রংপুর: সাভার থানা ছাত্রদলের সহসভাপতি মোনারুল ইসলাম বকসী (২৯) গত বৃহস্পতিবার রাতে বাংলাদেশ লোকপ্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের (বিপিএটিসি) আবাসিক ভবনের ছাদ থেকে পড়ে মারা যান। তার বাবা ওই প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তারক্ষী। পুলিশ জানায়, পীরগাছার নিখোঁজ এক কিশোরীকে উদ্ধারে ওই ফ্ল্যাটে অভিযান চালানো হয়। কিন্তু মোনারুলের পরিবারের অভিযোগ, তাকে পরিকল্পিতভাবে ধাক্কা দিয়ে ছাদ থেকে ফেলে দেওয়া হয়েছে। শনিবার (৮ আগস্ট) সকালে পীরগাছা থানার সামনে মোনারুলের মরদেহ নিয়ে বিক্ষোভ করেন স্বজনরা। পরে স্থানীয় নেতাদের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে। ময়নাতদন্ত শেষে গ্রামের বাড়ি গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে দাফন সম্পন্ন হয়েছে। এ ঘটনায় এখনো মামলা হয়নি।
পুলিশ ও পরিবার সূত্রে জানা যায়, পীরগাছার এক কিশোরী নিখোঁজ হলে তার বাবা পীরগাছা থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। গোপন তথ্যের ভিত্তিতে সাভার মডেল থানা ও রংপুরের পীরগাছা থানার পুলিশ সদস্যরা গত বৃহস্পতিবার রাতে বিপিএটিসির আবাসিক ভবনের একটি ফ্ল্যাটে অভিযান চালান। ওই ফ্ল্যাটে থাকতেন মোনারুল ও তার পরিবার।
স্বজনদের দাবি, নিখোঁজ কিশোরীর সঙ্গে মোনারুলের এক ভাগনের প্রেমের সম্পর্ক ছিল। তারা স্বেচ্ছায় বিয়ে করে সাভারে অবস্থান করছিলেন। কিশোরীর বাবা মিন্টু পুলিশের সহায়তা নিয়ে ওই ফ্ল্যাটে যান এবং সেখানেই ঘটনা ঘটে।
পীরগাছা থানার ওসি সেলিম মালিক জানান, নিখোঁজ কিশোরীর সন্ধানে পুলিশ অভিযান চালায়। ঘটনার সময় ছাদ থেকে ভারী কিছু পড়ার শব্দ পাওয়া যায়। পরে মোনারুলের মরদেহ উদ্ধার করে রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তবে স্বজনদের অভিযোগ, পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে দ্রুত চলে যায় এবং মোনারুলকে বাঁচানোর কোনো উদ্যোগ নেয়নি।
মোনারুলের ভাই মমদেল হোসেন বকসী অভিযোগ করেন, ‘পুলিশের সহযোগিতা নিয়ে ওই কিশোরীর বাবা মিন্টু আমার ভাইকে ছাদ থেকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয়। ছাদে কথা-কাটাকাটির এক পর্যায়ে সে ধাক্কা দেয়। নিচে নেমে বলে তাড়াতাড়ি হাসপাতালে নিয়ে যান। পরে পুলিশসহ তারা চলে যান, কিন্তু ভাইকে বাঁচাতে পারিনি।’
পরিবারের অভিযোগ, এটি পরিকল্পিত হত্যা। তারা দাবি করেছেন, ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। শনিবার সকাল ৮টায় পীরগাছা থানার সামনে অ্যাম্বুলেন্স থামালে মোনারুলের বাবা জাফর আলী বকসী বিলাপ করতে থাকেন। তার কথায় ফুটে ওঠে আক্ষেপ— ‘ও বাবা, বাবারে। তোক মারলে বাবা পুলিশেরে। এই পীরগাছার পুলিশে মারলে বাবা। টাকা খায়া মারলে বাবাক।’
খবর পেয়ে দক্ষিণ হাতিবান্ধা গ্রামের দেড় শতাধিক মানুষ থানার সামনে জড়ো হন। তারা বিক্ষোভ দেখান এবং পুলিশের সঙ্গে উত্তেজনাকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। পরে পীরগাছা উপজেলা ছাত্রদলের সদস্যসচিব মোফাচ্ছিরুল ইসলামসহ স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি শান্ত হয়।
মোফাচ্ছিরুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত অপরাধীদের বিচার চাই। সাধারণ মানুষ যেন হয়রানির শিকার না হয় এবং দোষীরা যেন ছাড় না পায়।’
এ ঘটনায় আজ সন্ধ্যা পর্যন্ত পীরগাছা বা সাভার মডেল থানায় কোনো মামলা দায়ের হয়নি। মমদেল হোসেন বকসী জানান, মরদেহ দাফনের কাজে ব্যস্ত থাকায় তারা আজ মামলা করতে পারেননি। তবে পরিবারের পক্ষ থেকে দ্রুত সাভার মডেল থানায় মামলা করা হবে বলে জানিয়েছেন তিনি।
সাভার মডেল থানার ওসি সাইফুল আলম জানান, ময়নাতদন্ত শেষে গতকাল বিকেলে মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। এখনো কেউ অভিযোগ বা মামলা করেননি। তবে তদন্ত কমিটি ঘটনার সব দিক খতিয়ে দেখছে।
মোনারুল ইসলাম বকসী সাভার থানা ছাত্রদলের সহসভাপতি ছিলেন। তার বাবা জাফর আলী বকসী বিপিএটিসির নিরাপত্তারক্ষী হিসেবে কর্মরত। প্রতিষ্ঠানের আবাসিক ভবনে বাবার ফ্ল্যাটে থাকতেন মোনারুল। তার গ্রামের বাড়ি গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জের দক্ষিণ হাতিবান্ধায়।
আজ জোহরের নামাজ শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়েছে। মৃত্যুর এই ঘটনা এলাকায় শোকের ছায়া ফেলেছে। একইসঙ্গে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে।
পুলিশের পক্ষ থেকে ঘটনা তদন্তে পাঁচ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে ঘটনার প্রকৃত কারণ, মৃত্যুর পেছনের রহস্য এবং দায়ীদের চিহ্নিত করতে বলা হয়েছে। তবে স্বজনরা চান, নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে সত্য বেরিয়ে আসুক এবং হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত সবাই যেন শাস্তি পায়।