ঢাকা: বগুড়ার ২ উপজেলায় (শিবগঞ্জ ও মোকামতলা) নতুন করে ৩টি ইউনিয়ন পরিষদ গঠন করা হয়েছে। তিন ইউনিয়নের নাম দেওয়া হয়েছে- মীরবাড়ি, সীমান্ত ও দিগন্ত। ইউনিয়ন পরিষদের নাম তিনটি এলজিআরডি প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের বংশ ও ২ সন্তানের নামে নামকরণ করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
এ নিয়ে সোমবার (১৫ জুন) জাতীয় সংসদে বাজেট উত্তর আলোচনায় জামায়াতের সংসদ সদস্য ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ এ বিষয়ে প্রশ্ন তোলেন। প্রশ্নে এমপি মাসুদ বলেন, ‘স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রীর এলাকার দুটি উপজেলায় কয়েকটি ইউনিয়ন হয়েছে। সেখানে ওনার পরিবার বা মীর বংশের নামে একটা ইউনিয়নের নাম করা হয়েছে। ওনার দুই সন্তানের নামে দুইটা ইউনিয়নের নাম করা হয়েছে।’
পরে সংসদে ২৭৪ বিধিতে সংসদকে ওই প্রশ্নের ব্যাখ্যা দেন প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম। এসময় তিনি বলেন, ‘আমার নির্বাচনি এলাকা মোকামতলার দূরবর্তী দুইটি ইউনিয়ন সৈয়দপুর ও দেউলী ইউনিয়ন। এই দুইটি ইউনিয়ন অনেক বড় ছিল। স্থানীয় প্রশাসন, উপজেলা নির্বাহী অফিসার এবং জেলা প্রশাসক যাচাই বাছাই করে গণশুনানি করে সৈয়দপুর ইউনিয়নটি যেহেতু গাবতলী ও সোনাতলা সীমান্তে, সেই কারণে সৈয়দপুরের সাথে নাম মিল করে সীমান্তবর্তী হওয়ায় নতুন ইউনিয়নের নাম করেছে সীমান্ত ইউনিয়ন’।
তিনি আরো বলেন, “আরেকটি ইউনিয়নের নাম ছিল দেউলী ইউনিয়ন। যেটি গাইবান্ধার একদম কাছে, অনেক দূরে হওয়ায় যে কারণে স্থানীয় প্রশাসন এবং জনগণের শুনানিতে সেই ইউনিয়নের নাম রাখা হয়েছে দিগন্ত ইউনিয়ন”।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, ৩ ইউনিয়নের নাম মিরাক্যালি দুই সন্তানের নামের সঙ্গে মিলে গেছে। বাংলাদেশে অনেক সীমান্ত ও দিগন্ত নামে প্রতিষ্ঠান আছে, তাই এখানেও হয়েছে। অন্যসব প্রতিষ্ঠানগুলো যেহেতু আমার নয়, তাই ২ ইউনিয়নের নামও আমার ছেলেদের নয় বলে উল্লেখ করেন তিনি।
সম্প্রতি স্থানীয় সরকার বিভাগ নতুন কতগুলো ইউনিয়ন পরিষদের গেজেট প্রকাশ করেছে। আর এই অনুমোদিত গেজেটেই ঘটে গেছে এক নজিরবিহীন ‘তুঘলকি কাণ্ড’। এলজিআরডি প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের ২ ছেলে দিগন্ত ও সীমান্ত এবং তাদের বংশীয় উপাধি ‘মীর’–এর নামানুসারে বগুড়ায় ৩টি নতুন ইউনিয়ন পরিষদের নামকরণ করা হয়েছে। গেজেট প্রকাশের পর বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সমালোচনার ঝড় উঠেছে, তৈরি হয়েছে তীব্র ক্ষোভ।
বগুড়ার মোকামতলা ও শিবগঞ্জ এলাকায় নতুন ইউনিয়নগুলোর নাম ‘দিগন্ত’, ‘সীমান্ত’ ও ‘মীর’ রাখার পর থেকেই স্থানীয় রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে।
স্থানীয়দের দাবি, ‘সীমান্ত’ নামটি এলজিআরডি প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের ছেলে মীর শাকরুল আলম সীমান্তের নামের সঙ্গে সরাসরি মিলে যায়। একইভাবে ‘দিগন্ত’ নামটি তার আরেক ছেলে মীর সাকলাইন আলম দিগন্তের নামের সংক্ষিপ্ত রূপ। প্রতিমন্ত্রীর প্রকাশ্য জীবনবৃত্তান্তেও তার ২ ছেলের নাম সীমান্ত ও দিগন্ত হিসেবে উল্লেখ রয়েছে। এ ছাড়া শিবগঞ্জ উপজেলায় প্রতিমন্ত্রীর বংশীয় পরিচয় ধরে ‘মীর’ নামে ইউনিয়ন অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
স্থানীয়দের মতে, প্রশাসনিক ইউনিটের নাম নির্ধারণে ঐতিহাসিক, ভৌগোলিক বা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে প্রাধান্য দেওয়ার পরিবর্তে এখানে পারিবারিক প্রভাব খাটানো হয়েছে।
জানা গেছে, দেউলী ইউনিয়ন ভেঙে গঠিত ‘দীগন্ত’ ইউনিয়নের মৌজাগুলো হলো-ভরিয়া (ভৈরা), মেঘাখর্দ্দ, আলমপুর, রহবল, সাওয়ালদহ, কৃষ্ণপুর, তালিবপুর ও বোয়ালমারী। মোট ৮টি মৌজা নিয়ে গঠিত এ ইউনিয়নের জনসংখ্যা ১৭ হাজার ৭৫৯ জন। পুনর্গঠিত ইউনিয়নসমূহের মধ্যে নবগঠিত স্বর্ণগ্রাম, সীমান্ত ও দীগন্ত ইউনিয়ন, মোকামতলা পৌরসভা এবং শিবগঞ্জ পৌরসভার বর্ধিত অংশ বাদ দিয়ে অবশিষ্ট মৌজাগুলো নিয়ে আরও ৫টি ইউনিয়ন পুনর্গঠন করা হয়েছে।
নামকরণের পেছনে প্রতিমন্ত্রীর সরাসরি ভূমিকা ছিল কি না কিংবা ইউনিয়নগুলোর নাম তার পরিবারের সদস্যদের নাম অনুসারেই রাখা হয়েছে কি না জানতে চাইলে বগুড়ার জেলা প্রশাসক গণমাধ্যমে জানান, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) যেভাবে প্রস্তাবনা পাঠিয়েছিলেন ঠিক সেভাবেই মন্ত্রণালয়ে কাগজপত্র পাঠানো হয়েছে। এ নিয়ে আলাদা করে জেলা প্রশাসনের সঙ্গে কোনো আলোচনা হয়নি।
জাতীয় নাগরিক পার্টির নারী শাখা ‘জাতীয় নারী শক্তি’র প্রতিষ্ঠাতা আহ্বায়ক মনিরা শারমিন তার ফেসবুক পোস্টে লিখেছেন, ‘স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম, বগুড়ার নতুন জমিদার। ইউনিয়ন পরিষদের নাম পরিবর্তন করে বংশীয় ও সন্তানদের নামে নামকরণ করছেন। নতুন ইউনিয়নের নাম মীরবাড়ি, সীমান্ত, দিগন্ত। আহ! ক্ষমতা!’
তার এই পোস্টে শত শত নেতিবাচক মন্তব্যে প্রতিমন্ত্রীর এমন ক্ষমতার অপব্যবহার ও ক্ষমতাসীন দলের সমালোচনা করছেন নেটিজেনরা।