Tuesday 04 August 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment
English

জুলাইয়ের দিনলিপি / সরকার পতনের এক দফা দাবি, সর্বাত্মক অসহযোগের ডাক

ফারহানা নীলা সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট
৩ আগস্ট ২০২৬ ০৮:০৭ | আপডেট: ৩ আগস্ট ২০২৬ ১০:০১

জুলাইয়ের দিনলিপি। ফাইল ছবি

ঢাকা: ঢাকার আকাশজুড়ে থমথমে মেঘ, চারপাশের বাতাস বারুদের গন্ধে ভারী। সময়টা ২০২৪ সালের ৩ আগস্ট; কিন্তু ক্যালেন্ডারে রক্তে লেখা ৩৪ জুলাই। দিনটি শুরু হয়েছিল তীব্র উদ্বেগ আর চাপা উত্তেজনা নিয়ে। কিন্তু, সময় যত গড়িয়েছে, রাজপথ পরিণত হয়েছে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় পটপরিবর্তনের মহাকাব্যিক মঞ্চে।

গণভবনের বার্তা ও ছাত্রনেতাদের প্রত্যাখ্যান

সকালের সূর্য ওঠার পরপরই তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গণভবনে পেশাজীবী সমন্বয় পরিষদের সঙ্গে বৈঠকে বসে সংকেত পাঠান, ‘গণভবনের দরজা খোলা, আমি আন্দোলনরত ছাত্রদের সঙ্গে বসতে চাই।’ কিন্তু রাজপথের জবাব আসতে সময় নেয়নি। বিকেল হতে না হতেই কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারের পাদদেশ থেকে সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম স্পষ্ট জানিয়ে দেন, ‘রক্তে ভেজা রাজপথে দাঁড়িয়ে স্বৈরাচারের সঙ্গে কোনো সংলাপ হতে পারে না। আমরা শুধু শেখ হাসিনার নই, পুরো মন্ত্রিসভার পদত্যাগ চাই ’। ছাত্রনেতাদের এই এক বাক্যের ঘোষণায় স্তব্ধ হয়ে যায় ক্ষমতার মসনদ। শুধু পদত্যাগই নয়, আন্দোলনকারীরা ডাক দেন এমন এক নতুন রাজনৈতিক ব্যবস্থার, যেখানে আর কখনো কোনো স্বৈরাচারের জন্ম হবে না।

বিজ্ঞাপন

জনসমুদ্রের উত্তাল এক দফা ও ১৫ নির্দেশ

বৃষ্টিভেজা বিকেলে ঢাকার প্রতিটি পথ গিয়ে মিশেছিল কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে। দোয়েল চত্বর, শিববাড়ী মোড় থেকে শাহবাগ, চারদিক থেকে নেমে আসা লাখো মানুষের স্রোতে শহিদ মিনার চত্বর রূপ নেয় এক মহা-জনসমুদ্রে। বিকেল ৫টায় যখন পদত্যাগের ‘এক দফা’ ঘোষিত হয়, তখন ‘দফা এক দাবি এক, শেখ হাসিনার পদত্যাগ’ স্লোগানে কেঁপে ওঠে পুরো রাজধানী।

একই মঞ্চ থেকে সমন্বয়ক আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া ঘোষণা করেন ৪ আগস্ট থেকে অনির্দিষ্টকালের ‘সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলন’-এর ১৫ দফা নির্দেশনা। কর-ইউটিলিটি বিল বর্জন, সরকারি-বেসরকারি দফতর ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ, ব্যাংকিং অচলাবস্থা, বন্দরে পণ্য খালাস বন্ধ এবং রেমিট্যান্স স্ট্রাইকের মতো কঠোর কর্মসূচিতে অচল হয়ে পড়ে প্রশাসনিক কাঠামো। সেনা ব্যারাকে অবস্থান নিশ্চিত করার আহ্বানের মধ্য দিয়ে আন্দোলন গড়ায় চূড়ান্ত পরিণতির দিকে।

রাজধানীজুড়ে প্রতিরোধের আগুন

একদফা ঘোষণার পর বিক্ষোভের ঢেউ ছড়িয়ে পড়ে পুরো ঢাকায়। রাজু ভাস্কর্যের চোখ লাল কাপড়ে বেঁধে শিক্ষার্থীরা ক্ষমতার দাম্ভিকতাকে অবজ্ঞা জানান। শাহবাগ, বাড্ডা, রামপুরা, সায়েন্স ল্যাব থেকে শুরু করে মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বর পুরো শহর অবরুদ্ধ করে ফেলে ক্ষুব্ধ জনতা। ব্যতিক্রম ছিল না ডিওএইচএস এলাকাও; সেখানে বিচার দাবি করে সংহতি জানান অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তাদের পরিবারগুলো। সংবাদপত্রের স্বাধীনতায় বাধা ও সাংবাদিক হত্যার প্রতিবাদে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে বিক্ষোভে ফেটে পড়েন বিএফইউজে ও ডিইউজে-র সাংবাদিকেরা।

সেনাসদরে বার্তা ও বিশ্বমঞ্চের নজর

ভেতরের পরিস্থিতি যখন ক্রমশ উত্তপ্ত, তখন সেনাসদরের হেলমেট অডিটোরিয়ামে সেনা কর্মকর্তাদের উদ্দেশে ভাষণ দেন সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান। গুজবে কান না দিয়ে পেশাদারিত্ব বজায় রাখার নির্দেশ দিয়ে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ সেনাবাহিনী জনগণের বিশ্বাসের প্রতীক, সেনাবাহিনী সবসময় জনগণের পাশে থাকবে।’

অন্যদিকে, সীমান্ত পেরিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও এর উত্তাপ পৌঁছায়। বাংলাদেশের সার্বিক মানবাধিকার রক্ষায় তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিতে তৎকালীন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিঙ্কেনকে চিঠি দেন যুক্তরাষ্ট্রের ২২ জন প্রভাবশালী সিনেটর ও কংগ্রেস সদস্য।

ঢাকার বাইরে উত্তাল বাংলাদেশ

রাজধানীর বাইরের চিত্রও ছিল সমান অগ্নিগর্ভ। যাত্রাবাড়ী ও সাভারে মহাসড়ক সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে দেয় আন্দোলনকারীরা। সিলেট, চট্টগ্রাম, ফরিদপুর, টাঙ্গাইল ও জামালপুরে ছাত্র-জনতার রক্তে রাজপথ রঞ্জিত হয়।

চট্টগ্রাম: ক্ষুব্ধ জনতা হামলা চালায় তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল এবং সংসদ সদস্য মহিউদ্দিন বাচ্চুর বাসভবন ও কার্যালয়ে।

গাজীপুর ও কুমিল্লা: গাজীপুরের শ্রীপুরে পুলিশের সংঘর্ষে এক আন্দোলনকারী শহিদ হন। অন্যদিকে কুমিল্লার রেসকোর্সে শাসকদলের সশস্ত্র কর্মীরা উন্মুক্ত রাজপথে গুলিবর্ষণ করলে ১০ জন গুলিবিদ্ধসহ অন্তত ৩০ জন গুরুতর আহত হন।

বগুড়া: শহরের সাতমাথা ও জেলখানা মোড়সহ বিস্তীর্ণ এলাকা দুই ঘণ্টার রক্তক্ষয়ী রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। টিয়ারশেল ও রাবার বুলেটের মুখেও পিছু হঠেনি শিক্ষার্থীরা; সেখানে ছয় জন গুলিবিদ্ধসহ আহত হন অর্ধশতাধিক।

রংপুর: রংপুরে আবু সাঈদের নির্মম হত্যাকাণ্ডের সত্যতা আড়াল করতে না পেরে অবশেষে সাময়িক বরখাস্ত করা হয় দুই পুলিশ কর্মকর্তাকে।

মহাকাব্যের শেষ দৃশ্য

৩ আগস্টের সেই রক্তিম সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে পুরো দেশ বুঝে গিয়েছিল, পুরনো দিন আর ফিরবে না। স্বৈরাচারী শাসনের দেওয়ালগুলো ততক্ষণে ভেঙে গুঁড়িয়ে গেছে সাধারণ মানুষের অদম্য সাহসের সামনে। চারদিকে তখন কেবলই একটাই ধ্বনি, একটাই অপেক্ষা আগামীকালের সূর্যোদয় নিয়ে আসবে মুক্তির বার্তা, আর মাত্র কয়েক ঘণ্টার অপেক্ষা, তারপরই ইতিহাস তার নতুন অধ্যায় লিখতে শুরু করবে।

সারাবাংলা/এফএন/পিটিএম
বিজ্ঞাপন

আরো

ফারহানা নীলা - আরো পড়ুন
সম্পর্কিত খবর