ঢাকা: অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী জাতীয় সংসদে (১১ জুন) ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ কোটি টাকার প্রস্তাবিত বাজেট উত্থাপন করেছেন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকারের এটিই প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাজেট। এবারের বাজেটে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা সহজ করতে এবং দেশীয় শিল্পের বিকাশ ঘটাতে ইলেকট্রনিক ও প্রযুক্তি পণ্যের শুল্ক ও কর কাঠামোতে ব্যাপক পরিবর্তন আনা হয়েছে।
প্রস্তাবিত বাজেট উত্থাপনকালে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি ও স্থানীয় উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে সুরক্ষা দিতে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘কিছু ক্ষেত্রে আমদানিনির্ভর বিলাসী ইলেকট্রনিক্স পণ্যের ওপর নতুন করে শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। ফলে নতুন অর্থবছরে বেশ কিছু ইলেকট্রনিক ও প্রযুক্তি পণ্যের দাম উল্লেখযোগ্য হারে কমতে পারে। আবার আমদানিকৃত কিছু পণ্যের ক্ষেত্রে ক্রেতাদের গুনতে হতে পারে বাড়তি টাকা।’
রান্নাঘর ও গৃহস্থালির ইলেকট্রনিক পণ্যে স্বস্তির খবর
সংসদে উপস্থাপিত নতুন বাজেট প্রস্তাবে সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের ব্যবহার্য রান্নাঘর ও গৃহস্থালির ইলেকট্রনিক পণ্যে বড় ধরনের শুল্ক ছাড়ের সুবিধা দেওয়া হয়েছে। ফলে দৈনন্দিন ঘরের কাজে ব্যবহৃত ব্লেন্ডার, জুসার, মিক্সার, গ্রাইন্ডার, ইলেকট্রিক কেটলি এবং কাপড়ের ইস্ত্রির দাম কমবে। একই সঙ্গে গৃহিণীদের পছন্দের তালিকায় থাকা রাইস কুকার, মাল্টি কুকার, প্রেসার কুকার, ইলেকট্রিক কুকার, ইন্ডাকশন কুকার ও ইনফ্রারেড কুকারের বাজারমূল্য বেশ কমে আসবে।
তাছাড়া বাসাবাড়িতে নিরাপদ পানির নিশ্চয়তা দিতে ওয়াটার পিউরিফায়ার এবং গোসলের কাজে ব্যবহৃত ওয়াটার হিটার বা গিজারসহ বিভিন্ন প্রয়োজনীয় ইলেকট্রনিক পণ্যের দাম কমবে। কাস্টমস ও ভ্যাট ছাড়ের কারণে স্থানীয় বাজারে এসব পণ্যের সরবরাহ বাড়বে এবং সাধারণ ভোক্তারা বেশ কম দামে এগুলো কিনতে পারবেন।
কম্পিউটার ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতে বিশেষ করছাড়
ডিজিটাল অবকাঠামো শক্তিশালী করতে এবং প্রযুক্তিপ্রেমীদের সুবিধা দিতে তথ্যপ্রযুক্তি খাতের ইলেকট্রনিক পণ্যের ওপর করের বোঝা কমানো হয়েছে। নতুন বাজেটে কম্পিউটার ব্যবহারকারীদের জন্য সুখবর দিয়ে কম্পিউটার, ল্যাপটপ, ডেস্কটপ, সার্ভার, প্রিন্টার ও মনিটর আমদানির ক্ষেত্রে বিদ্যমান অগ্রিম কর ও শুল্ক উল্লেখযোগ্য হারে কমানোর প্রস্তাব করা হয়েছে।
এর পাশাপাশি ডেটা সংরক্ষণের জন্য ব্যবহৃত এসএসডি ও ফ্ল্যাশ মেমোরি এবং ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে ব্যবহৃত পয়েন্ট অব সেলস বা পজ মেশিনের আমদানি শুল্ক ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশে নামানোর প্রস্তাব করা হয়েছে এবং এই পণ্যের অগ্রিম কর সম্পূর্ণ শূন্য করা হয়েছে। মোবাইল ফোন, ফ্রিজ, এসি, ওয়াশিং মেশিন, এটিএম মেশিন এবং সিসিটিভি ক্যামেরা উৎপাদনে কর অব্যাহতি সুবিধা ২০৩০ সাল পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব করায় দেশে তৈরি এসব ডিজিটাল ডিভাইসের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে থাকবে।
দেশীয় ও আমদানিকৃত ওয়াশিং মেশিন এবং ওভেনের বাজারে মিশ্র প্রভাব
নতুন বাজেটে ওয়াশিং মেশিন ও ওভেনের ক্ষেত্রে আমদানিকৃত এবং দেশে উৎপাদিত পণ্যের দামে ভিন্নতা দেখা যাবে। স্থানীয় পর্যায়ে ওয়াশিং মেশিন উৎপাদনকারী শিল্পকে সুরক্ষা দিতে সকল প্রকার আমদানিকৃত হাউজহোল্ড বা গৃহস্থালি টাইপ ওয়াশিং মেশিনের ওপর নতুন করে ২০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক আরোপের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। ফলে বিদেশ থেকে আনা ওয়াশিং মেশিনের দাম বাড়বে। তবে স্থানীয়ভাবে যারা এগুলো তৈরি করেন তাদের জন্য সুখবর রয়েছে।
ওয়াশিং মেশিন, ইলেকট্রিক ওভেন ও মাইক্রোওয়েভ ওভেন প্রস্তুতকারী শিল্পের অন্যতম প্রধান কাঁচামাল ফ্লোট গ্লাস আমদানির ক্ষেত্রে বিদ্যমান ৪৫ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের প্রস্তাব করা হয়েছে। ফলে দেশে উৎপাদিত ও সংযোজিত ওয়াশিং মেশিন, ইলেকট্রিক ওভেন এবং মাইক্রোওয়েভ ওভেনের উৎপাদন খরচ কমায় এগুলোর বাজারমূল্য কমতে পারে।
পরিবেশবান্ধব ইলেকট্রিক গাড়ি ও সৌরবিদ্যুৎ সরঞ্জামে ব্যাপক ছাড়
পরিবেশ দূষণ রোধে এবং গ্রিন টেকনোলজির ব্যবহার বাড়াতে পরিবেশবান্ধব ইলেকট্রিক যানবাহন ও সৌরবিদ্যুৎ খাতের ইলেকট্রনিক যন্ত্রাংশে ঢালাও ছাড় দেওয়া হয়েছে। স্থানীয়ভাবে ইলেকট্রিক বাস, ট্রাক, ই-বাইক, ব্যাটারি এবং সংশ্লিষ্ট যন্ত্রাংশ উৎপাদনে ব্যাপক কর রেয়াত দেওয়ায় পরিবেশবান্ধব এসব যানবাহনের দাম কমবে। তাছাড়া প্লাগ-ইন হাইব্রিড যানবাহন আমদানিতে গাড়ির ধরণভেদে রেগুলেটরি শুল্ক সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে উৎসাহ দিতে সৌরবিদ্যুৎ খাতে ২০৩৫ সাল পর্যন্ত শূন্য শতাংশ করহার এবং ২০৩১ সালের জুন পর্যন্ত সোলার প্যানেলসহ সৌরবিদ্যুৎ সরঞ্জাম ও উপকরণ আমদানিতে সবধরনের শুল্ক ও ট্যাক্স শূন্য রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে, যা সামগ্রিকভাবে সৌরবিদ্যুতের খরচ কমিয়ে আনবে।
বৈদ্যুতিক মোটর ও ট্রান্সফরমার আমদানিতে বাড়তি খরচ
দেশীয় ভারী ইলেকট্রনিক্স উৎপাদনকারী শিল্পকে দীর্ঘমেয়াদী সুরক্ষা দিতে কিছু আমদানিকৃত যন্ত্রাংশের ওপর শুল্ক ও করের হার বাড়ানো হয়েছে। দেশে গড়ে ওঠা মোটর উৎপাদনকারী শিল্পকে উৎসাহিত করতে ১২০০ ওয়াটের নিম্ন ক্ষমতাসম্পন্ন আমদানিকৃত ডিসি মোটরের ওপর নতুন করে ১০ শতাংশ রেগুলেটরি শুল্ক আরোপের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। ফলে বিদেশ থেকে আনা কম ক্ষমতাসম্পন্ন বৈদ্যুতিক মোটরের দাম বাজারে বেড়ে যাবে।
একই সঙ্গে বিদ্যুৎ ও শিল্প খাতে বহুল ব্যবহৃত ১ কেভিএ পর্যন্ত ক্ষমতা সম্পন্ন ট্রান্সফরমার আমদানিতে বিদ্যমান আমদানি শুল্ক ১০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২৫ শতাংশে উন্নীত করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এর পাশাপাশি নতুন করে আরও ৫ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক আরোপ করার কথা বলা হয়েছে, যার ফলে আমদানিকৃত বিদেশি ট্রান্সফরমারের ক্রয়মূল্য আগের চেয়ে বৃদ্ধি পাবে।