ঢাকা: প্রতারণা ও নগদ টাকার ঝুঁকি ঠেকাতে আগামী ১ জুলাই থেকে বাংলা কিউআর (কুইক রেসপন্স) পুনরায় ব্যাপকভাবে চালুর উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। মোবাইলে অ্যাপভিত্তিক এই ডিজিটাল কর্মসূচি সমগ্র দেশে জনপ্রিয় করতে, প্রান্তিক শ্রেণির মানুষের মাঝে প্রথম পর্যায়ে দেড় লাখ স্মার্ট ফোন বিতরণের সিদ্ধান্ত হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান কেন্দ্রীয় প্রধান কার্যালয় প্রাঙ্গণে এ কর্মসূচি উদ্বোধন করবেন। সেখানে অস্থায়ী পয়েন্টগুলোতে সব কর্মকর্তাদের বাংলা কিউআর ব্যবহার করে লেনদেনে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
সব মানুষকে বাংলা কিউআরে যুক্ত করতে দেশে বিদ্যমান ১৬টি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের চলমান কিউআর চলতি মাসেই একীভূত হচ্ছে। এছাড়া ভোক্তা ও ব্যবসায়ীদের আগ্রহ বাড়াতে বাংলা কিউআরের লেনদেনে সর্বোচ্চ বা সর্বনিম্ন কোনো সীমা রাখা হয়নি। এই সীমাহীন লেনদেনের ক্ষেত্রে প্রতারণা ও ঝুঁকি ঠেকাতে নতুন কোনো পদক্ষেপ নেয়নি বাংলাদেশ ব্যাংক। এমন পরিস্থিতিতে বাংলা কিউআরের সীমাহীন লেনদেনে ঝুঁকির শঙ্কা সংশ্লিষ্টদের।
বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে জানা গেছে, সারাদেশে চায়ের দোকানদার বা মুচি কিংবা ক্ষুদ্র পরিসর থেকে একেবারে বড় ব্যবসায়ীদের পর্যন্ত সবাইকে বাংলা কিউআরে আানতে নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। যদিও ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে চালু হওয়া এই উদ্যোগ রাজধানীর মতিঝিলসহ কয়েকটি স্থানে কয়েকমাস চলার পর থমকে যায়। মূলত, অনেক মানুষের স্মার্টফোন না থাকা এবং কিউআর কোড ব্যবহারের জটিলতায় তখন উদ্যোগটি আলোর মুখ দেখেনি। আবার লেনদেনের সীমা বেধে দেওয়ায় অনেক বড় ব্যবসায়ী ও ভোক্তা তাতে তেমন একটা আগ্রহ দেখাননি।
এসব বিষয় আমলে নিয়ে এবং ব্যবহারে বিকল্প পথ বন্ধ করতে, দেশের ১৬টি প্রতিষ্ঠানের কিউআর সেবা আগামী ৩০ জুনের পর বাংলা কিউআরে সংযুক্ত করা হবে। প্রতিটি লেনদেনে সর্বোচ্চ চার্জ হাজারে ১১ টাকা কিংবা দশমিক ৬ শতাংশের বেশি হতে পারবে না।
এদিকে প্রান্তিক শ্রেণির মানুষকে আগ্রহী করতে প্রথম পর্যায়ে দেড় লাখ স্মার্ট মোবাইল সেট বিতরণ করা হবে। এভাবে মোবাইল বিতরণ কার্যক্রম নিয়ে নীতিমালা দ্রুত সময়ে জানাবে বাংলাদেশ ব্যাংক। আর প্রান্তিক কিংবা বা সাধারণ মানুষ ব্যবহার করতে বড় ধরনের ভুলের আশঙ্কা রয়েছে। সেজন নতুন কোনো পদক্ষেপ এখন পর্যন্ত নেওয়া হয়নি। তবে প্রতারণ বা ভুল কমাতে নানা প্রচার কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে। কিন্তু প্রতারিত হলে সেই অর্থ ফেরত আনার পদক্ষেপ আপাতত রাখা হয়নি।
ব্যাংক এশিয়ার সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আরফান আলী সারাবাংলাকে জানান, বাংলা কিউআরের বিপ্লব সৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এটার ব্যবহার সহজ করতে হবে। মার্চেন্টদের খরচ কমাতে হবে। একটা সময় পর্যন্ত কর অব্যাহতি বা প্রণোদনা দেওয়া যেতে পারে। আর ব্যাংক হিসাবে লেনদেন করতে হবে। পাশাপাশি দরকার ব্যাপক প্রচার, ডিজিটাল ও আর্থিক স্বাক্ষর। তবে ডিজিটাল লেনদেনের ঝুঁকি কমাতে নতুন পদক্ষেপ দরকার।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানায়, নগদ টাকার লেনদেন বন্ধ হলে সরকারের অন্তত ২০ হাজার কোটি টাকা সাশ্রয় হবে। পাশাপাশি নগদ টাকা বহন করা, জাল টাকা, অচল টাকার ঝামেল কমে আসবে। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংক জানায়, ২০২৫ সালে ডিজিটাল লেনদেনকালে মোট প্রতারণার ঘটনা ৮১ হাজার ৪২৩টি। যাতে প্রায় ১০০ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে প্রতারকরা।
মতিঝিলের দোকানদার নুরু জানান, ‘আগে কিছু গ্রাহক কিউআর ব্যবহার করলেও এখন তা রাখছেন না। কারণ আগে অনেকে কিউআর দিয়া চায়ের বিল দিত। এখন আর দেন না।’
বিকাশের জনসংযোগ বিভাগের প্রধান শামসুদ্দিন হায়দার ডালিম বলেন, ‘আমরা নতুন করে কোনো এজেন্টকে আর বিকাশের কিউআর দিচ্ছি না। আর পুরোনো কিউআরগুলো দ্রুত পরিবর্তনের কাজ করে যাচ্ছি। প্রাথমিক সংকট এড়াতে যারা কিউআর ব্যবহার করতে পারবেন না তাদের জন্য অন্যান্য ডিজিটাল মাধ্যম তো রয়েছে।’
জানা গেছে, ২০২৩ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর মতিঝিলে নগদ টাকার ব্যবহার কমাতে সব ধরনের লেনদেন কিউআর কোডভিত্তিক ব্যাংকিং ব্যবস্থাপনা চালু করতে উদ্যোগ নেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। তখন বাংলা কিউআর ব্যবহারে দৈনিক সর্বোচ্চ ২০ হাজার টাকা লেনদেনের যে সীমা ছিল।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, ‘ক্যাশলেস স্মার্ট বাংলাদেশ গঠনের লক্ষ্যে বাংলা কিউআর কোডভিত্তিক লেনদেন ব্যবস্থা প্রবর্তন করা হয়েছে। কিউআর থাকলেই মার্চেন্টেসহ সবার ঝামেলা কম। আর ডিজিটাল সাক্ষরতা এবং আর্থিক সাক্ষরতা বাড়াতে পারলে দ্রুত সারা দেশে ছড়িয়ে পড়বে। ডিজিটাল লেনদেনে সতর্ক না থাকলে প্রতারণা হতে পারে।’