Thursday 13 August 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment
English

রাজশাহী জেলা বিএনপি / ৩ মাসের আহ্বায়ক কমিটিতে পার ৮ বছর

শামীম সবুজ, ডিস্ট্রিক্ট করেসপন্ডেন্ট
১৩ আগস্ট ২০২৬ ০৮:১০

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি। ফাইল ছবি

রাজশাহী: রাজশাহী জেলা বিএনপির ৪১ সদস্য বিশিষ্ট আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করা হয় ২০১৯ সালের ৬ জুলাই, যার মেয়াদ ছিল তিন মাস। কিন্তু তিন মাসের সেই কমিটি পার করেছে আট বছর। সময়ের হিসাবে আট বছর পার হলেও পূর্ণাঙ্গ কিংবা নতুন কমিটি গঠন না হওয়ায় এর সাংগঠনিক কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন দলের তৃণমূলের নেতাকর্মীরা। দীর্ঘদিন ধরে আহ্বায়ক কমিটি দিয়ে সংগঠন পরিচালিত হওয়ায় দলে নেতৃত্বের সংকট ও অভ্যন্তরীণ কোন্দল বেড়েই চলেছে।

২০১৯ সালে ঘোষিত ওই কমিটিতে কেন্দ্রীয় বিএনপির সদস্য ও চারঘাট উপজেলা বিএনপির সভাপতি এবং রাজশাহী-৬ আসনের বর্তমান সংসদ সদস্য আবু সাঈদ চাঁদকে আহ্বায়ক এবং বিশ্বনাথ সরকারকে সদস্যসচিব করা হয়। ঘোষণার সময় তিন মাসের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠনের কথা বলা হলেও দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন হয়নি।

বিজ্ঞাপন

জানা গেছে, এই দীর্ঘ সময়ে জেলার অধীনে থাকা ২৩টি সাংগঠনিক ইউনিটের মধ্যে ১৭টির সম্মেলন হয়েছে। কিন্তু সেগুলোরও পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা হয়নি। এ ছাড়া বাকি ইউনিটগুলোর সম্মেলনও দীর্ঘ দিন ধরে আটকে আছে। আর নিয়মিত সম্মেলন না হওয়ায় কর্মসূচি, সাংগঠনিক মূল্যায়ন ও নতুন নেতৃত্ব তৈরির প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বলে অভিযোগ স্থানীয় নেতাকর্মীদের।

দলীয় একাধিক সূত্র জানায়, বর্তমান আহ্বায়ক আবু সাঈদ চাঁদ এবং সদস্যসচিব বিশ্বনাথ সরকারের সম্পর্ক আগের মতো নেই। বিভিন্ন সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক বিষয়ে মতপার্থক্য এখন প্রকাশ্য বিরোধে রূপ নিয়েছে। এমনকি দীর্ঘদিন ধরে তাদের মধ্যে যোগাযোগও প্রায় বন্ধ বলে দাবি দলের একাধিক নেতার। ফলে জেলা বিএনপির সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড আরও মন্থর হয়ে পড়েছে বলে মনে করছেন তৃণমূলের নেতাকর্মীরা।

জানা গেছে, গোদাগাড়ী-তানোরে বিএনপির ইউনিয়ন কমিটিগুলো নিজের মতো করে দিতে চাচ্ছিলেন বিশ্বনাথ সরকার। তবে তাতে বাধা দেন আবু সাঈদ চাঁদ। এরপর দু’জনের সম্পর্কের অবনতি হয়। তাদের প্রকাশ্য বিরোধ শুরু হয় রাজশাহী-৫ আসনের ইউনিয়ন কমিটি গঠনকে কেন্দ্র করে। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে রাজশাহী জেলা বিএনপির সদস্যসচিব বিশ্বনাথ সরকার সারাবাংলাকে বলেন, ‘আমাদের মধ্যে তেমন কোনো বিরোধ নেই। কর্মীরা কী ভেবে এসব কথা বলেছেন, তা আমার জানা নেই।’

অন্যদিকে পদপ্রত্যাশী নেতারা বলছেন, বর্তমান কমিটির আগে ২০১৬ সালের ২৬ ডিসেম্বর তোফাজ্জেল হোসেন তপুকে সভাপতি এবং মতিউর রহমান মন্টুকে সাধারণ সম্পাদক করে ৭১ সদস্যবিশিষ্ট জেলা কমিটি গঠন করা হয়েছিল। আড়াই বছরের মাথায় সেই কমিটি বিলুপ্ত করে নতুন আহ্বায়ক কমিটি দেওয়া হয়। অথচ মাত্র তিন মাসের জন্য ঘোষিত বর্তমান আহ্বায়ক কমিটি আট বছর অতিক্রম করলেও এখন পর্যন্ত নতুন কমিটি ঘোষণা করা হয়নি। এতে তৃণমূলের নেতাকর্মীদের মধ্যে হতাশা ও ক্ষোভ বাড়ছে।

তৃণমূলের নেতাকর্মীরা বলছে, নতুন কমিটি হলে সাংগঠনিক কার্যক্রমে গতি ফিরবে। ত্যাগী নেতাদের মূল্যায়নের দাবি জানিয়ে জেলা বিএনপির কর্মী আলমগীর সারাবাংলাকে বলেন, ‘বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান যে দল পুনর্গঠনের উদ্যোগ নিয়েছেন, সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নে তরুণ, উদ্যমী, শিক্ষিত এবং ত্যাগী নেতৃত্বকে দায়িত্ব দেওয়া সময়ের দাবি।’ একই সঙ্গে প্রবীণ নেতাদের অভিজ্ঞতা ও তরুণদের উদ্যমের সমন্বয়ে একটি ভারসাম্যপূর্ণ কমিটি গঠন হলে রাজশাহী জেলা বিএনপি নতুন করে সাংগঠনিক শক্তি ফিরে পাবে বলে মনে করেন তিনি।

এদিকে জেলা বিএনপির সভাপতি পদে আলোচনায় রয়েছেন রাজশাহী জেলা শ্রমিকদলের সভাপতি ও জেলা বিএনপির আহব্বায়ক কমিটির সদস্য মো. রোকুনুজ্জামান আলম, যুবদলের সাবেক আহ্বায়ক ও জেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম-আহ্বায়ক আনোয়ার হোসেন উজ্জ্বল, পুঠিয়া উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক ও জেলা বিএনপির সদস্য আবু বকর সিদ্দিক, জেলা ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি ও জেলা বিএনপির সদস্য রাইহানুল আলম।

অন্যদিকে সাধারণ সম্পাদক পদে আলোচনায় রয়েছেন- জেলা যুবদলের সাবেক সভাপতি মোজাদ্দেদ জামানী সুমন, জেলা যুবদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও বর্তমান কৃষক দলের আহ্বায়ক সফিকুল আলম সমাপ্ত, জেলা যুবদলের বর্তমান সদস্য সচিব রেজাউল করিম টুটুল, মহানগর ছাত্রদলের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক ও জেলা বিএনপির সদস্য তোফায়েল আহমেদ রাজু, জেলা বিএনপির সদস্য ও পুঠিয়া বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক আমিনুল ইসলাম মিন্টু, মহানগর কৃষক দলের সাবেক আহ্বায়ক ও কেন্দ্রীয় কৃষক দলের সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক ওয়াদুদ হাসান পিন্টু, বাগমারা উপজেলা বিএনপির সদস্যসচিব কামাল হোসেন।

রাজশাহী জেলা যুবদলের সদস্য সচিব ও জেলা বিএনপির সম্ভাব্য সাধারণ সম্পাদক প্রার্থী রেজাউল করিম টুটুল সারাবাংলাকে বলেন, ‘বিগত স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে যারা রাজপথে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন, জেল-জুলুম ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান আগামী দিনের নেতৃত্বে তাদেরকেই মূল্যায়ন করবেন এবং সামনে নিয়ে আসবেন।’

কমিটির বিষয়ে বর্তমান কমিটির আহ্বায়ক ও রাজশাহী-৬ (বাঘা-চারঘাট) আসনের এমপি আবু সাঈদ চাঁদ সারাবাংলাকে বলেন, ‘আমাদের নেতৃত্বাধীন কমিটি আন্দোলন-সংগ্রামে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করেছি। আমাদের ২৩টি ইউনিটের প্রায় সবগুলোতেই কমিটি করা হয়েছে। কাউন্সিল করে বাকিগুলোও তাড়াতাড়ি করে ফেলব।’

বিএনপির রাজশাহী বিভাগীয় কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট সৈয়দ শাহীন শওকত সারাবাংলাকে বলেন, ‘২০১৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার শাসনামলে মামলা, হামলা, হয়রানি এবং গণহারে গ্রেফতারের কারণে দেশের কোনো জেলাতেই বিএনপি স্বাভাবিকভাবে সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারেনি। ৫ আগস্টের পর গত দুই বছর ধরে বিএনপিকে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক বিষয় নিয়ে কাজ করতে হয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘এখন জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে বিএনপি সরকার গঠন করেছে, যা দলীয় নেতাকর্মীদের দীর্ঘদিনের ত্যাগ ও পরিশ্রমের ফসল। তবে এ সময়ের মধ্যে অনেক সাংগঠনিক কমিটির মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। দলের কেন্দ্রীয় রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করে এসব কমিটির বিষয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’

তৃণমূলের নেতাকর্মীদের প্রত্যাশা, দীর্ঘদিনের স্থবিরতা কাটিয়ে রাজশাহী জেলা বিএনপিতে দ্রুত একটি পূর্ণাঙ্গ ও কার্যকর কমিটি ঘোষণা করবে কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব।