রংপুর: তিস্তা সেচ প্রকল্প বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের কৃষির প্রাণ। ১৯৭৯ সালে শুরু হয়ে ১৯৯০ সালে চালু হওয়া এই প্রকল্প এখন খাল সম্প্রসারণের মাধ্যমে পুরনো সক্ষমতা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলছে। তবে এ প্রকল্প উত্তরাঞ্চলের কৃষকের কাছে আর্শিবাদ হলেও গঙ্গাচড়ার শতাধিক পরিবারের কাছে এসেছে অভিশাপে হিসেবে। উপজেলার আলমবিদিতর ইউনিয়নের ব্রহ্মোত্তরপাড়া গ্রামে এখন শুধু কান্না আর আতঙ্ক। প্রকল্পের কাজ শুরু হতেই শতাধিক পরিবার ভিটেমাটি হারানোর শঙ্কায় দিন কাটাচ্ছেন।

জানা গেছে, ২০২২ সালে দ্বিতীয় ধাপে শুরু হওয়া ১ হাজার ৪৫২ কোটি টাকার প্রকল্পটির মূল সমীক্ষা হয়েছিল আশির দশকের শেষভাগে। প্রায় ৩৫ বছর আগের একটি পুরনো সমীক্ষার ভিত্তিতে এই প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে। সময়ের সঙ্গে তিস্তা নদীর পানিপ্রবাহ কমে যাওয়ায় সেচের কার্যকারিতাও অনেকটাই হ্রাস পেয়েছে। ২০১৬ সালে লক্ষ্য ছিল ৮৪ হাজার ৩৭৮ হেক্টর জমিতে সেচ সুবিধা দেওয়ার, কিন্তু বাস্তবে তা নেমে আসে মাত্র ১০ হাজার হেক্টরে। সর্বশেষ ২০২৬ সালে সেচের আওতা দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫৭ হাজার হেক্টরে — লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় এখনো অনেক কম। পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) বলছে, খাল সম্প্রসারণের মাধ্যমে উত্তরাঞ্চলের হাজার হাজার কৃষকের জমিতে সেচ সুবিধা বাড়বে, শস্য উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে বছরে প্রায় ৮০০ কোটি টাকার। জনমনে প্রশ্ন-সেই ‘উন্নয়নের’ মূল্য কি শতাধিক পরিবারের ঘরবাড়ি আর স্বপ্ন?

সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, গ্রামের দু’পাশ দিয়ে ক্যানেল সম্প্রসারণের কাজ চলছে। কয়েক প্রজন্ম ধরে গড়ে ওঠা বসতবাড়ি এখন উচ্ছেদের মুখে। কর্তৃপক্ষ এরইমধ্যে সীমানা নির্ধারণ করে বাড়িঘর সরানোর নোটিশ দিয়েছে।
স্থানীয়রা জানান, তারা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এখানে বাস করছেন। অনেকে টাকা দিয়ে জমি কিনে ঘর তুলেছেন। হঠাৎ উচ্ছেদের খবরে তারা দিশেহারা।

চোখের জলে ভেজা কণ্ঠে আক্ষেপ নিয়ে রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার আলমবিদিতর ইউনিয়নের ব্রহ্মোত্তরপাড়া গ্রামের বাসিন্দা মনোয়ারা বেগম বলেন, ‘আমার বাপ-দাদার আমল থেকে এই ভিটাতেই আছি। এখন এসে আমাকে বলা হচ্ছে বাড়ি ভাঙতে, জায়গা ছেড়ে দিতে! আমরা কোথায় যাব? আমাদের তো আর মাথা গোঁজার কোনো ঠাঁই নেই…’
পাশে দাঁড়িয়ে আরেক বাসিন্দা আব্দুল কুদ্দুস বলেন, ‘আমরা তো অবৈধ নই ভাই। টাকা দিয়ে জমি কিনে এই ঘর করেছি। যদি আগে থেকেই অধিগ্রহণ থাকত, তাহলে এত বছর কেউ কিছু বলল না কেন? এখন হঠাৎ এসে বলে উঠে যেতে… আমরা যাব কোথায়?’
আলমবিদিতর ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য খোরশেদ আলম বলেন, ‘এই সেচ ক্যানেল আমাদের প্রয়োজন নেই। আমরা গণসইসহ ডিসি অফিসসহ বিভিন্ন দফতরে আবেদন করেছি। পুনর্বাসন ছাড়া উচ্ছেদ করা হলে এলাকায় বড় ধরনের মানবিক সংকট তৈরি হবে।’

ক্যানেল সম্প্রসারণকে অযৌক্তিক উল্লেখ করে ‘তিস্তা বাঁচাও, নদী বাঁচাও সংগ্রাম পরিষদের সভাপতি নজরুল ইসলাম হক্কানি বলেন, ‘তিস্তা নদীতে পর্যাপ্ত পানি না থাকলে শুধু ক্যানেল সম্প্রসারণ করে কোনো লাভ হবে না। ৩০-৩৫ বছর আগের সমীক্ষা দিয়ে বর্তমান বাস্তবতায় প্রকল্প বাস্তবায়ন যথাযথ নয়।’
বিষয়টি খতিয়ে দেখার আশ্বাস দিয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জেসমিন আক্তার বলেন, ‘আমি পানি উন্নয়ন বোর্ডের কাগজপত্র দেখেছি। এসব জমি ৯০-এর দশকে অধিগ্রহণ করা হয়েছে। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ রয়েছে, অনেকে সেই সময় ক্ষতিপূরণ পাননি বা বিষয়টি জানতেন না।’
তবে পানি উন্নয়ন বোর্ডের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মিজানুর রহমানের দাবি, ‘এই জমিগুলো ১৯৮০-৯০ দশকে সরকারি নিয়মে অধিগ্রহণ করা হয়েছিল এবং সে সময় ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়েছে। পরবর্তীতে কিছু মানুষ সেখানে বসতি গড়ে তুলেছেন। প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে বৃহৎ জনগোষ্ঠী সেচ সুবিধা পাবে।’