবং যে সুপারিশগুলো উঠে এসেছে, সেগুলো বাস্তবায়নে সমন্বিত আলোচনা চালিয়ে যাওয়া।
সবশেষে উপস্থিত সকলে ই-বর্জ্য নীতি প্রয়োগ এবং পরিবেশগত জবাবদিহিতা জোরদার করার জন্য সমন্বিত এবং টেকসই প্রচেষ্টার আহ্বান জানান। ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে এই ক্রমবর্ধমান ঝুঁকি থেকে রক্ষা করার সম্মিলিত প্রচেষ্টার কথা উল্লেখ করেন।