Monday 15 June 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

বাজেটের নীতিকাঠামো চিন্তাশীল, তবে ভিত্তি দুর্বল: দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য

স্টাফ করেসপন্ডেন্ট
১৫ জুন ২০২৬ ১৪:৪২ | আপডেট: ১৫ জুন ২০২৬ ১৭:৪৬

ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য।

ঢাকা: ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের নীতিকাঠামোকে ‘চিন্তাশীল’ বলে মন্তব্য করেছেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ও নাগরিক প্ল্যাটফর্মের আহ্বায়ক ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। তবে তিনি বলেছেন, এই নীতিকাঠামো একটি দুর্বল ও অনেক ক্ষেত্রে অকার্যকর আর্থিক কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে আছে। ফলে বাজেট বাস্তবায়ন ও অর্থনৈতিক লক্ষ্যমাত্রা অর্জন নিয়ে প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে।

সোমবার (১৫ জুন) রাজধানীতে ‘জাতীয় বাজেট ২০২৬-২৭: অসুবিধাগ্রস্ত মানুষের জন্য কী আছে?’ শীর্ষক এক মিডিয়া ব্রিফিংয়ে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে তিনি এসব কথা বলেন।

অনুষ্ঠানের আয়োজন করে এসডিজি বাস্তবায়নে নাগরিক প্ল্যাটফর্‌ম। ব্রিফিং সঞ্চালনা করেন সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান।

বিজ্ঞাপন

ড. দেবপ্রিয় বলেন, ‘মধ্যমেয়াদি সামষ্টিক অর্থনৈতিক কাঠামোও দুর্বল। ফলে বাজেট যেমন আর্থিক কাঠামোগত সীমাবদ্ধতায় আক্রান্ত হয়েছে, তেমনি প্রবৃদ্ধি অর্জনের জন্য নির্ধারিত মডেলের যৌক্তিকতাও প্রশ্নের মুখে পড়েছে।’

বাজেট প্রণয়নে ব্যবহৃত তথ্য-উপাত্তের মান নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। তিনি অভিযোগ করে বলেন, ‘অনেক ক্ষেত্রে তথ্য ব্যবহারে অপূর্ণতা, অমনোযোগ এবং ‘ছলচাতুরীর’ আশ্রয় নেওয়া হয়েছে। আগের সরকারের মতো বর্তমান সরকারও যদি প্রবৃদ্ধি বাড়িয়ে দেখানো, মূল্যস্ফীতি কম দেখানো বা উন্নয়ন প্রকল্পের প্রকৃত প্রভাব যথাযথভাবে মূল্যায়ন না করার পথে হাঁটে, তাহলে তা দুঃখজনক হবে।’

বাজেট বাস্তবায়নকে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ উল্লেখ করে দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, ‘শুধু বাজেট ঘোষণা করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। এর বাস্তবায়নে জনগণের পক্ষ থেকে ধারাবাহিক নজরদারি ও চাপ প্রয়োজন।’

তিনি বলেন, ‘প্রস্তাবিত বাজেটের অধিকাংশ প্রাক্কলন সর্বশেষ তথ্যের ভিত্তিতে করা হয়নি। গত বছরের সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে প্রস্তুত করা তথ্যের ওপর নির্ভর করেই মধ্যমেয়াদি কাঠামো তৈরি করা হয়েছে। তাই আগামী ৩০ জুলাইয়ের মধ্যে হালনাগাদ তথ্যের ভিত্তিতে সব লক্ষ্যমাত্রা ও প্রাক্কলন পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানান তিনি।’

২০০৯ সালের আইনের বিধান অনুযায়ী, প্রতি তিন মাস পরপর অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও বাজেট বাস্তবায়ন নিয়ে অর্থমন্ত্রীর সংসদে বিবৃতি দেওয়ার প্রথা পুনরায় চালুরও আহ্বান জানান সিপিডির এই ফেলো। তার প্রত্যাশা, আগামী ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে অর্থমন্ত্রী প্রথম অর্থনৈতিক বিবৃতি উপস্থাপন করবেন।

রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। তার মতে, প্রতি বছর কৃত্রিমভাবে উচ্চ রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়, যার চাপ শেষ পর্যন্ত জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) ওপর পড়ে। প্রয়োজনীয় সংস্কার ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়ানো ছাড়া অতিরিক্ত রাজস্ব আদায়ের চাপ বাস্তবসম্মত নয়।

তিনি বলেন, ‘রাজস্ব ঘাটতি দেখা দিলে সরকারের সামনে ব্যয় সমন্বয়ের সুযোগ সীমিত। সরকারি কর্মচারীদের বেতন বা বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ কমানো সম্ভব না হওয়ায় শেষ পর্যন্ত ভর্তুকি কমানোর পথ বেছে নেওয়া হতে পারে, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়বে সাধারণ মানুষের ওপর।’

দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের মতে, ভর্তুকি ব্যবস্থাকে আরও লক্ষ্যভিত্তিক করতে হবে। যাদের পরিশোধের সক্ষমতা আছে, তাদের ভর্তুকি না দিয়ে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য সহায়তা বাড়ানো প্রয়োজন।

সরকারের তিন বছর মেয়াদি ‘রিকভারি, রেস্টোরেশন অ্যান্ড রিকনস্ট্রাকশন’ কর্মপরিকল্পনার সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘প্রথম বছরেই অর্থনীতিকে পুরোপুরি ঘুরে দাঁড় করানোর লক্ষ্য অবাস্তব এবং এটি অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করতে পারে।’

তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘প্রয়োজনীয় সংস্কার ছাড়া দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া হলে এবং নির্বাচনের আগে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনা না গেলে সরকারের অর্জন ম্লান হয়ে যেতে পারে।’

দেশের নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের বর্তমান পরিস্থিতি তুলে ধরে তিনি বলেন, মূল্যস্ফীতি, মজুরি সংকট ও সঞ্চয় হ্রাস—এই তিন ধরনের চাপে সাধারণ মানুষ রয়েছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয় মেটাতে অনেকেই সঞ্চয় ভাঙতে বাধ্য হচ্ছেন।

সামাজিক নিরাপত্তা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখলেও বড় অঙ্কের থোক বরাদ্দ আর্থিক শৃঙ্খলার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

এ ছাড়া বাজেট ঘাটতি মেটাতে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ), বিশ্বব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) থেকে প্রায় সাড়ে ৯ বিলিয়ন ডলার ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনার প্রসঙ্গ উল্লেখ করে তিনি বলেন, এসব ঋণের শর্ত যেন প্রান্তিক ও পিছিয়ে পড়া মানুষের স্বার্থের পরিপন্থি না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে। তাঁর ভাষায়, ঋণ যদি নেওয়া হয়, তবে তা অবশ্যই জনস্বার্থের পক্ষে হতে হবে।

 

বিজ্ঞাপন

আরো

সম্পর্কিত খবর