Monday 06 July 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

জুলাইয়ের দিনলিপি / কার্জন হলের সিঁড়ি থেকে জন্ম নিল ‘বাংলা ব্লকেড’

ফারহানা নীলা সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট
৬ জুলাই ২০২৬ ০৮:১৫ | আপডেট: ৬ জুলাই ২০২৬ ০৯:২৬

জুলাইয়ের দিনলিপি। ফাইল ছবি

ঢাকা: কার্জন হলের হোয়াইট হাউজের সিঁড়ি। চারপাশের থমথমে অন্ধকার ভেদ করে রূপ নিল এক ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত। আগের রাতে বসা সেই বৈঠকেই ঠিক হয়েছিল নতুন কর্মসূচির নাম, ছক আর দায়িত্ব বণ্টন। ২০২৪ সালের ৬ জুলাই, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের টানা পঞ্চম দিনে সেই গোপন পরিকল্পনাই স্ফুলিঙ্গের মতো জ্বলে উঠল রাজপথে। শাহবাগের চত্বর পেরিয়ে আন্দোলনের গর্জন তখন ছড়িয়ে পড়ল টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়ায়। ঢাকার রাজপথ স্তব্ধ করে দিয়ে প্রথম ঘোষিত হলো এক নতুন প্রতিরোধের নাম ‘বাংলা ব্লকেড’।

ক্যাম্পাস থেকে শাহবাগ অবরোধ

সেদিন দুপুর ঠিক ৩টা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় লাইব্রেরির সামনে জড়ো হতে থাকেন হাজারো শিক্ষার্থী। বিভিন্ন হল ও বিভাগ থেকে ব্যানার হাতে মিছিল নিয়ে আসতে থাকেন তরুণরা। মুহসিন হল, ভিসি চত্বর, টিএসসি, জগন্নাথ হলের মোড় হয়ে বকশিবাজার, পলাশী ও আজিমপুর প্রদক্ষিণ করে বিশাল মিছিলটি। নীলক্ষেত ও রাজু ভাস্কর্য ঘুরে বিকেল ৪টা ৩৭ মিনিটে আন্দোলনকারীরা অবস্থান নেন ঢাকার স্পন্দন শাহবাগ মোড়ে। প্রায় ৫০ মিনিট স্থায়ী এই অবরোধে অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে সায়েন্স ল্যাব, মিরপুর সড়ক ও মতিঝিল অভিমুখী সমস্ত রাস্তা। শাহবাগের মোড় রূপ নেয় এক অনন্য প্রতিবাদী ক্যানভাসে; কেউ গাইছিলেন গান, কেউ আবৃত্তি করছিলেন কবিতা, আর কারও হাতে উঁচানো প্ল্যাকার্ডে লেখা ছিল ‘বিচার চাই, বঞ্চনা নয়’।

বিজ্ঞাপন

আন্দোলনের সমন্বয়ক নাহিদ ইসলামের হুঁশিয়ারি- ‘আমাদের চাকরি না থাকলে আপনাদের চাকরিও থাকবে না। আপনারা আমাদের বাধা দেবেন না, বাধা দিলে তা ভালো হবে না।’

সারা দেশে স্তব্ধ মহাসড়ক

আদালতের পক্ষ থেকে কোটাসংক্রান্ত শুনানি পিছিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত শিক্ষার্থীদের হতাশ করলেও তা তাদের দমাতে পারেনি। বরং, রাজধানী ছাড়িয়ে এই বিক্ষোভ দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে সারা দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে। শিক্ষার্থীরা ক্লাস ও পরীক্ষা বর্জন করে রাজপথে নেমে আসেন।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়: বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠান বর্জন করে সকাল ১১টায় প্যারিস রোড থেকে মিছিল নিয়ে ঢাকা-রাজশাহী মহাসড়ক অবরোধ করেন শিক্ষার্থীরা।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়: বিকেল সাড়ে ৩টা থেকে হলের শিক্ষার্থীদের যুক্ত করে ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ করে রাখা হয়।

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় (কুষ্টিয়া): মুষলধারে বৃষ্টি উপেক্ষা করে বেলা সাড়ে ১১টায় পদযাত্রা শেষে কুষ্টিয়া-খুলনা মহাসড়ক আটকে দেন আন্দোলনকারীরা।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়: শাটল ট্রেনে করে শহরে এসে নগরীর গুরুত্বপূর্ণ সড়ক অবরোধ করেন চবির শিক্ষার্থীরা।

বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় (রংপুর): মডার্ন মোড়ে দেড় ঘণ্টা সড়ক অবরোধ শেষে সব ধরনের ক্লাস ও পরীক্ষা বর্জনের ঘোষণা দেওয়া হয়।

মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়: টাঙ্গাইলে দুপুর ১২টা পর্যন্ত ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক অবরোধ করে রাখেন শিক্ষার্থীরা।

মোশাররফকে অব্যাহতি, শিক্ষার্থীদের ক্ষোভের নতুন আগুন

আন্দোলনের এই উত্তাল আবহের মধ্যেই ঘটে একটি বিতর্কিত ঘটনা। ফেসবুকে কোটা আন্দোলনের পক্ষে পোস্ট দেওয়ার অপরাধে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী এবং ডিবেটিং ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক মোশাররফকে পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। এই ঘটনাটি সাধারণ শিক্ষার্থীদের মাঝে ক্ষোভের আগুন আরও বাড়িয়ে দেয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ইডেন কলেজ ও বোরহানউদ্দিন কলেজসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা সাফ জানিয়ে দেন, দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত তারা ক্লাসে ফিরবেন না।

নতুন রূপ: ৭ জুলাইয়ের ‘বাংলা ব্লকেড’ কর্মসূচি

বিচ্ছিন্ন অবরোধের সীমাবদ্ধতা ভেঙে আন্দোলনের তীব্রতা বাড়াতে শাহবাগ মোড় থেকেই পরবর্তী কর্মসূচির ডাক দেন নাহিদ ইসলাম। তিনি ঘোষণা করেন, ৭ জুলাই বিকেল ৩টা থেকে শুরু হবে ‘বাংলা ব্লকেড’। ঢাকার শাহবাগ, সায়েন্স ল্যাব, চানখাঁরপুল, নীলক্ষেত ও মতিঝিলসহ প্রতিটি মোড় এবং সিগন্যাল ছাত্ররা ব্লক করবে। একই সঙ্গে ঢাকার বাইরেও চলবে যুগপৎ মহাসড়ক অবরোধ।

সরকার ভেবেছিল ছাত্ররা দু’তিনদিন পর ক্লান্ত হয়ে ঘরে ফিরে যাবে, কিন্তু ৬ জুলাইয়ের এই মহাসংগ্রাম প্রমাণ করে দিয়েছিল এই পালাবদল আর থামবার নয়।

বিজ্ঞাপন

আরো

ফারহানা নীলা - আরো পড়ুন
সম্পর্কিত খবর