Tuesday 04 August 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment
English

এনআইডি জালিয়াতি / মন্দিরে মুসলিম ‘ট্রান্সজেন্ডারের’ বিয়ে নিয়ে চাঞ্চল্য

উজ্জল জিসান স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট
৩ আগস্ট ২০২৬ ২০:২৭ | আপডেট: ৪ আগস্ট ২০২৬ ১২:২৬

রাজধানীর ঢাকেশ্বরী মন্দিরে মুসলিম ‘ট্রান্সজেন্ডারের’ বিয়ে। ছবি: সংগৃহীত

ঢাকা: ঢাকেশ্বরী মন্দিরে মুসলিম ট্রান্সজেন্ডারের বিয়ে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনার এক পর্যায়ে মুখ খুলেছে মন্দির কর্তৃপক্ষ। তাদের দাবি, বিয়েটা ছিল একেবারেই সাধারণ সনাতন ধর্মীয় রীতি মেনে। সেখানে যে একজন ‘ট্রান্সজেন্ডার’ আছেন বা এনআইডি জালিয়াতি করেছেন তা বোঝা যায়নি। এমনকি পাত্র-পাত্রীও বিষয়টি গোপন করেছেন। পরবর্তী সময়ে বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে হইচই শুরু হলে মন্দির কর্তৃপক্ষ বিষয়টি বুঝতে পারে।

এরই মধ্যে মন্দির কর্তৃপক্ষ থানায় অভিযোগ দিয়ে দায়ীদের শাস্তি চেয়েছেন। এ ছাড়া এ ঘটনার পর তারা একটি নির্দেশনা জারি করেছে। এখন থেকে যেকোনো বিয়ের ক্ষেত্রে পাত্র-পাত্রীর ডকুমেন্টস জমা দেবে। সেই ডকুমেন্টস যাচাই-বাছাই করে তিন দিন পর বিয়ে সম্পন্ন হবে। যদিও অভিযোগ উঠেছে যে, মন্দিরের অসাধু চক্র সদস্য মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে এ রকম বিয়ে পড়িয়ে থাকেন। এই বিয়ের বেলাতেও তাই হয়েছে। তবে মন্দির কর্তৃপক্ষের দাবি, বিয়ের পর দক্ষিণা হিসেবে মাত্র দুই হাজার টাকা দিয়েছে। এর বাইরে কোনোরকম লেনদেন হয়নি।

বিজ্ঞাপন

জানা গেছে, গত ১০ জুলাই পাত্র লিটন চন্দ্র বিশ্বাস ও পাত্রী শিশির বিশ্বাসের সনাতন শাস্ত্র মতে ঢাকেশ্বরী মন্দিরে বিয়ে সম্পন্ন হয়। এ ঘটনার অন্তত ১৫ দিন পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে বিয়ের একটি ছবি ভাইরাল হয়। যা ‘সমকামী’ বিয়ে হিসেবে প্রচার করা হচ্ছে। তবে মন্দির কর্তৃপক্ষের সরবরাহ করা ডকুমেন্টগুলোতে দেখা যায়, সেখানে যে একজন মুসলিম ‘ট্রান্সজেন্ডার’ আছেন সেটি বোঝার উপায় নেই। এনআইডি কার্ডে যথারীতি পাত্রীর নাম শিশির বিশ্বাস রয়েছে। সেখানে একজন নারীর ছবি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু ওই নারীর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম আইডিতে লেখা রয়েছে, তাসনুভা আনান ওরফে শিশির। ওই আইডিতে নিজেই বিয়ের ছবি ও ভিডিও শেয়ার করেছেন।

এ থেকে সহজেই বোঝা যাচ্ছে, পাত্রী মুসলিম। তাসনুভা আনান সাধারণত মুসলিম পরিবারেরই নাম। কিন্তু তার ফেসবুক অ্যাক্টিভিটিসে দেখা যাচ্ছে, তিনি একজন ট্রান্সজেন্ডার। তিনি বৈশাখী টিভিতে খবর পড়তেন। ওই সময় এ নিয়ে বেশ সাড়াও পড়ে। এ ছাড়া নিউ ইয়র্কে একটি ফ্যাশন শোতেও অংশ নিয়েছেন। তার সব কাজ-কর্মই মুসলিম হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। এমনকি তিনি তার নিজের ওয়েবসাইটেও নিজেকে বাংলাদেশের প্রথম ট্রান্সজেন্ডার নারী মডেল ও নিউজ প্রেজেন্টোর হিসেবে দাবি করেছেন।

কিন্তু সব উলটে যায় ঢাকেশ্বরী মন্দিরে লিটন চন্দ্র বিশ্বাসের সঙ্গে তার বিয়ের পর। সেখানে সরবরাহ করা কাগজপত্রে দেখা যায়, তাসনুভা আনানের নাম পরিবর্তন হয়ে শিশির বিশ্বাস হয়েছে। তার বাবা মায়ের নামও মুসলিমের জায়গায় সনাতন ধর্মের হয়েছে। বাড়ির ঠিকানাও মিলছে না। মন্দির কর্তৃপক্ষের দাবি, পাত্র-পাত্রী উভয়ই প্রতারণা করেছে তাদের সঙ্গে। তারা মিথ্যা তথ্য দিয়ে বিয়ে সম্পন্ন করেছে। আমরা তাদের শাস্তির জন্য প্রশাসনের কাছে আবেদন করেছি।

অপরদিকে, সারাবাংলার পক্ষ থেকে এ বিয়ে নিয়ে গভীরভাবে কাজ করা হয়েছে। পাত্রী যে এনআইডি কার্ড মন্দির কর্তৃপক্ষকে সরবরাহ করেছে সেটি ছিল ভুয়া। এনআইডি নম্বর যেটি ছিল সেটির মালিক মূলত মো. জাহিদুল ইসলাম। তার বাবার নাম আব্দুল লতিফ। মায়ের নাম সাফিয়া বেগম। বাড়ি ভোলা জেলায়। জন্ম তারিখ ১ জানুয়ারি ১৯৯৮ সাল। অথচ জালিয়াতি করে জাহিদুল ইসলামের জায়গায় নাম বসিয়েছেন শিশির বিশ্বাস। বাবার নাম লিখেছেন ক্ষিতিশ চন্দ্র বিশ্বাস। মায়ের নাম দিয়েছেন দিপালী রানী বিশ্বাস। জন্ম তারিখ ২৫ এপ্রিল ১৯৯৮। ঠিকানা- গ্রাম-ভাটামাথা, পোস্ট- ছাতুয়া শরীফ, উপজেলা- আখাউড়া, জেলা-ব্রাম্মাণবাড়িয়া উল্লেখ করা হয়েছে। আর জাহিদুলের ছবির স্থানে তাসনুভা নিজের ছবি বসিয়ে দিয়েছেন। যা সম্পূর্ণ ভুয়া বলে প্রমাণিত হয়েছে। অর্থাৎ জাহিদুল ইসলামের শুধুমাত্র এনআইডি নম্বরটি নিয়েছেন। বাকি সবকিছু মিথ্যা। এক্ষেত্রেও প্রতারণা করা হয়েছে।

আবার তাসনুভা আনান যে মুসলিম তা প্রমাণ করেছে সারাবাংলা কর্তৃপক্ষ। তাসনুভা আনানের এনআইডি নম্বর অনুযায়ী জানা যায়, তার জন্ম তারিখ ২৫ এপ্রিল ১৯৯১ সাল। বাবার নাম শামসুল হক ও মায়ের নাম জামিরুন বেগম। জেলা-বাগেরহাট উল্লেখ করা আছে এনআইডিতে। তাসনুভা যখন লিঙ্গ পরিবর্তন করে নারীতে রূপান্তরিত হন তখন এনআইডিতেও নামের পরিবর্তন আনেন। ওই সময় তার নাম ছিল মো. কামাল হোসেন। পরে সেই কামাল হোসেনই তাসনুভা আনান হয়ে যান।

এ ছাড়া তাসনুভা আনান শিশির নিজেই তার ভেরিফাইড ফেসবুক পোস্টে লিখেছেন, তার নাম তাসনুভা আনান ওরফে শিশির। তিনি ১৯৯১ সালের ১৬ জুন বাগেরহাট জেলার মংলা থানার কুমারখালি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবার নাম প্রয়াত শামসুল হক ও মায়ের নাম জামিরোন বেগম। অর্থাৎ এক্ষেত্রেও তাসনুভা প্রতারণার আশ্রয় নিয়েছেন বলে ধরে নেওয়া হচ্ছে। তার এনআইডিতে একরকম তথ্য, আবার পোস্টে বিপরীত তথ্য রয়েছে।

যদিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এই বিয়েকে ট্রান্সজেন্ডারের বিয়ে না বলে ‘সমকামী’ বিয়ে বলে আখ্যা দেওয়া হচ্ছে। এক ব্যক্তি ফেসবুকের এক পোস্টে লিখেছেন, ঢাকেশ্বরী মন্দিরে একটি মুসলিম ছেলের সঙ্গে একটি হিন্দু ছেলের বিয়ে সম্পন্ন হলো। এটি ‘সমকামী’ বিয়ে; এর শাস্তি চাই।’ রাজনৈতিক দল নাগরিক অধিকারে নেতা ফারুক হাসান ফেসবুকে পোস্টে লিখেন, ‘সমকামিতা বাংলাদেশ দণ্ডবিধির ৩৭৭ ধারা অনুযায়ী নিষিদ্ধ এবং একটি দণ্ডনীয় অপরাধ। এই আইন থাকার পরও জাতীয় মন্দির ঢাকেশ্বরীতে একটি সমকামী বিয়ে মহাধুমধামে অনুষ্ঠিত হয়েছে। এ নিয়ে মন্দির কর্তৃপক্ষ ও সরকারের পক্ষ থেকে কোনো বক্তব্য বা প্রশাসনিক অ্যাকশন দেখছি না।’

তিনি আরও লিখেন, ‘এরকম নিষিদ্ধ একটি কাজ জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমে অনুষ্ঠিত হলে সেক্যুলাররা সমাজ ও দেশে যুদ্ধ লাগিয়ে দিতেন।’ সমকামী বিয়ে বন্ধে এবং এ ঘটনায় জড়িতদের শাস্তি নিশ্চিতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান এই নেতা। ফেসবুকে শাহিনুর ইসলাম প্রান্ত নামে আরেকজন লিখেন, ‘দেশে সমকামী বিয়ে দিন দিন বাড়তে কেন? কেউ বলতে পারবেন?’

বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৭৭ ধারা মতে ‘সমকামী’ বিয়ে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। কিন্তু ‘ট্রান্সজেন্ডার’ বিয়ের বিষয়ে কিছু উল্লেখ নেই। এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ব্যরিস্টার শফিকুল ইসলাম সোহেল সারাবাংলাকে বলেন, ‘ঘটনা শুনে যা বুঝলাম তাতে দু’টি অপরাধ সংঘটিত হয়েছে। একটি ট্রান্সজেন্ডার বিয়ে; যদিও এ বিষয়ে বাংলাদেশে কোনো আইন বলে জানা নেই। আর অন্যটি এনআইডি জালিয়াতি। সেক্ষেত্রে প্রশাসন চাইলে ব্যবস্থা নিতে পারে। অথবা কেউ সংক্ষুব্ধ হয়ে মামলা করে আইনি প্রতিকার চাইতে পারে।’

বিয়েতে যাদের সাক্ষী করা হয়েছে তাদের কেউই কিছুই জানতেন না বলে জানিয়েছেন। সাক্ষী রুম্পা দাসের যে মোবাইল নম্বর দেওয়া হয়েছে তা বন্ধ পাওয়া যায়। দ্বিতীয় যাকে সাক্ষী করা হয়েছে তার নাম সুদীপ্ত সরকার। তার মোবাইল নম্বরও বন্ধ পাওয়া যায়। আর তৃতীয় সাক্ষীর নাম রেখা রাণী রায়। তাকে কল করে জানতে চাওয়া হয়, আপনি তাসনুভা আনান ওরফে শিশির বিশ্বাসের বিয়ে সাক্ষী হয়েছিলেন? শিশির সনাতনী হিন্দু ধর্মাবলম্বী নাকি মুসলিম? শিশির মেয়ে নাকি ট্রান্সজেন্ডার? জবাবে তিনি বলেন, ‘আমি এসব বিষয়ে কিছুই জানি না। তাই কিছু বলতেও পারছি না।’ এরপর কল কেটে দেন তিনি।

বিয়ের বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকেশ্বরী মন্দিরের পুরোহিত ও মন্দির কমিটির সাধারণ সম্পাদক ডি এন চ্যাটার্জি রোববার (২ আগস্ট) সারাবাংলাকে বলেন, ‘যেভাবে বর-কনে এসে আমাদের কাছে কাকুতি-মিনতি করে আবেদন করে ঠিক সেভাবেই তারা এসেছিল। এর পর মাত্র দুই হাজার টাকার দক্ষিণায় হিন্দু শাস্ত্রমতে বিয়ের অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয়। খুব বেশি সময়ও লাগেনি। মাত্র দেড় থেকে দুই ঘণ্টার মধ্যেই বিয়ে অনুষ্ঠান শেষ হয়েছে।’

পাত্রী হিন্দু, নাকি মুসলিম? জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘কি সব বলেন আপনি। পাত্রী মুসলিম হতে যাবে কেন? আমাদের ফরম আছে সেই ফরম পুরণ করতে হয়। এনআইডি কার্ড দিতে হয়। পাত্রী নিজেই এনআইডি দিয়েছেন। তার বাবা-মা এসেছিলেন। তার পক্ষে সাক্ষীরা এসেছিলেন। তারা সবাই সনাতন ধর্মের।’

পাত্রী ‘ট্রান্সজেন্ডার’ ছিলেন সেটা কি জানতেন আপনি? জবাবে ডিএন চ্যাটার্জি বলেন, ‘ট্রান্সজেন্ডার ছিলেন সেটিও বুঝতে পারিনি। বিষয়টি পরে জানতে পারি। পাত্রী ও পাত্র পক্ষ সবাই বিষয়টি গোপন করেছে। আমাদের মিথ্যা তথ্য দিয়ে প্রতারণা করেছে। বিয়ের পর গোয়েন্দা সংস্থাগুলো ও থানা থেকে ফোন কল আসছে। আমি সবধরনের কাগজপত্র সরবরাহ করেছি এবং বলেছি, তাদের শাস্তির আওতায় আনা উচিত।’

কেউ এই অপরাধ করলে দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। আপনি জেনে-শুনে মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে এই বিয়ে পড়িয়েছেন কি না? এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘পাত্রী ট্রান্সজেন্ডার ও মুসলিম সেই বিষয়টিই আমরা জানি না। জানলে তো বিয়েই হতো না মন্দিরে। আর মোটা অংকের টাকার যে অভিযোগ উঠেছে তা মিথ্যা।’

পাত্রী তাসনুভা আনান ওরফে শিশির বিশ্বাসের সঙ্গে বেশ কয়েকটি মাধ্যমে যোগাযোগ করেও কথা বলা সম্ভব হয়নি। অন্যদিকে পাত্র লিটন চন্দ্র বিশ্বাসের মোবাইল নম্বর ও তার সাক্ষীদের নাম্বারে কল করেও কোনো সাড়া শব্দ মেলেনি। বারবার কল ও খুদে বার্তা পাঠালেও সাড়া মেলেনি।

এ সব বিষয়ে জানতে চাইলে ডিএমপির চকবাজার থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) শেখ আশরাফুজ্জামান মামুন সারাবাংলাকে বলেন, ‘বিষয়টি সেনসেটিভ। এটা নিয়ে মিডিয়া সেল বা ঊর্ধ্বতন স্যারদের সাথে কথা বলেন। আমি এ বিষয়ে কিছুই বলতে পারব না।’ তবে ডিএমপির লালবাগ বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) মো. তালেবুর রহমান সারাবাংলাকে বলেন, ‘সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এ সংক্রান্ত একটি বিয়ের খবর দেখার পর মন্দির কর্তৃপক্ষ পুলিশকে কিছু কাগজপত্র সরবরাহ করেছে। আমরা সেগুলো দেখেছি। তবে পাত্রী যে মুসলিম সেটি জানা নেই। কেউ অভিযোগ করলে আমরা আইনানুগ ব্যবস্থা নেব।’

এ প্রসঙ্গে হেফাজতে ইসলামের নায়েবে আমির মহিউদ্দিন রাব্বানি সারাবাংলাকে বলেন, ‘এই দেশের রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম। দেশে এরকম বিয়ে নিষিদ্ধ ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এরপরেও ঢাকেশ্বরী মন্দিরে প্রকাশ্যে এরকম ইসলামবিরোধী একটি বিয়ে হয়ে গেল; সেখানে প্রশাসন ও সরকার কিছুই আমলে নিচ্ছে না। বিষয়টি মোটেই ভালো লক্ষণ নয়। আমরা বিষয়টি নিয়ে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করেছি।’ হেফাজতের সামনের মিটিংয়ে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করে পরবর্তী করণীয় ঠিক করা হবে বলে জানান তিনি।

বিজ্ঞাপন

আরো

উজ্জল জিসান - আরো পড়ুন
সম্পর্কিত খবর