ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে এ যাবতকাল আলোচনা কম হয়নি। যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান দাবি হলো, ইরানকে ইউরেনিয়ামের সমস্ত সমৃদ্ধকরণ বন্ধ করতে হবে।
ইরান বরাবরই জোর দিয়ে এসেছে যে তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি শুধুমাত্র বেসামরিক ব্যবহারের জন্য, যেমন বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য। বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য ৩ থেকে ৫ শতাংশ ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের প্রয়োজন হয়। অন্যদিকে, পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির জন্য ইউরেনিয়ামকে ৯০ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধ করতে হয়।
কিন্তু মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন দাবি করেন, যুদ্ধ অবসানের জন্য তেহরান তাদের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত হস্তান্তর করতে রাজি হয়েছে, তখন ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নতুনকরে আরোচনার টেবিলে উঠে আসে।
কিন্তু সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম আসলে কী—এবং এটি এত গুরুত্বপূর্ণ কেন? এবং ইরানের একটি পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে কত সময় লাগতে পারে? এই ব্যাখ্যায়, সেটা তুলে ধরা হয়েছে।
সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম কী?
ইউরেনিয়াম একটি প্রাকৃতিক উপাদান, যা পৃথিবীর ভূপৃষ্ঠের নিচের দিকে (ভূত্বক) পাওয়া যায়। এটি মূলত দুটি আইসোটোপ দিয়ে গঠিত, ইউ-২৩৮ এবং ইউ-২৩৫। প্রাকৃতিক ইউরেনিয়ামের ৯৯ শতাংশের বেশি ইউ-২৩৮, যা সহজে পারমাণবিক চেইন রিঅ্যাকশন (ধারাবাহিক বিক্রিয়া) ধরে রাখতে পারে না।
প্রাকৃতিক ইউরেনিয়ামের প্রায় ০.৭ শতাংশ মাত্র ইউ-২৩৫। এই আইসোটোপটি সহজে বিভাজিত হয়ে শক্তি উৎপন্ন করে, যাকে বলা হয় নিউক্লিয়ার ফিশন।
ইউরেনিয়ামকে ব্যবহারযোগ্য করতে হলে ইউ-২৩৫-এর অনুপাত বাড়াতে হয়। এই প্রক্রিয়াকেই বলা হয় সমৃদ্ধকরণ বা এনরিচমেন্ট।
প্রথমে ইউরেনিয়ামকে গ্যাসে রূপান্তর করা হয়। এরপর এই গ্যাস সেন্ট্রিফিউজ নামের যন্ত্রে পাঠানো হয়—যেগুলো অত্যন্ত দ্রুত গতিতে ঘুরতে থাকে।
ঘূর্ণনের সময় ইউ-২৩৮ এর ভারী কণাগুলো বাইরের দিকে সরে যায়, আর ইউ-২৩৫ এর হালকা কণাগুলো কেন্দ্রের দিকে থাকে।
এভাবে ধীরে ধীরে ইউ-২৩৫-কে বেশি পরিমাণের ইউ-২৩৮ থেকে আলাদা করা সম্ভব হয়। এরপর বেশি ঘনত্বের ইউরেনিয়াম সেন্ট্রিফিউজের এক প্রান্ত দিয়ে সংগ্রহ করা হয়।
এভাবে আলাদা করা হালকা ইউ-২৩৫ ই ইউরেনিয়ামের একটা বিরল ও ব্যবহারযোগ্য উপাদান।

ছবি: বিবিসি বাংলা
পারমাণবিক রিঅ্যাক্টর (চুল্লি) ও অস্ত্রে ব্যবহৃত ইউরেনিয়ামের পার্থক্য কী?
সমৃদ্ধকরণের মাত্রা অনুযায়ী ইউরেনিয়ামের ব্যবহার ভিন্ন হয়।
কম মাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম, যেখানে সাধারণত তিন থেকে পাঁচ শতাংশ ইউ-২৩৫ থাকে, তা বাণিজ্যিক পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
অন্যদিকে, ২০ শতাংশ বা তার বেশি ইউ-২৩৫ থাকলে সেটি উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম হিসেবে গণ্য হয়, যা গবেষণা রিঅ্যাক্টরে ব্যবহার করা যায়। আর অস্ত্রমানের ইউরেনিয়াম সাধারণত প্রায় ৯০ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধ করা হয়।
বেসামরিক ক্ষেত্রে একটি চুল্লিতে, জ্বালানিকে কেবল হালকাভাবে সমৃদ্ধ করা হয় এবং বিক্রিয়াকে ইচ্ছাকৃতভাবে ধীর ও সতর্কতার সাথে পরিচালিত করা হয়। এটি শক্তিকে মাস বা বছর ধরে ধীরে ধীরে নির্গত হতে দেয়।
আর বোমার ক্ষেত্রে লক্ষ্যটা ঠিক উল্টো, বিক্রিয়াকে একবারে দ্রুতগতিতে এগিয়ে যেতে দেওয়া।
২০১৫ সালে চীন, ফ্রান্স, জার্মানি, রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যসহ ছয়টি শক্তিধর দেশের সঙ্গে করা চুক্তিতে ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ ৩.৬৭ শতাংশে সীমাবদ্ধ করা হয়েছিল। চুক্তিতে তাদের মজুত ৩০০ কেজিতে সীমিত রাখা, সেন্ট্রিফিউজের সংখ্যা নির্ধারণ এবং ভূগর্ভস্থ ফোর্দো স্থাপনায় সমৃদ্ধকরণ নিষিদ্ধ করার শর্তও ছিল।
ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করতে কত সময় লাগে?
ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করতে যে শ্রম লাগে, তা সেপারেটিভ ওয়ার্ক ইউনিট (SWU) এককে পরিমাপ করা হয়।
আইএইএ-এর মতে, ধারণা করা হয় যে ইরানের কাছে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধ প্রায় ৪৪০ কেজি (৯৭০ পাউন্ড) ইউরেনিয়াম রয়েছে – যা ৯০ শতাংশ পর্যন্ত পরিশোধিত করা হলে তাত্ত্বিকভাবে ১০ বা ১১টি নিম্ন-প্রযুক্তির পারমাণবিক বোমা তৈরির জন্য যথেষ্ট।
ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজি (এমআইটি)-র বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিভাগের এমেরিটাস অধ্যাপক টেড পোস্টল আল জাজিরাকে বলেছেন যে, ফোরডোতে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় মার্কিন হামলার আগে দেশটিতে অন্তত ১৭৪টি আইআর-৬ সেন্ট্রিফিউজের ১০টি ক্যাসকেড চালু ছিল—অর্থাৎ মোট ১,৭৪০টি আইআর-৬ সেন্ট্রিফিউজ।
আইআর-৬ হলো ইরানের অন্যতম উন্নত সেন্ট্রিফিউজ মডেল। দেশটিতে আরও কয়েক হাজার পুরোনো সেন্ট্রিফিউজও রয়েছে।
এই সেন্ট্রিফিউজগুলোর অবস্থা বা ইউরেনিয়াম হেক্সাফ্লুরাইডের মজুত সম্পর্কে খুব কমই জানা যায়, যা এখনও মাটির নিচে চাপা পড়ে আছে বলে মনে করা হয়।
পোস্টল হিসাব করে দেখেছেন যে, ইরানের সেন্ট্রিফিউজের ক্যাসকেডগুলো বছরে ৯০০ থেকে ১,০০০ এসডব্লিউইউ (SWU) উৎপাদন করতে সক্ষম।
“প্রাকৃতিক ইউরেনিয়াম থেকে ৬০ শতাংশ সমৃদ্ধকরণে পৌঁছাতে, যা ইরান এরমধ্যেই অর্জন করেছে, প্রায় পাঁচ বছর সময় লাগে এবং ইরানের ক্যাসকেড পদ্ধতি ব্যবহার করে প্রায় ৫,০০০ SWU প্রয়োজন হয়।”
পোস্টল বলেন, “আমি যদি ৬০ থেকে ৯০ শতাংশে যেতে চাই, আমার মাত্র ৫০০ SWU প্রয়োজন। সুতরাং, পাঁচ বছরের পরিবর্তে, এখানে ৬০ শতাংশ থেকে শুরু করলে, এতে আমার চার বা পাঁচ সপ্তাহ সময় লাগতে পারে। কারণ আমি এরমধ্যেই অনেক বেশি সমৃদ্ধ।”
একটি ঘড়ির উপমা ব্যবহার করে পোস্টল ব্যাখ্যা করেন: “ধরা যাক, ৩৩ শতাংশ সমৃদ্ধকরণে পৌঁছাতে সাত মিনিট এবং ৫০ শতাংশ সমৃদ্ধকরণে পৌঁছাতে আট মিনিট সময় লাগে। মোট [৯০ শতাংশ] সমৃদ্ধকরণে পৌঁছাতে আমার মাত্র এক মিনিট সময় লাগে।”

ছবি: বিবিসি বাংলা
ইরানের কাছে কত ইউরেনিয়াম আছে?
বর্তমান আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে ইরানের বিদ্যমান সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুতের কী হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর সময় ইরানের কাছে প্রায় ৪৪০ কেজি ৬০ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ছিল। এই উপাদান তুলনামূলক দ্রুত ৯০ শতাংশ অস্ত্রমানের পর্যায়ে নেওয়া সম্ভব।
এছাড়া ইরানের কাছে প্রায় ১,০০০ কেজি ২০ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম এবং ৮,৫০০ কেজি প্রায় ৩.৬ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম রয়েছে, যা সাধারণত বিদ্যুৎ উৎপাদন বা চিকিৎসা গবেষণার মতো বেসামরিক কাজে ব্যবহৃত হয়।
ধারণা করা হয়, উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের বড় অংশ ইসফাহানে সংরক্ষিত আছে। এটি ইরানের তিনটি ভূগর্ভস্থ পারমাণবিক স্থাপনার একটি, যেগুলো গত বছর যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলি বিমান হামলার লক্ষ্য ছিল।
তবে অন্যান্য স্থানে ঠিক কত পরিমাণ উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম রয়েছে, তা স্পষ্ট নয়।
পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি ইরানের জন্য কত সহজ?
পোস্টল বলেছেন, ইরানের মজুত ভূগর্ভে রাখা আছে, যার অর্থ হলো সামরিক হামলা হলেও পারমাণবিক হুমকি পুরোপুরি নির্মূল হবে না।
তিনি বলেন, অস্ত্র-গ্রেড ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করতে সক্ষম একটিমাত্র সেন্ট্রিফিউজ ক্যাসকেডের জন্য “একটি স্টুডিও অ্যাপার্টমেন্টের চেয়ে বেশি জায়গার প্রয়োজন হয় না, ফলে এটিকে একটি ছোট গবেষণাগারে সহজেই লুকিয়ে রাখা যায়”। তিনি এর আনুমানিক আয়তন ৬০ বর্গমিটার (৬০০ বর্গফুট) বলে উল্লেখ করেন।
পোস্টল আরও বলেন, “একটিমাত্র প্রিয়াস কমপ্যাক্ট হাইব্রিড গাড়ি থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ দিয়ে একই সময়ে এই ধরনের চারটি বা তার বেশি ক্যাসকেড চালানো সম্ভব।” এর অর্থ হলো, “ইরান গোপনে তার ৬০ শতাংশ ইউরেনিয়ামকে অস্ত্র-গ্রেড ইউরেনিয়াম ধাতুতে রূপান্তরিত করতে পারে”।
পোস্টল বলেন, “তারা নিজেদের এমন একটি অবস্থানে নিয়ে গেছে যে, পারমাণবিক অস্ত্র দিয়ে তাদের ওপর হামলা করার কথা ভাবলে যে কাউকেই জানতে হবে যে, এমন হামলার পরেও তারা ওই সুড়ঙ্গগুলোতে বসে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির চূড়ান্ত ধাপ হিসেবে ইউরেনিয়াম পরিশোধন ও সমৃদ্ধ করে সেটিকে ধাতুতে রূপান্তরিত করছে এবং পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করছে, আর তাদের কাছে তা নিক্ষেপ করার সক্ষমতাও রয়েছে।”
“পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় সমস্ত প্রযুক্তিগত সরঞ্জাম তাদের কাছে থাকবে। এবং তাদের কাছে ক্ষেপণাস্ত্রও রয়েছে, যেগুলোও টানেলের ভেতরে আছে এবং তাদের কাছে যা আছে তার পাশাপাশি সেগুলোও তৈরি করা যেতে পারে। আর পারমাণবিক অস্ত্র পরীক্ষা করার প্রয়োজন হবে না, কারণ ইউরেনিয়াম অস্ত্র ব্যবহারের আগে পরীক্ষা করার প্রয়োজন হয় না।”

তৎকালীন রাষ্ট্রপতি মাহমুদ আহমাদিনেজাদ ইরানের নাতাঞ্জ পারমাণবিক কেন্দ্র পরিদর্শন করছেন। আল জাজিরা
তবে অস্ত্রমানের ইউরেনিয়াম তৈরি করাই শেষ ধাপ নয়। একটি কার্যকর বোমা বানাতে আরও জটিল কিছু ধাপ পার হওয়া প্রয়োজন, যেমন ওয়ারহেড ডিজাইন, সংযোজন এবং ডেলিভারি সিস্টেম তৈরি।
যদিও ইরান বেশ জোর দিয়ে দাবি করে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ। এবং আইএইএ-ও বলছে, তারা কোনো সক্রিয় পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচির প্রমাণ পায়নি।
২০২৫ সালের মে মাসে যুক্তরাষ্ট্রের ডিফেন্স ইন্টেলিজেন্স এজেন্সির এক মূল্যায়নে বলা হয়, ইরান “সম্ভবত এক সপ্তাহেরও কম সময়ে” একটি ডিভাইসের জন্য পর্যাপ্ত অস্ত্রমানের ইউরেনিয়াম উৎপাদন করতে পারে।
তবে একই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান “প্রায় নিশ্চিতভাবেই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করছে না,” যদিও তারা এমন কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে, যা চাইলে তাদের সেই সক্ষমতার কাছাকাছি নিয়ে যেতে পারে।
ইসরায়েল বলেছে, তাদের কাছে এমন গোয়েন্দা তথ্য রয়েছে, যা ইঙ্গিত দেয় যে ইরান পারমাণবিক অস্ত্রের উপাদান তৈরিতে “সুনির্দিষ্ট অগ্রগতি” করেছে।