রংপুর: আকস্মিক শিলাবৃষ্টি ও ঝোড়ো হাওয়ায় তিস্তা-ব্রহ্মপুত্রের চরাঞ্চলসহ রংপুর জেলায় কৃষির ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। গোলায় ওঠার আগেই নষ্ট হতে বসেছে বোরো ধান, ভুট্টা, তামাক ও শাক-সবজি। ফসল উৎপাদনের প্রায় শেষ মুহূর্তে এসে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন কৃষক। টার্গেট অনুযায়ী উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার শঙ্কা কৃষি বিভাগের।
এক সপ্তাহ পরেই গোলায় ওঠার কথা ছিল চাষিদের মুখের হাসি। কিন্তু প্রকৃতি যেন খেলাচ্ছলে সব শেষ করে দিল। ২৫ এপ্রিল দুপুর ১২টা থেকে ২৯ এপ্রিল বিকেল ৪টা পর্যন্ত রংপুর জেলায় শক্তিশালী বৃষ্টি বলয় ‘ঝুমুল’র প্রভাবে ভারী বর্ষণ ও বিক্ষিপ্ত শিলাবৃষ্টি হয়। সঙ্গে ছিল ঝড় ও দমকা হাওয়া। রংপুর আবহাওয়া অফিসের ইনচার্জ মোস্তাফিজার রহমান জানান, এই বিভাগে ১৭৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে ।
জানা গেছে, বড় বড় শিলার আঘাতে গাছের ডাল ভেঙেছে, টিনের চাল ফুটো হয়েছে, আর সবচেয়ে বড় কথা— চাষিদের ঘামের ফসল একেবারে শেষ মুহূর্তে এসে ধ্বংস হয়েছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর ও মাঠ পর্যায়ের তথ্যানুসারে, রংপুর, কুড়িগ্রাম ও লালমনিরহাটের অন্তত শতাধিক গ্রামের কৃষক এই দুর্যোগের শিকার হয়েছেন। এদিকে ঝড়ের তাণ্ডবে কাঁচা ও আধাপাকা ঘরবাড়িও ক্ষতি মুখে পড়েছে।
রংপুরের গংগাচড়ার গজঘন্টার কৃষক সাজিদুল ইসলাম সারাবাংলাকে বলেন, ‘আমার ৪ বিঘা জমির ধানের প্রায় ৬০ ভাগ শিলাবৃষ্টির কারণে নুয়ে গেছে। ধার-দেনা করে ধান ফলাই। সেই ধান বিক্রি করে ধার-দেনা শোধ করি, আর ছয় মাস ভাত খাই। কিন্তু এবার অবস্থা খুব খারাপ। খুব দুশ্চিন্তায় আছি।’
গোলায় তোলার ঠিক আগ মুহূর্তে শিলাবৃষ্টি হওয়ায় ধানের গাছ মাটিতে লুটিয়ে পড়ে, দানা কর্দমাক্ত হয়ে যায়। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর রংপুরের ভারপ্রাপ্ত অতিরিক্ত পরিচালক সিরাজুল ইসলাম সারাবাংলাকে বলেন, ‘চলতি সপ্তাহেই এসব জেলায় ধান কাটা শুরু হতো। হঠাৎ শিলাবৃষ্টিতে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। মাঠকর্মীরা ক্ষয়ক্ষতির হিসাব সংগ্রহ করছেন।’
ভুট্টা ও তামাকের আশা শেষ
শুধু ধানই নয়, শিলাবৃষ্টি বড় বড় শিলার আঘাতে ভুট্টার গাছ ভেঙে পড়েছে। উঠতি ভুট্টার গাছ মাটিতে নুয়ে পড়ে গেছে। তামাকের পাতা ফুটো হয়ে নষ্ট হয়ে গেছে। পীরগঞ্জ উপজেলার আগাচতরা গ্রামের কৃষক হামিদুল ইসলাম সারাবাংলাকে বলেন, ‘প্রায় পাঁচ বিঘা জমিতে ভুট্টা চাষ করেছিলাম। অর্ধেকেরও বেশি জমির ভুট্টা মাটিতে হেলে পড়েছে। একেবারে ফসল তোলার আগ মুহূর্তে এই অবস্থায় খুবই বিপদে পড়ে গেছি।’
বদরগঞ্জ উপজেলার লোহানিপাড়া তামাক চাষি আব্দুর রহমান সারাবাংলাকে বলেন, ‘শিলাবৃষ্টিতে তামাকের পাতা ফুটো হয়ে গেছে। মাটির সঙ্গে লেতিয়ে পড়েছে। যে দুই একর জমির ফসল নিতে পারব না। কিন্তু সেই জমির টাকা আগেই খেয়ে ফেলেছি!’
এদিকে খেতের শাকসবজি তছনছ হয়ে গেছে। আম ও লিচুর মুকুল এবং কচি ফলও ঝরে গেছে। রংপুরের খোড়াগাছ ইউনিয়নের ঐতিহ্যবাহী হাড়িভাঙ্গা আমচাষি আমজাদ পাইকার সারাবাংলাকে বলেন, ‘বড় হয়ে আসা আমের গুটি ঝরে গেছে। পুরো এলাকায় ২০-৩০ ভাগ আম ঝরে গেছে। এবার উৎপাদন অনেক কমে হবে।’
সরেজমিনে দেখা গেছে, রংপুরের কাউনিয়া-পীরগাছা, মিঠাপুকুরের ৩০টি গ্রামের প্রায় দুই হাজার সবজি বীজ চাষি ক্ষতির মুখে পড়েছেন। করলা, মরিচ, টমেটো- লাউ, ঢেঁড়স, বেগুন ও বিনসের বীজ খেত ব্যাপকভাবে নষ্ট হয়েছে। পীরগাছার চৌধুরানী এলাকার চাষি অতুল চন্দ্র রায় দুই লাখ টাকার ক্ষতির আশঙ্কা করছেন। আর নারায়ণ চন্দ্র রায়ের ক্ষতি তিন লাখ টাকার মতো ।
সূত্র জানায়, মাঠ পর্যায়ের খবর, ঝড়ের তাণ্ডবে কাঁচা ও আধাপাকা ঘরবাড়ির ক্ষতি হয়েছে। বহু টিনের চাল ফুটো, গাছ উপড়ে রাস্তা বন্ধ, বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর রংপুরের ভারপ্রাপ্ত অতিরিক্ত পরিচালক সিরাজুল ইসলাম সারাবাংলাকে বলেন, ‘ক্ষতির পরিমাণ বেশি হলে টার্গেট অনুযায়ী উৎপাদন নাও হতে পারে। তবে নতুন করে শিলাবৃষ্টি না হলে এবং রোদ উঠলে উৎপাদনে কিছুটা প্রভাব পড়লেও বড় ক্ষতি কাটিয়ে ওঠা যাবে।’
যা বলছেন প্রশাসন ও বিশেষজ্ঞরা
এবিষয়ে রংপুর বিভাগীয় কমিশনার শহীদুল ইসলাম জানান, ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণে কৃষি বিভাগকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। কৃষি বিভাগের কর্মীরা মাঠে ক্ষতির তালিকা করছেন। তাদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও কৃষি সহায়তা দেওয়া হবে।
তবে কৃষি-অর্থনীতিবীদ রায়ান আহমেদ রাজু সারাবাংলাকে বলেন, ‘এখন সময় স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ নেওয়ার। তাৎক্ষণিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য জরুরি খাদ্য সহায়তা ও নগদ অর্থ প্রদান জরুরি। মাঠ পর্যায়ে দ্রুত ফসল উত্তোলনে সহায়তা এবং পচনরোধে উন্মুক্ত স্থানে সংরক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে।’
তিনি বলেন, ‘যেসব ফসল সম্পূর্ণ নষ্ট, সেসব জমিতে স্বল্পমেয়াদি সবজি বা পাট চাষে উৎসাহ দিতে হবে। এবং আগামী বোরো মৌসুমের জন্য সহজ শর্তে কৃষি ঋণ এবং বীজ ও সারের ভর্তুকি নিশ্চিত করতে হবে।’
এই কৃষি-অর্থনীতিবীদ মনে করেন, ‘দীর্ঘমেয়াদে জলবায়ু সহনশীল ফসলের জাত উদ্ভাবন ও সম্প্রসারণ, নির্ভুল আবহাওয়া পূর্বাভাসের মাধ্যমে কৃষকদের সতর্কীকরণ ব্যবস্থা জোরদার এবং শস্য বিমা কার্যক্রম দ্রুত চালু করতে হবে। কৃষকরা চান না তাদের আরও একবার এই করুণ পরিণতি ভোগ করতে হয়। তারা চান, ফসলের শেষ হাসি তাদের মুখে ফুটে উঠুক।’