সিলেট: সাধারণত অনুমোদন নেওয়া হয় এসি বাস হিসেবে। এরপর ভেতরের কাঠামো বদলে বসানো হলো শোবার কেবিন— তৈরি করা হলো দুই স্তরের স্লিপার বাস। কিন্তু সেই পরিবর্তিত কাঠামোর জন্য নেওয়া হলো না নতুন কোনো অনুমোদন, করা হলো না নতুন করে ফিটনেস পরীক্ষা। এভাবেই কাগজে সাধারণ বাস, আর মহাসড়কে ডাবল ডেকার স্লিপার বাস। সিলেটের ওসমানীনগরে ৯ জন যাত্রীর প্রাণ কেড়ে নেওয়া বেঙ্গল পরিবহনের বাসটি নিয়ে অনুসন্ধানে ভয়ানক এমন তথ্য সামনে এসেছে। জনমনে প্রশ্ন উঠেছে, অনুমোদনহীন এসব বাস কীভাবে বছরের পর বছর মহাসড়কে চলছে?
বিআরটিএ বলছে, দেশে স্লিপার বাসের বৈধ অনুমোদন নেই। হাইওয়ে পুলিশের বক্তব্য, এসব বাস অবৈধ—এমন কোনো তথ্য বা নির্দেশনা তাদের দেওয়া হয়নি—তাহলে কার ইশারায় মহাসড়কে চলছে এই অবৈধ বাসগুলো?
ওভারটেক করতে গিয়ে সংঘর্ষ, প্রাণ গেল ৯ জনের
শুক্রবার (৭ আগস্ট) ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের ওসমানীনগরে ইউনিক পরিবহন ও বেঙ্গল পরিবহনের মুখোমুখি সংঘর্ষে ৯ জনের মর্মান্তিক মৃত্যুর পর নড়েচড়ে বসেছে সবাই। ড্যাশবোর্ড ক্যামেরার একটি ভিডিওতে পরিষ্কার দেখা গেছে, নিয়ন্ত্রণহীন বেঙ্গল পরিবহনের একটি এসি স্লিপার বাস ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেক করতে গিয়ে সজোরে ধাক্কা দেয় ঢাকাগামী ইউনিক পরিবহনের বাসটিকে, যা ছিটকে পড়ে ধানখেতে। নিহত সবাই ছিলেন ইউনিক পরিবহনের যাত্রী।
অনুমোদন সাধারণ বাসের, রূপ বদলে স্লিপার
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বেঙ্গল ও প্যারাডাইস পরিবহনের মতো বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান সাধারণ এসি বাস বা চেসিস হিসেবে বিআরটিএ থেকে অনুমতি ও ফিটনেস নেয়। কিন্তু অনুমতি পাওয়ার পরই সেগুলোকে ডাবল ডেকার স্লিপার বাসে রূপান্তর করা হয়। পরিবর্তিত এই কাঠামোর জন্য কোনো নতুন অনুমোদন বা ফিটনেস পরীক্ষা করা হয় না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের স্লিপার বাসের বডি ও চেসিস সাধারণ বাসের হওয়ায় জরুরি মুহূর্তে এগুলো ভারসাম্য রাখতে পারে না। বিআরটিএ সিলেট কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক রফিকুল ইসলাম স্বীকার করেছেন যে দেশে স্লিপার বাসের কোনো বৈধ অনুমোদনই নেই।
অন্যদিকে হাইওয়ে পুলিশের সুপার রেজাউল করিম দাবি করেছেন, বাসগুলো অবৈধ—এমন কোনো তথ্য বা নির্দেশনা বিআরটিএ তাদের দেয়নি।
যাত্রীরা বলছেন, কাগজে যদি সাধারণ বাস, আর বাস্তবে যদি সেটি রূপান্তরিত ডাবল ডেকার স্লিপার হয়, তাহলে তার নিরাপত্তা যাচাই হবে কোন মানদণ্ডে? পরিবর্তিত কাঠামোর ফিটনেস কে পরীক্ষা করবে? আর বিআরটিএ যদি বলে অনুমোদন নেই, তাহলে সেই বাস মহাসড়কে চলাচলের সুযোগ পাচ্ছে কীভাবে?
স্লিপার বাস বন্ধে হাইকোর্টে রিট
এসব স্লিপার বাসের বৈধতা নিয়ে উচ্চ আদালতেও প্রশ্ন উঠেছে। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে দায়ের করা এক রিটের পর তথ্য অধিকার আইনের আওতায় বিআরটিএ লিখিতভাবে জানায়, ভারত থেকে আমদানি করা চেসিসে নির্মিত স্লিপার বাস চলাচলের কোনো অনুমতি তারা দেয়নি। ওই তথ্যের ভিত্তিতে অননুমোদিত স্লিপার বাস চলাচল বন্ধে হাইকোর্টে রিট আবেদন করা হয়।
সিলেট জেলা সড়ক পরিবহন ইউনিয়নের সভাপতি ময়নুল হক আরও বিস্ফোরক অভিযোগ করে বলেছেন, সংশ্লিষ্ট দফতরের কর্মকর্তাদের আর্থিক সুবিধা দিয়েই বিআরটিএ ও পুলিশের চোখের সামনে বুক ফুলিয়ে বছরের পর বছর এই অবৈধ স্লিপার বাসগুলো মহাসড়কে চালিয়ে আসছে মালিকপক্ষ।
যা বলছে হাইওয়ে পুলিশ
অনুমোদনহীন স্লিপার বাস চলাচলের বিষয়ে জানতে চাইলে সিলেট হাইওয়ে পুলিশের পুলিশ সুপার রেজাউল করিম বলেন, ‘দুর্ঘটনায় জড়িত বেঙ্গল পরিবহনের বাসটি একটি এসি স্লিপার বাস। এসব এসি স্লিপার বাস অবৈধ, এ বিষয়ে বিআরটিএ আমাদের কোনো তথ্য বা নির্দেশনা দেয়নি। যদি তারা চিঠি দিত, তাহলে আমরা ব্যবস্থা নিতাম।’ একই সঙ্গে তিনি প্রাথমিকভাবে বেপরোয়া গতি ও ওভারটেকিংকে দুর্ঘটনার কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন।
৫ সদস্যের তদন্ত কমিটি
এদিকে মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় নারী ও শিশুসহ ৯ জন নিহতের ঘটনায় সিলেটের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (এডিএম) পিংকি সাহাকে প্রধান করে শনিবার (৮ আগস্ট) দুপুরে ৫ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে জেলা প্রশাসন। কমিটিকে দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ অনুসন্ধান করে আগামী ৫ কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। তদন্ত কমিটিতে সিলেটের হাইওয়ে পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস, সড়ক ও জনপথ বিভাগ এবং ওসমানীনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে (ইউএনও) সদস্য করা হয়েছে।
২ বাসের রেজিস্ট্রেশন বাতিল
অন্যদিকে সড়ক দুর্ঘটনায় ৯ জন নিহতের ঘটনায় ‘ইউনিক ও বেঙ্গল পরিবহনের’ দুই বাসের রেজিস্ট্রেশন বাতিল করেছে সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)। একই সঙ্গে এই দুই বাসের মালিক ও চালককে ৫ দিনের মধ্যে বিআরটিএ কার্যালয়ে স্বশরীরে হাজির হয়ে দুর্ঘটনার ব্যাপারে ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়েছে।
শনিবার (৮ আগস্ট) রাতে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন বিআরটি সিলেট অফিসের সহকারী পরিচালক ইঞ্জিনিয়ার আব্দুর রশীদ। তিনি বলেন, ‘তাদের ব্যাখ্যা পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ ব্যাপারে দোষীদের কোন ছাড় দেওয়া হবে না।’