ঢাকা: অনলাইনে পরিচালিত সংঘবদ্ধ সিসা সরবরাহকারী চক্রের সকল সদস্যদের গ্রেফতার এবং দেশের ইতিহাসে সর্ববৃহৎ সিসার চালান ৬৫ কেজি ৯০০ গ্রাম ও ৪১টি হুক্কাসহ জব্দ করেছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর।
শুক্রবার (৩ জুলাই) অধিদফতরে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানিয়েছেন অতিরিক্ত পরিচালক (গোয়েন্দা) মোহাম্মদ বদরুদ্দীন।
তিনি বলেন, রাজধানীর গুলশান ও ভাটারা এলাকায় পরিচালিত এক সমন্বিত বিশেষ অভিযানে দেশের ইতিহাসে একক অভিযানে সর্বাধিক পরিমাণ সিসা উদ্ধারসহ একটি আন্তঃজেলা অনলাইন মাদক চক্রের মূলহোতা দুই ভাইসহ ৩ জনকে গ্রেফতার করেছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর। এটি দেশে এ পর্যন্ত এক অভিযানে জব্দকৃত সর্ববৃহৎ সিসার চালান, যা অধিদফতরের মাদকবিরোধী কার্যক্রমের একটি উল্লেখযোগ্য মাইলফলক।
মোহাম্মদ বদরুদ্দীন বলেন, আমাদের কাছে গোপন সংবাদ ছিল যে, আহমেদ শরীফি (৩৪) ও মেহদাদ শরীফি (৩৪) নামে দুই ভাইয়ের একটি চক্র দীর্ঘদিন যাবৎ ফেসবুক পেজ পরিচালনার মাধ্যমে ঢাকাসহ সারাদেশে অনলাইনে অবৈধ সিসা ও সিসা সেবনের উপকরণ বিক্রয় ও সরবরাহ করে আসছে। আর ওই পেজের মাধ্যমে অর্ডারকৃত সিসার দু’টি চালান দেশীয় কুরিয়ার প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে গ্রাহকদের নিকট পাঠানো হবে। ২ জুলাই রাজধানীর ভাটারা থানাধীন বসুন্ধরা এলাকায় অভিযান পরিচালনা করা হয়। সেখান থেকে ওই ফেসবুক পেজের নামে পাঠানো ১ কেজি সিসাসহ একটি পার্সেল জব্দ করা হয়। একই দিন রমনা থানাধীন মালিবাগ থেকে একই পেজের নামে পাঠানো আরও ১ কেজি সিসাসহ দ্বিতীয় পার্সেলটি জব্দ করা হয়।
জব্দ করা পার্সেল দু’টির প্রেরক ঠিকানা যাচাই করে একই দিনে গুলশান থানাধীন কালাচাঁদপুরে অভিযুক্ত দুই সহোদর আহমেদ শরীফি ও মেহদাদ শরীফির ভাড়া করা বাসায় অভিযান চালিয়ে উভয়কে হাতেনাতে আটক করা হয়। ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ ও তাদের স্বীকারোক্তির ভিত্তিতে ফ্ল্যাট তল্লাশি চালিয়ে আরও ৪৫ কেজি ৯০০ গ্রাম সিসা এবং ২০টি হুক্কা উদ্ধার করা হয়।
তিনি বলেন, আটক দুই ভাইয়ের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে জানা যায়, তাদের সরবরাহকৃত সিসার একটি বড় অংশ আসত মো. মাকসুদ আলম (৪০) নামে আরেক ব্যক্তির কাছ থেকে, যিনি ভাটারা থানাধীন নূরেরচালা এলাকায় বসবাস করেন। এই তথ্যের ভিত্তিতে ঐদিন রাতে নূরেরচালাস্থ তার ভাড়া ফ্ল্যাটে অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেফতার করা হয়। পরবর্তীতে তল্লাশি চালিয়ে সেখান থেকে আরও ১৮ কেজি সিসা ও ২১টি হুক্কা উদ্ধার করা হয়। চার স্থানে পরিচালিত অভিযানে সর্বমোট ৬৫ কেজি ৯০০ গ্রাম সিসা, ৪১টি হুক্কা, ৪০ কেজি সিসা সেবনের কয়লা এবং মাদক ব্যবসার কাজে ব্যবহৃত ৫টি মোবাইল ফোন জব্দ করা হয়।
তিনি আরও বলেন, গ্রেফতার হওয়া দুই সহোদর আহমেদ শরীফি ও মেহদাদ শরীফি দীর্ঘ সময় ইরানে অবস্থান করেছিলেন। সেখানে অবস্থানকালে তারা সিসা ব্যবসার কার্যক্রম, বাজারব্যবস্থা এবং সরবরাহ পদ্ধতি সম্পর্কে অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। পরবর্তীতে বাংলাদেশে ফিরে তারা একই ব্যবসায়িক মডেল অনুসরণ করে অনলাইনে সিসা বিক্রির নেটওয়ার্ক গড়ে তোলেন এবং ধীরে ধীরে দেশের বিভিন্ন জেলায় তাদের কার্যক্রম সম্প্রসারণ করেন বলে তদন্তে জানা গেছে। তারা একটি ফেসবুক পেজ চালু করেন, যা বাংলাদেশে অনলাইনে সিসা বিক্রয়কারী প্রথম দিকের পেজগুলোর অন্যতম বলে জানা গেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে গ্রাহকদের সঙ্গে যোগাযোগ, পণ্যের ছবি প্রকাশ, অর্ডার গ্রহণ, মূল্য নির্ধারণ এবং ডেলিভারির সমন্বয় করা হতো। অর্ডার নিশ্চিত হওয়ার পর দেশীয় কুরিয়ার সার্ভিস ব্যবহার করে দেশের বিভিন্ন স্থানে পার্সেল পাঠানো হতো।
অতিরিক্ত পরিচালক বলেন, চক্রটি মূলত বিভিন্ন মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস ব্যবহার করে পণ্যের মূল্য গ্রহণ করত। প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, বিভিন্ন ব্যক্তির নামে নিবন্ধিত একাধিক মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে তারা অর্থ সংগ্রহ করত, যাতে প্রকৃত লেনদেনের উৎস ও সুবিধাভোগীদের পরিচয় গোপন রাখা যায়। ডিজিটাল ফরেনসিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে এসব আর্থিক লেনদেন, সংশ্লিষ্ট অ্যাকাউন্ট এবং অর্থের প্রবাহ যাচাই করা হচ্ছে।
বিপুল সংখ্যক ক্রেতার তথ্য উদ্ধারের বিষয়ে তিনি বলেন, অভিযানে জব্দকরা মোবাইল ফোন, ডিজিটাল ডিভাইস এবং অনলাইন অ্যাকাউন্ট থেকে আমরা একটি বিস্তৃত গ্রাহক ডাটাবেস উদ্ধার করেছি। এতে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জেলার অসংখ্য ক্রেতার তথ্য, যোগাযোগের ইতিহাস, অর্ডারের বিবরণ এবং লেনদেনসংক্রান্ত তথ্য পাওয়া গেছে। উদ্ধার করা তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে নিয়মিত ক্রেতা, পরিবেশক, সহযোগী এবং এই নেটওয়ার্কের অন্যান্য সদস্যদের শনাক্ত করার কাজ চলমান রয়েছে।
জব্দ করা মোবাইল ফোন ও অন্যান্য ডিজিটাল আলামত বিশ্লেষণে এই চক্রের বিভিন্ন অনলাইন কার্যক্রম সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে। অবৈধ সিসা বিক্রির পাশাপাশি তারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক আরও বিভিন্ন অনৈতিক কার্যক্রমের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিল। এসব বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য যাচাই, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের শনাক্তকরণ এবং প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার লক্ষ্যে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।