Saturday 30 May 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

শহিদ জিয়ার ‘১৯ দফা’ ছিল অর্থনৈতিক মুক্তির মহাপরিকল্পনা

স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট
৩০ মে ২০২৬ ২১:০৫

জিয়াউর রহমান ঘোষিত ১৯ দফা। ছবি কোলাজ: সারাবাংলা

ঢাকা: মহান স্বাধীনতার ঘোষক শহিদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান স্বাধীনতাত্তোর বাংলাদেশে ১৯ দফা কর্মসূচি ঘোষণা করেছিলেন, যা ছিল যুগান্তকারী পদক্ষেপ। ১৯ দফা কর্মসূচির মূল উদ্দেশ্য ছিল উন্নয়নের হার বাড়ানো। উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বাড়ানোর লক্ষ্যে পরনির্ভরশীলতা কমানো, আয়ের সুষম বণ্টন, জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার কমিয়ে আনা, খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন। এ জন্য ১৯৮০ সালের জুলাইয়ে দ্বিতীয় পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় জনগণের অর্থনৈতিক মুক্তির জন্য জিয়াউর রহমান ব্যাপক কর্মসূচি নেন।

জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন, খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি, জনসংখ্যা বৃদ্ধি রোধ, নিরক্ষরতা দূরীকরণ, সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার ও রফতানি আয় বৃদ্ধির মাধ্যমে স্বনির্ভরতা অর্জন ছিল তার দূরদৃষ্টি সৃষ্ট পরিকল্পনা। আর প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ ও স্থানীয় স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে গ্রামের জনগণকে সম্পৃক্ত করে গ্রামীণ জীবনযাত্রার মান উন্নত করা ছিল তার পরিকল্পনার অন্যতম লক্ষ্য।

বিজ্ঞাপন

১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর সিপাহী-জনতার বিপ্লবের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতার ঘোষক ও তৎকালীন সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমান রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে আসেন। তিনি দেশের ভঙ্গুর অর্থনীতিতে আবারও প্রাণ ফেরানোর লড়াইয়ে নামেন। জিয়াউর রহমান ১৯৭৬ সালে কলম্বোতে জোটনিরপেক্ষ আন্দোলন সম্মেলনে যোগদান করেন এবং বাংলাদেশ সাত জাতি গ্রুপের চেয়ারম্যান পদে পদোন্নতি লাভ করেন। সে বছরেই তিনি উলশি যদুনাথপুর থেকে স্বেচ্ছাশ্রমে খাল খনন উদ্বোধন করেন।

১৯৭৭ সালের ২২ এপ্রিল জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নিয়ে জাতির উদ্দেশে বেতার ও টেলিভিশনে দেওয়া ভাষণে গণভোটের ঘোষণা দিয়েছিলেন। এর ধারাবাহিকতায় ৩০ এপ্রিল ১৯ দফা কর্মসূচি ঘোষণা করেন। বিএনপি বা যেকোনো রাজনৈতিক দল যদি জিয়াউর রহমানের ১৯ দফা কর্মসূচি বাস্তবায়ন করে, তাহলে জাতীয় জীবনের বেশিরভাগ সমস্যা সমাধান হওয়া সম্ভব।

কী ছিল জিয়াউর রহমানের ১৯ দফায়-

  • সর্বোতভাবে দেশের স্বাধীনতা, অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা।
  • শাসনতন্ত্রের চারটি মূলনীতি অর্থাৎ সর্বশক্তিমান আল্লাহর প্রতি পূর্ণ বিশ্বাস ও আস্থা, গণতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ এবং সামাজিক ও অর্থনৈতিক ন্যায়বিচারের সমাজতন্ত্র জাতীয় জীবনের সর্বস্তরে প্রতিফলন করা।
  • সর্ব উপায়ে নিজেদেরকে একটি আত্বনির্ভরশীল জাতি হিসেবে গড়ে তোলা।
  • প্রশাসনের সর্বস্তরে, উন্নয়ন কার্যক্রম এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার বিষয়ে জনসাধারণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা।
  • সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে কৃষি উন্নয়নের মাধ্যমে গ্রামীণ তথা জাতীয় অর্থনীতিকে জোরদার করা।
  • দেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করা এবং কেউ যেন অভুক্ত না থাকে তার ব্যবস্থা করা।
  • দেশে কাপড়ের উৎপাদন বাড়িয়ে সকলের জন্য অন্তত মোটা কাপড় সরবরাহ নিশ্চিত করা।
  • কোনো নাগরিক গৃহহীন না থাকে তার যথাসম্ভব ব্যবস্থা করা।
  • দেশকে নিরক্ষরতার অভিশাপ থেকে মুক্ত করা।
  • সকল দেশবাসীর জন্য ন্যূনতম চিকিৎসার বন্দোবস্ত করা।
  • সমাজে নারীর যথাযোগ্য মর্যাদা প্রতষ্ঠা করা এবং যুব সমাজকে সুসংহত করে জাতি গঠনে উদ্বুদ্ধ করা।
  • দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে বেসরকারি খাতে প্রয়োজনীয় উৎসাহ দান।
  • শ্রমিকদের অবস্থার উন্নতি সাধন এবং উৎপাদন বৃদ্ধির স্বার্থে সুস্থ শ্রমিক-মালিক সম্পর্ক গড়ে তোলা।
  • সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে জনসেবা ও দেশ গঠনের মনোবৃত্তিতে উৎসাহিত করা এবং তাদের আর্থিক অবস্থার উন্নয়ন করা।
  • জনসংখ্যা বিস্ফোরণ রোধ করা।
  • সকল বিদেশি রাষ্ট্রের সঙ্গে সমতার ভিত্তিতে বন্ধুত্ব গড়ে তোলা এবং মুসলিম দেশগুলোর সাথে সম্পর্ক জোরদার করা।
  • প্রশাসন এবং উন্নয়ন ব্যবস্থা বিকেন্দ্রীকরণ এবং স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করা।
  • দুর্নীতিমুক্ত ন্যায়-নীতিভিত্তিক সমাজ ব্যবস্থা কায়েম করা।
  • ধর্ম, বর্ণ, গোত্র নির্বিশেষে সকল নাগরিকের অধিকার পূর্ণ সংরক্ষণ করা এবং জাতীয় ঐক্য এবং সংহতি সুদৃঢ় করা।

পরে এসব কর্মসূচি বাস্তবায়নে ও তার নেওয়া নীতি পরিকল্পনার সমর্থনে বাংলাদেশে প্রথম গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছিল ১৯৭৭ সালের ৩০ মে। ওই গণভোটে মোট ভোটের ৯৮.৯ শতাংশ হ্যাঁ ভোট পড়েছিল। গণভোটের পর জিয়াউর রহমান দেশকে আবারও গণতন্ত্রের পথে আনার উদ্যোগ নেন। তিনি বহুদলীয় গণতন্ত্র চালুর সিদ্ধান্ত নেন।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে একদলীয় বাকশাল প্রতিষ্ঠা করে যে শূন্যতার সৃষ্টি করা হয়, তা পূরণে ইতিহাসের দাবি, দেশবাসীর আকাঙ্ক্ষায় বিএনপির অভ্যুদয় ঘটে। ঢাকার রমনা বটমূলের খোলা চত্বরে ১ সেপ্টেম্বর ১৯৭৮ ‘বাংলাদেশ জাতীয়তাবদী দল (বিএনপি)’ নামে নতুন রাজনৈতিক দলের ঘোষণা দেন তিনি।

বিএনপির ঘোষণাপত্রে বলা হয়, বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে ইস্পাত কঠিন গণঐক্য, ব্যাপক জনভিত্তিক গণতন্ত্র ও রাজনীতি প্রতিষ্ঠা, ঐক্যবদ্ধ ও সুসংগঠিত জনগণের অক্লান্ত প্রয়াসের মাধ্যমে জাতীয় অর্থনৈতিক মুক্তি, আত্মনির্ভরশীলতা ও প্রগতি অর্জন এবং সাম্রাজ্যবাদ, সম্প্রসারণবাদ, নয়া উপনিবেশবাদ অধিপত্যবাদের বিভীষিকা থেকে মুক্তির লক্ষ্যে বিএনপি গঠিত হয়েছে।

১৯৭৮ সালের ৩০ নভেম্বর সরকার ঘোষণা দেয়, ১৯৭৯ সালের ২৭ জানুয়ারি জাতীয় নির্বাচন হবে। তবে কয়েকটি রাজনৈতিক দলের দাবিতে দু’দফা পিছিয়ে পরবর্তী ১৮ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশে প্রথম সকল রাজনৈতিক দল ও জনগণের ব্যাপক অংশগ্রহণের মাধ্যমে একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে বিএনপি ২০৭টি আসন পেয়ে সরকার গঠন করে এবং ৩৯টি আসন পেয়ে আওয়ামী লীগ (মালেক) প্রধানবিরোধী দল হয়। ওই সময় প্রেসিডেন্ট জিয়া বলেছিলেন, ‘বিএনপির প্রথম গুরুত্বপূর্ণ কাজটি হচ্ছে জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার ফিরিয়ে আনা।’

বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার অর্ধেক নারী। তাই নারীদের শিক্ষিত করে জাতি গঠনের উদ্বুদ্ধ করার মাধ্যমে সমাজের প্রতিটি স্তরে যথাযোগ্য মর্যাদা সুনিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন। জিয়াউর রহমান তৈরি পোশাকশিল্প প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে দেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রাকে ত্বরান্বিত করতে কার্যকর পদক্ষেপ নেন। সরকারি চাকরিজীবীদের আর্থিক সচ্ছলতা আনা এবং প্রজাতন্ত্রের সেবক হিসাবে নিয়োজিত থেকে দুর্নীতিমুক্ত, ন্যায়ভিত্তিক সমাজ বিনির্মাণে ভূমিকা রাখতে উৎসাহিত করেন।

অপচয়প্রবণ, দুর্নীতিপরায়ণ, লুটেরা অর্থনীতিতে প্রেসিডেন্ট জিয়া বেসরকারি ব্যক্তি উদ্যোগ উৎসাহিত করেন, পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে গ্রহণ করেন যুগান্তকারী পদক্ষেপ। তিনি বিশ্বাস করতেন, সদ্য স্বাধীনতাপ্রাপ্ত এবং সামগ্রিক দিক থেকে বিধ্বস্ত বাংলাদেশকে একটি নির্দিষ্ট বলয়ে আবদ্ধ রেখে বৈদেশিক সম্পর্ক স্থাপন করলে উন্নত ও সমৃদ্ধ দেশ গড়া সম্ভব নয়। তাই তিনি ইন্দো-সোভিয়েত বলয় থেকে বাংলাদেশকে মুক্ত করে বিশ্বের সব দেশের সফলতার সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করেন।

তিনি চীনের সঙ্গে সখ্যভাব স্থাপন করেন। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় নতুন বন্ধুত্ব সৃষ্টি করে, অর্থনৈতিক পরাশক্তি জাপানের সাথে হৃদ্যতা স্থাপন করে সৃষ্টি করেন নতুন অধ্যায়। ইঙ্গ-মার্কিন অর্থনীতির সাথে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে সংশ্লিষ্ট করে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে তৈরি পোশাক শিল্প প্রবেশ করিয়ে এবং রেমিট্যান্স উপার্জনে মধ্যপ্রাচ্যে দক্ষ জনশক্তি রফতানির মাধ্যমে মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে সুসম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করেন।

কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের লোক প্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক ড. এ কে এম মতিনুর রহমান এক প্রবন্ধে শহিদ জিয়ার ১৯ দফা সম্পর্কে লিখেন, ‘শহিদ জিয়া কখনো সংকীর্ণ দলীয় স্বার্থে, এমনকি পারিবারিক স্বার্থে রাষ্ট্র পরিচালনা করেননি, বরং জনকল্যাণমূলক কর্মসূচি এবং জনগণের স্বার্থই ছিল মুখ্য ভূমিকায়। এটি তার শ্রেষ্ঠ অবদান, যা আজও বাংলাদেশের মানুষ কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করে।’

তিনি আরও লিখেছেন, ‘জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মধ্যে দিয়ে যে আকাঙ্ক্ষা নতুন করে সৃষ্টি হয়েছে, তার সঙ্গে শহিদ জিয়ার ১৯ দফা, খালেদা জিয়ার ভিশন ২০৩০ এবং বিএনপির ঘোষিত রাষ্ট্রকাঠামো মেরামতের ৩১ দফা সমন্বয় করে তারেক রহমানের নেতৃত্বে আগামীর বাংলাদেশকে সুখী, সমৃদ্ধ ও আত্মনির্ভরশীল দেশ হিসাবে গড়ে তোলাই হবে আজকের অঙ্গীকার।’

বিজ্ঞাপন

আরো

সম্পর্কিত খবর