ঢাকা: ৪০ বছর পর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান। ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনের পর মাত্র তিন মাসের মাথায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার পর এই বিজয়। এটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের জন্য একটি বড় কূটনৈতিক অর্জন। এই বিজয় বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিশেষ মর্যাদা এনে দিয়েছে।
স্বল্প সময়ের ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে জাতিসংঘের মতো মঞ্চে এমন পদে নির্বাচিত হওয়া দেশের প্রতি সদস্য রাষ্ট্রগুলোর আস্থা, গ্রহণযোগ্যতা এবং কূটনৈতিক সক্রিয়তার প্রতিফলন বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। একইসঙ্গে এটিকে দেশের বৈশ্বিক অবস্থান ও কৌশলগত সক্ষমতার নতুন স্বীকৃতি হিসেবেও বিবেচনা করা হচ্ছে।
এর আগে বিভিন্ন সময়ে এই পদে সাধারণত আঞ্চলিক সমঝোতার ভিত্তিতে হলেও এবার তা প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনে গড়ায়। সভাপতির পদে নির্বাচনের জন্য সাইপ্রাস গত ১০ বছর ধরে প্রচার চালিয়ে আসছিল। এর বিপরীতে বাংলাদেশ মাত্র কয়েক মাস প্রচার চালায়। এর মধ্যেই ফিলিস্তিন এই পদে নির্বাচনের আগ্রহ প্রকাশ করেছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশকে ভ্রাতৃপ্রতিম দেশ অ্যাখ্যা দিয়ে দেশটি নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ায়। ফলে বাংলাদেশের পক্ষে নির্বাচন করা সহজ হয়ে যায়। কারণ, মুসলিম বিশ্বের দেশগুলোর ভোটের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে সুবিধা হয়।
পাশাপাশি বাংলাদেশের কূটনৈতিক মিশনগুলো দ্রুত ও সমন্বিতভাবে কাজ শুরু করে। দ্বিপক্ষীয় যোগাযোগ, আঞ্চলিক ফোরাম, উন্নয়ন সহযোগিতা এবং ‘রেসিপ্রোকাল সাপোর্ট অ্যারেঞ্জমেন্ট’-এর মতো কৌশল ব্যবহার করে বাংলাদেশ সদস্য রাষ্ট্রগুলোর সমর্থন আদায় করে নেয়। এতে প্রমাণিত হয়েছে, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের নেটওয়ার্ক ও গ্রহণযোগ্যতা আগের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী হয়েছে। এই নির্বাচন সেটিই প্রমাণ করে। নির্বাচনের জয়ের মাধ্যমে ২০২৬ সালের নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত সরকারের প্রতি বিশ্বের দেশগুলোর আস্থা প্রকাশ পেয়েছে।
এর আগে একবার জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি পদে দায়িত্ব পালন করার সুযোগ পেয়েছিল বাংলাদেশ। ১৯৮৬ সালে ৪১তম অধিবেশনের সভাপতি হয়েছিলেন হুমায়ুন রশিদ চৌধুরী। চার দশক পর আবারও সেই মর্যাদাপূর্ণ পদে বাংলাদেশের প্রতিনিধি নির্বাচিত হওয়া দেশের কূটনৈতিক ধারাবাহিকতার একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন। ড. খলিলুর রহমানের ব্যক্তিগত ও পেশাগত যাত্রাপথ এই দায়িত্ব পালনের জন্য তাকে আলাদা উচ্চতায় নিয়ে গেছে। তিনি কেবল একজন রাজনৈতিক নিয়োগপ্রাপ্ত মন্ত্রী নন; বরং আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও বৈশ্বিক নীতিনির্ধারণে দীর্ঘ অভিজ্ঞতাসম্পন্ন একজন পেশাদার কূটনীতিক।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতিতে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হয়ে বিসিএসে শীর্ষস্থান অর্জনের পর ড. খলিলুর রহমানের কর্মজীবনের শুরু। পরে যুক্তরাষ্ট্রের টাফটস বিশ্ববিদ্যালয়ের ফ্লেচার স্কুল ও হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষা তার বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গিতে সমৃদ্ধ করে। ১৯৭৯ সালে পররাষ্ট্র ক্যাডারে যোগ দেওয়ার পর ধীরে ধীরে তিনি জাতিসংঘকেন্দ্রিক আন্তর্জাতিক কূটনীতির গুরুত্বপূর্ণ মুখ হয়ে ওঠেন।
জাতিসংঘে দীর্ঘ ২৫ বছরের অভিজ্ঞতা তাকে অন্য অনেক কূটনীতিকের চেয়ে আলাদা করেছে। নিউইয়র্ক ও জেনেভায় বিভিন্ন সংস্থায় দায়িত্ব পালনকালে তিনি উন্নয়ন অর্থনীতি, বাণিজ্যনীতি, প্রযুক্তি, জলবায়ু এবং স্বল্পোন্নত দেশগুলোর স্বার্থসংশ্লিষ্ট আলোচনায় সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক কাঠামোয় দক্ষিণের দেশগুলোর কণ্ঠস্বর জোরালো করতে তিনি যেভাবে কাজ করেছেন, তা তাকে বহুপাক্ষিক কূটনীতির বাস্তব অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ করেছে।
জাতিসংঘে নির্বাচনের মধ্য দিয়ে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা সামনে এসেছে— বাংলাদেশ এখন শুধু শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে অবদান রাখা একটি উন্নয়নশীল রাষ্ট্র নয়; বরং বৈশ্বিক নীতি ও বহুপাক্ষিক আলোচনায় নেতৃত্ব দেওয়ার সক্ষমতাও অর্জন করছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর পক্ষে দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশ যে অবস্থান নিয়েছে, তা আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত হয়েছে। একইভাবে রোহিঙ্গা সংকটের মতো মানবিক ইস্যুতেও বাংলাদেশ বিশ্বের সহানুভূতি অর্জন করেছে। সে কারণেই ইউরোপের সাইপ্রাসকে বাংলাদেশ হারাতে পেরেছে।
বিজয়ের পর ভাষণে খলিলুর রহমান স্পষ্টভাবে বলেছেন, তিনি সব সদস্য রাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হবেন এবং ব্যক্তিগত মতামতকে দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলতে দেবেন না। বর্তমান বিশ্বে যখন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে, তখন তার এই বার্তা গুরুত্বপূর্ণ। তিনি যে ছয়টি অগ্রাধিকার সামনে এনেছেন—শান্তি ও নিরাপত্তা, টেকসই উন্নয়ন, জলবায়ু স্থিতিস্থাপকতা, মানবাধিকার ও অভিবাসন, ডিজিটাল গভর্ন্যান্স এবং জাতিসংঘ সংস্কার—তা বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত।
বাংলাদেশের জন্য এই বিজয়ের রাজনৈতিক তাৎপর্যও কম নয়। বর্তমান সরকার এটিকে নিজেদের কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে তুলে ধরছে। সরকারপক্ষের দাবি, অল্প সময়ের মধ্যে আন্তর্জাতিক সমর্থন অর্জন বাংলাদেশের নেতৃত্বের কার্যকর কূটনৈতিক সক্ষমতার প্রমাণ। যদিও আন্তর্জাতিক নির্বাচনগুলো সাধারণত বহুস্তরীয় কূটনৈতিক সমঝোতার ফল, তবু এটি অস্বীকার করার উপায় নেই যে, এমন একটি পদে জয় বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অবস্থানকে আরও দৃশ্যমান করেছে।
রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় ড. খলিলুর রহমানের ভূমিকা নিয়েও আন্তর্জাতিক মহলে আলোচনা রয়েছে। তিনি বুঝেছিলেন, শুধু মানবিক সহায়তা দিয়ে এ সংকটের সমাধান সম্ভব নয়; এর সঙ্গে জড়িত রয়েছে আঞ্চলিক নিরাপত্তা, ভূরাজনীতি এবং আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক চাপের প্রশ্ন। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতি হিসেবে তিনি সরাসরি কোনো রাষ্ট্রীয় অবস্থান তুলে ধরতে পারবেন না, কিন্তু তার অভিজ্ঞতা নিঃসন্দেহে মানবিক ও উন্নয়নসংক্রান্ত আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
সবশেষে বলা যায়, ড. খলিলুরের এই যাত্রা ব্যক্তি ও রাষ্ট্র—উভয়ের অর্জনের সমন্বয়। তার ব্যক্তিগত মেধা, দীর্ঘ আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা এবং বাংলাদেশের বহুপাক্ষিক কূটনৈতিক অবস্থানের মিলিত প্রতিফলন এই নির্বাচন।