Saturday 14 Mar 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

মধ্যপ্রাচ্য সংকট
বৈশ্বিক অস্থিরতায় ডলারের দাম ফের ঊর্ধ্বমুখী

স্টাফ করেসপন্ডেন্ট
১৪ মার্চ ২০২৬ ২৩:৩৬ | আপডেট: ১৪ মার্চ ২০২৬ ২৩:৪৩

ডলার ও টাকা। ছবি: সংগৃহীত

ঢাকা: ২০২৪ সালে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর ক্ষমতার পালাবদলে আসে ড. মুহাম্মদ ইউনূস নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার। তাদের দেড় বছরেরও বেশি সময় শাসন ক্ষমতায় থাকাকালীন হুন্ডি নিয়ন্ত্রণ ও রেমিট্যান্সের রেকর্ড আয়ে ডলারের বাজারের স্বস্তি ফিরেছিল। কিন্তু ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্য সংকটে ডলারের দর ফের ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে। সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিশ্বব্যাপী জ্বালানির দর বৃদ্ধির প্রভাব। এতে ডলারের খরচ বেড়েছে।

ব্যাংকগুলো এতদিন বিদেশি এক্সচেঞ্জ হাউজ থেকে ১২২ টাকা ২৫ পয়সা থেকে ৩৫ পয়সা দরে ডলার কিনছিল। কিন্তু এখন প্রতি ডলারে ৬০ পয়সা পর্যন্ত বেড়ে সর্বোচ্চ ১২২ টাকা ৯৫ পয়সায় উঠেছে বলে জানান আন্তঃব্যাংক জানান সংশ্লিষ্টরা। এর প্রভাব পড়েছে ডলারের খোলাবাজারেও।

বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, শ‌নিবার পর্যন্ত আন্তঃব্যাংকে প্রতি ডলার ১২২ টাকা ৬০ পয়সায় বিক্রি হয়েছে। আগের দিন প্রতি ডলার ছিল ১২২ টাকা ৩৭ পয়সা। এর আগে দীর্ঘদিন ধরে যা ১২২ টাকা ৩০ পয়সা থেকে ৪০ পয়সার মধ্যে ওঠানামা করছিল। আর খোলাবাজারে নগদ ডলারের দর বেড়ে ১২৫ টাকা ৭০ পয়সা থেকে ৮০ পয়সায় উঠেছে। গত সপ্তাহে যা ১২৪ টাকা ৫০ পয়সা থেকে ৬০ পয়সায় বিক্রি হয়। ইরানের সঙ্গে ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই খোলাবাজারে ডলারের দর বেড়েছে। ডলারের দর বাড়লে তার প্রভাবে পণ্যমূল্য বেড়ে মূল্যস্ফীতি বেড়ে যায়।

এ বিষয়ে মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘ব্যাংকগুলোকে পরবর্তী ১০ দিনে অনেক ধরনের পরিশোধ (পেমেন্ট) করতে হবে। বন্ধের আগে এগুলো সম্পন্ন করার জন্য অনেক ব্যাংক এখন প্রয়োজনীয় ডলার ধরে রাখছে। মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশের কর্মসংস্থানে যুদ্ধের নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। এসব প্রেক্ষাপটে সব মিলিয়ে ডলারের দর হঠাৎ বেড়েছে।’

সংশ্লিষ্টরা জানান, দেশের ব্যাংকগুলোতে আগামী সপ্তাহ থেকে টানা সাত দিন ঈদের ছুটি থাকবে। নিয়ম অনুযায়ী, বন্ধের সময়কার এলসি পরিশোধ এখনই করতে হবে। এতে ডলার কেনার চাহিদা বেড়েছে। আবার ইরানে ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যের আরও বিভিন্ন দেশে হামলার ঘটনা ঘটেছে। ফলে বাংলাদেশি অধ্যুষিত অনেক এলাকার শিল্প-কারখানা ও ব্যাংক শাখা বন্ধ রয়েছে। সেসব অঞ্চল থেকে রেমিট্যান্স পাওয়া যাচ্ছে না।

অবশ্য এখনো রেমিট্যান্সে উচ্চ প্রবৃদ্ধি বজায় রয়েছে। ঈদ ও রমজানের পাশাপাশি যুদ্ধাতঙ্কে অনেকে নিজের জমানো টাকা পাঠিয়ে দেওয়ায় এই প্রবৃদ্ধি হচ্ছে। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে রেমিট্যান্স কমতে পারে– এমন ধারণা থেকে দর বেড়েছে।

শীর্ষস্থানীয় কয়েকটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানান, ১০ মার্চ থেকে আগের দিনের চেয়ে এলসি নিষ্পত্তি করতে ১৫ থেকে ২০ পয়সা বেশি দাম চাইছে ব্যাংকগুলো। এটি কয়েকদিন ধরে অব্যাহত রয়েছে। মূলত বাংলাদেশ ব্যাংক এতদিন ডলার দরকে স্থিতিশীল রাখতে সক্ষম হয়েছে। ডলার মার্কেট অনেক গুরুত্বপূর্ণ একটা বিষয়। এই মার্কেট ভোলাটাইল হওয়া মানে অন্যান্য খাতেও প্রভাব পড়বে। তাই ডলার বাজার যদি অস্থিতিশীল না হয় সেদিকে মনিটরিং করা উচিত।

বাংলাদেশ ব্যাংকে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০২১ সালের আগ পর্যন্ত দীর্ঘদিন ধরে ডলারের দর ৮৪ টাকায় স্থিতিশীল ছিল। তবে করোনা-পরবর্তী সময়ে এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের আগে ডলারের দর বাড়তে বাড়তে ১২২ টাকায় গিয়ে ঠেকে। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নিয়ে অর্থ পাচারে কড়াকড়িসহ বিভিন্ন কারণে হুন্ডি প্রবণতা কমে প্রচুর রেমিট্যান্স এসেছে। যে কারণে আমদানিতে ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি এবং রফতানি এক শতাংশ কমার পরও ডলার বাজার স্থিতিশীল ছিল।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, চলতি মার্চের প্রথম সাত দিনে প্রবাসীরা ব্যাংকিং চ্যানেলে প্রায় ১০৭ কোটি ডলার পাঠিয়েছেন। আগের বছরের মার্চের একই সময়ের তুলনায় যা ২৯ কোটি ৪০ লাখ ডলার বা ৩৭ দশমিক ৯৪ শতাংশ বেশি। সব মিলিয়ে চলতি অর্থবছরের শুরু থেকে ৭ মার্চ পর্যন্ত ব্যাংকিং চ্যানেলে দুই হাজার ৩৫২ কোটি ডলার দেশে এসেছে। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এসেছিল এক হাজার ৯২৬ কোটি ডলার। একই সময়ের তুলনায় রেমিট্যান্স বেশি এসেছে ৪২৬ কোটি ডলার বা ২২ দশমিক ১১ শতাংশ বেশি। গত অর্থবছরও রেমিট্যান্সে প্রায় ২৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছিল। মূলত রেমিট্যান্সে উচ্চ প্রবৃদ্ধির ওপর ভর করেই ডলারের দর স্থিতিশীল ছিল।

ব্যাংকাররা জানান, সোমবার দিনের শুরুতে বিদেশি এক্সচেঞ্জ হাউজগুলো ১২২ টাকা ৪০ পয়সা থেকে ৪৫ পয়সা দরে ডলার বিক্রি করে। দুপুরের পর তা ১২২ টাকা ৮০ পয়সায় উঠে যায়। সংকটে থাকা কোনো কোনো ব্যাংক ১২৩ টাকা দরে রেমিট্যান্স কিনেছে। এভাবে ডলারের দর বাড়তে থাকলে মূল্যস্ফীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। ডলারের দরে অস্থিরতা দেখা দিলে কাঙ্ক্ষিত বিনিয়োগও আসবে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বেসরকারি একটি ব্যাংকের আন্তর্জাতিক বিভাগের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘ডলারের দর বাড়তে পারে– এমন ধারণা ছড়িয়ে পড়লে বিদেশি এক্সচেঞ্জ হাউজগুলো ডলার ধরে রেখে দাম বাড়ানোর চেষ্টা করবে। এর আগে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর পরই বিদেশি কিছু এক্সচেঞ্জ হাউজ ডলারের দর বাড়ানোর চেষ্টা করে, যা তৎকালীন গভর্নরের দৃঢ় অবস্থানের কারণে ব্যর্থ হয়। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বাংলাদেশ ব্যাংক বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থেকে কোনো ডলার বিক্রি করেনি। যে কারণে রিজার্ভ কমার প্রবণতা থেকে উলটো ১০ বিলিয়ন ডলারের বেশি বেড়েছে।’

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়ে গত বৃহস্পতিবার গ্রস ৩৫ দশমিক ৪৯ বিলিয়ন ডলারে ওঠে। আর বিপিএম৬ অনুযায়ী, ৩০ দশমিক ৭৬ বিলিয়ন ডলার। গত ৮ মার্চ আকুর দায় পরিশোধের পর তা কমে ৩৪ দশমিক ১০ বিলিয়ন ডলারে নেমেছে। যদিও ২০২১ সালের ২৯ আগস্ট রিজার্ভ ছিল ৪৮ দশমিক শূন্য ৬ বিলিয়ন ডলার।

বিজ্ঞাপন

আরো

সম্পর্কিত খবর