Saturday 18 Apr 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

সাধারণ মানুষকে চিকিৎসা সেবা দিন— চিকিৎসকদের প্রতি প্রধানমন্ত্রী

স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট
১৮ এপ্রিল ২০২৬ ১৬:৩৯

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

ঢাকা: সাধারণ মানুষের চিকিৎসা সেবা দিতে চিকিৎসকদের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

শনিবার (১৮ এপ্রিল) সকালে ওসমানি স্মৃতি মিলনায়তনে এক অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী এ আহ্বান জানান।

তিনি বলেন, সকল চিকিৎসকের কাছে আমি সহযোগিতা চাচ্ছি যাতে যেকোনো মানুষ মিনিমাম হলেও চিকিৎসা সেবা পান। মানুষকে সহায়তা করুন, মানুষকে হেল্প করুন। কারণ সে আপনারই কেউ না কেউ, সে আপনারই একজন, সে আপনার এই সমাজের একজন সদস্য, সে আপনার এই দেশের একজন নাগরিক। এই ঘরে (ওসমানি মিলনায়তনে) যে ক‘জন মানুষ আমরা উপস্থিত আছি.. আমরা কোনো না কোনোভাবে প্রিভিলেজড… কেউ কম কেউ বেশি….কেউ না বলতে পারবেন না। কিন্তু বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ, অধিকাংশ নাগরিক নট প্রিভিলেজড।

বিজ্ঞাপন

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আসুন, যারা নট প্রিভিলেজড আমরা অল্পসংখ্যক মানুষ যারা প্রিভিলেজড আছি চেষ্টা করি কিভাবে নট প্রিভিলেজদেরকে কিছুটা সহযোগিতা করতে কিছুটা সাহায্য করতে কিছুটা তাদের কষ্ট লাঘব করতে পারি। আমি বিশ্বাস করি, যেকথা গুলো, যে অনুরোধগুলো আপনাদের সামনে আমি করেছি, আমরা সকলে মিলে চেষ্টা করলে নিশ্চয়ই অবস্থার পরিবর্তন করতে সক্ষম হব।

স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের আয়োজনে ওসমানি স্মৃতি মিলনায়তনে উপজেলা স্বাস্থ্য ও উপজেলা কর্মকর্তার (ইউএইচএফপিও) এই সম্মেলন হয়। এ সময় স্বাস্থ্য সেবার সমস্যার বিষয়গুলোর পাওয়ার পয়েন্ট উপস্থাপন করা হয়।

সম্মেলনে উত্থাপিত মাঠ পর্যায়ের চিকিৎসকদের বিভিন্ন সমস্যা পর্যায়ক্রমে বিবেচনার আশ্বাস দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আপনাদের সমস্যাগুলো এক বারে আমাদের পক্ষে সমাধান করা সম্ভব না, তবে পর্যায়ক্রমিকভাবে করা হবে।

এরমধ্যে মাঠ পর্যায়ে চিকিৎসকদের নিরাপত্তার বিষয়টি দ্রুত সমাধান এবং মাঠ পর্যায়ের চিকিৎসকদের গাড়ি ও চালক নিয়োগের বিষয়টিও বিবেচনার আশ্বাস দেন প্রধানমন্ত্রী।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের স্বাস্থ্য খাত নিয়ে বিএনপি সরকারের বিস্তারিত পরিকল্পনা রয়েছে। এরই অংশ হিসেবে বর্তমান সরকার ক্রমান্বয়ে স্বাস্থ্য খাতে জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্দ দেওয়ার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। আমি কিন্তু একটি কথা বলেছি ক্রমান্বয়ে। একবারে এটি সম্ভব না আমাদের পক্ষে, আমরা ক্রমান্বয়ে করব।

আমেরিকার একজন বিখ্যাত পুষ্টিবিদ জ্যাক লায়েন তার একটি কথা এখানে আমি উল্লেখ করতে চাই। তিনি বলেছিলেন, আজকের স্বাস্থ্য সেবা ভবিষ্যতের বিনিয়োগ। এ কারণেই যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস এনএইচএস’র জেনারেল প্র্যাক্টিশিয়ান জিপির আদলে প্রতিটি উপজেলা এবং পর্যায়ক্রমে প্রতিটি ইউনিয়নে একটি করে প্রাথমিক স্বাস্থ্য সেবা ইউনিট স্থাপন করা যায় কিনা সেটি আমাদের চিন্তাভাবনার মধ্যে রয়েছে।

এই স্বাস্থ্য সেবা ইউনিটগুলোর দায়িত্ব পালনের জন্য বর্তমান সরকার ধারাবাহিকভাবে সারাদেশে এক লক্ষ হেলথকেয়ার নিয়োগ দেওয়ারও একটি পরিকল্পনা বা সিদ্ধান্ত রয়েছে এবং এই হেলথকেয়ারদের ৮০ শতাংশই হবেন নারী সদস্য। হেলথকেয়ারগণ মানুষের দোড়গোড়ায় গিয়ে জনগণকে প্রাথমিক হেলথকেয়ার দেওয়ার পাশাপাশি স্বাস্থ্য বিষয়ক প্রয়োজনীয় পরামর্শগুলো তাদেরকে দেবেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ভবিষ্যতের স্বার্থে যেকোন মূল্যে আমাদেরকে মা ও শিশুর পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। সকল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স গুলোকে পরিপূর্ণ মাতৃকালীন সেবা, নিরাপদ সন্তান প্রসব, নবজাতক এবং শিশু স্বাস্থ্য সেবার নিরাপদ স্থানে পরিণত করা প্রয়োজন। সারাদেশে শিশুদেরকে হামের টিকা না দেওয়ার ফলে বিগত ইমিডিয়েট দুটি সরকারের জীবনবিনাশী ব্যর্থতা মনে হয় ক্ষমাহীন অপরাধ। ভবিষ্যতে আর কখনোই যাতে এ ধরনের ঘটনার পুনর্বৃত্তি না হয়, বর্তমান সরকার সারাদেশে জরুরি ভিত্তিতে হামের টিকা দিয়ে তড়িৎ ব্যবস্থা নেওয়ায় আল্লাহর রহমতে পরিস্থিতি কিছুটা অবনতি কিছুটা রোধ করা সম্ভব হয়েছে। আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি আপনাদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টার ফলে এটিকে আমরা রোধ করে নিয়ে আসতে সক্ষম হব ইনশাআল্লাহ।

হাম থেকে শিশুদের তাৎক্ষনিক রক্ষায় সকল চিকিৎসক এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রতি ধন্যবাদ জানান প্রধানমন্ত্রী। একইসঙ্গে তিনি বলেন, যারা তাদের প্রিয় সন্তানদেরকে হারিয়েছেন সেই সকল বাবা-মা এবং স্বজনদের কাছে আমি ব্যক্তিগতভাবে আন্তরিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করছি।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের প্রতিটি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্য কেন্দ্রকে জবাবদিহিতার আওতায় এনে নাগরিক স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করা মনে হয় এখন সময়ের একটি দাবি। আমাদের অবশ্যই মনে রাখা প্রয়োজন স্বাস্থ্য এবং চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করা এটি নাগরিকদের প্রতি রাষ্ট্রের করুণা নয় বরং সুচিকিৎসা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের কর্তব্য। সুচিকিৎসা পাওয়া নাগরিকদের মৌলিক অধিকার।

প্রধানমন্ত্রী তার কর্ম পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে বলেন, বর্তমানে সরকার শিগগিরই একটি সমন্বিত ই- হেলথকারড চালু করতে পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে যার মাধ্যমে দেশের প্রতিটি নাগরিকের স্বাস্থ্য তথ্য ডিজিটালি সংরক্ষণ থাকবে, সংরক্ষিত থাকবে। এতে যেকোন নাগরিক প্রয়োজনে দেশের যেকোন হাসপাতালে সহজেই চিকিৎসা সেবা গ্রহণ করতে পারবেন।
এর পাশাপাশি বর্তমান সরকার ধাপে ধাপে একটি জাতীয় স্বাস্থ্যবীমা চালু করার পরিকল্পনা বা চিন্তাভাবনাও করছে। যাতে করে যাতে করে নাগরিক চিকিৎসা ব্যয়ের কারণে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত না হন।

তিনি বলেন, আমাদের লক্ষ্য উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স গুলোকে আরো উন্নত করা। প্রয়োজনীয় জনবল নিশ্চিত করা এবং প্রযুক্তির মাধ্যমে স্বাস্থ্য সেবা আরো সহজ ও কার্যকর করা।

চিকিৎসকদের আন্তরিক ও মানবিক হওয়ার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সবাই যদি আমরা আন্তরিক হই, তাহলে পরিবর্তন হবে, কেনো হবে না, অবশ্যই হবে। আমি সংক্ষিপ্ত একটি ঘটনা বলব, এই ঘটনাটি হচ্ছে, আপনাদের একটি নামের সাথে বোধহয় বেশ কিছু মানুষ পরিচিত আছেন। ফাতেমা নামে একটি নাম। এই মেয়েটি আমার আম্মার সাথে জেলেও ছিলেন, যেহেতু আম্মা অসুস্থ ছিলেন। ও অনেকদিন অনেক বছর ধরে আছে। আমাদের পরিবারের একজন সদস্য হয়ে গিয়েছে সে। দুদিন আগে তার এক আত্মীয় ওর বাড়ি বরিশালের দিকে তার প্রসূতি কমপ্লিকেসি দেখা দেয়। দেখা দেবার পরে হাসপাতালে নেওয়া হলো হাসপাতালে নেওয়ার সাথে সাথে বরিশাল হাসপাতালে নেওয়া হলো.. বরিশাল হাসপাতালে নেওয়ার সাথে সাথে তারা বলল বিভিন্ন রকম কমপ্লিকেসি। তাকে সাথে সাথে ঢাকায় রেফার করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, আমি যতটুকু বাসায় যাওয়ার পরে আমার স্ত্রীর কাছে শুনলাম যে সামান্য বেসিক জিনিসটা ওখানে দেওয়া সম্ভব হয়নি বা দিচ্ছে না। ঢাকায় সাথে সাথে পাঠিয়ে দিচ্ছে কিন্তু ফাতেমা স্বাভাবিকভাবে আমার স্ত্রীকে বলেছে, উনিও দুই একজনের সাথে কথা বলেছেন। সেইজন্য ফাতেমা সেই আত্মীয় খুব স্বাভাবিকভাবে বেটার চিকিৎসা পেয়ে গিয়েছে। কিন্তু প্রশ্নটি যেটা সেটা হচ্ছে সবাইতো ফাতেমা না বা সবাই ফাতেমার আত্মীয় না। যেহেতু ফাতেমার আত্মীয় হয়তো আমার স্ত্রী ঘটনাটি জানতে পেরেছে সে স্বাভাবিকভাবে উনি টেক কেয়ার করেছেন। তার আত্মীয়টা বাচ্চাটা হয়েছে কিন্তু অসুস্থ। তারপরেও মোটামুটিভাবে ম্যানেজ করা গিয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, যেই কথাটা আমি বলতে চাইছি ওখানে যারা দায়িত্বরত ছিলেন তারা যদি আরেকটু যত্নশীল হতেন, তারা যদি আরেকটু কেয়ারফুল হতেন তাহলে হয়তো অনেকগুলো সমস্যাকে এড়ানো যেত… সব না হলে অনেকগুলো সমস্যাকে এড়ানো যেত। আপনাদের কাছে আমার অনুরোধ থাকবে এই দেশের একজন নাগরিক হিসাবে আমাদেরকে সাহায্য করুন, সরকারকে সাহায্য করুন। যেন আমরা কাউকে ফাতেমার আত্মীয় হওয়ার প্রয়োজন হবে না। যেকোনো মানুষ যাতে মিনিমাম হলেও চিকিৎসা সুবিধাটি নিতে পারেন।

উপজেলা পর্যায়ের ছয়জন চিকিৎসক ডা. শোভন কুমার বশাখ, ডা. মনজুর আল মোর্শেদ চৌধুরী, ডা. মজিবুর রহমান, ডা. সাজিদ হাসান সিদ্দিকী, ডা. সুমন কান্তি সাহা এবং ডা. তাসনিম জুবায়েরকে কর্মদক্ষতার জন্য তাদের হাতে ক্রেস্ট তুলে দেন প্রধানমন্ত্রী।

সারাবাংলা/এমএমএইচ/ইআ