Wednesday 01 July 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

ঢাবির বাজেটে গবেষণায় ‘শূন্য’ বরাদ্দ, চলছে সমালোচনা

​কানজুল কারাম কৌষিক, ঢাবি করেস্পন্ডেন্ট
১ জুলাই ২০২৬ ২২:২৯ | আপডেট: ১ জুলাই ২০২৬ ২২:৩৭

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। ছবি কোলাজ: সারাবাংলা

ঢাকা: উচ্চশিক্ষার মান উন্নয়ন ও নতুন জ্ঞান সৃষ্টির প্রধান মাধ্যম গবেষণা। গবেষণা যখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তখন এ নিয়ে বড় সংকটের মুখে পড়েছে দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি)। বিশ্ববিদ্যালয়টি ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) থেকে গবেষণার জন্য সরাসরি কোনো বরাদ্দ পায়নি। শিক্ষাবিদদের মতে, ইউজিসির হাতে নয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাবিদদের হাতে গবেষণা ফান্ডের দায়িত্ব থাকা উচিত। সেই সঙ্গে গবেষণা স্বল্পতার পেছনে রাষ্ট্রব্যবস্থার দায়ও দেখছেন তারা।

​ইউজিসির বরাদ্দ শূন্য ও বাজেটে বড় ঘাটতি

​২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ১ হাজার ৩৩ কোটি ২১ লাখ টাকার প্রস্তাবিত একটি বাজেট ঘোষণা করেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। তবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির চাহিদা ছিল ১ হাজার ৪২২ কোটি ৬৩ লাখ টাকা। অর্থাৎ চাহিদার চেয়ে প্রায় ৩৯০ কোটি টাকা কম বরাদ্দ পেয়েছে। ফলে ৮৩ কোটি ৮৫ লাখ টাকার ঘাটতি নিয়ে এ বছর কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে ঢাবিকে। এর মাঝে উদ্বেগের বিষয় হলো- এবারই প্রথম ইউজিসি থেকে গবেষণার জন্য সরাসরি কোনো ফান্ড দেওয়া হয়নি।

বিজ্ঞাপন

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের তথ্যানুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ১ হাজার ৩৫ কোটি ৪৫ লাখ টাকার বাজেটের মধ্যে গবেষণার জন্য বরাদ্দ ছিল মাত্র ২১ কোটি ৫৭ লাখ টাকা, যা মোট বাজেটের মাত্র ২ দশমিক শূন্য ৮ শতাংশ। আর ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ১ হাজার ৩৩ কোটি ২১ লাখ ৮৩ হাজার টাকার বাজেট প্রস্তাব করা হয়। এর মধ্যে ইউজিসি ৯৪৯ কোটি ৩৬ লাখ টাকা বরাদ্দ দিলেও গবেষণা খাতে কোনো অর্থ বরাদ্দ রাখেনি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. এম জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বার্ষিক সিনেট অধিবেশনে এই তথ্য জানিয়ে বিষয়টিকে অত্যন্ত ‘দুর্ভাগ্যজনক’ বলে মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেন, ‘বাজেটের বেশির ভাগ অর্থই শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা এবং পেনশনে চলে যায়। ফলে ইউজিসি থেকে গবেষণার টাকা না আসায় এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব খরচে ল্যাবরেটরি আধুনিক করা বা উচ্চমানের গবেষণা চালানো ভীষণ কঠিন হয়ে পড়বে।’

​গবেষণা খরা থেকে উত্তরণ যেভাবে

​বিশ্ববিদ্যালয়ের এই বর্তমান পরিস্থিতি এবং গবেষণার সামগ্রিক সংকট নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন শিক্ষাবিদ অধ্যাপক সামিনা লুৎফা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের এ অধ্যাপক বলেন, ‘গবেষণা নিয়ে অনেক আলাপ হচ্ছে। গবেষণার বরাদ্দই নেই, সেটি নিয়ে কী বলব। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক হিসেবে আমি সরকারের এই সিদ্ধান্তের সম্পূর্ণ বিরোধিতা করি। গবেষণার বরাদ্দটা বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে থাকতে হবে, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের কাছে নয়। এটি আমাদের বিদ্যায়তনিক স্বাধীনতার সম্পূর্ণ বিরোধী।’

তিনি প্রস্তাব রাখেন, গবেষণা ফান্ড একাডেমিক এক্সারসাইজের অংশ এবং সিন্ডিকেটের বদলে এটি একাডেমিক কাউন্সিল থেকে আসা উচিত। এছাড়াও উপাচার্যের বিশেষ ক্ষমতার একটা পরিধি নির্ধারণ করা প্রয়োজন। তিনি আরও বলেন, ‘গবেষণার জন্য বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন জায়গায় ফান্ডের জন্য আমরা আবেদন করি। প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে ফান্ড নিয়ে আসি। কিন্তু এই ফান্ড চাওয়ার প্রক্রিয়ার মধ্যে অনেক প্রশাসনিক দায়িত্ব থাকে, অনেক প্রশাসনিক কাগজপত্র দরকার হয়।’

সামিনা লুৎফা বলেন, ‘টাকা নিয়ে এলে একটি অডিটের প্রয়োজন হয়। এই বিষয়গুলো শিক্ষকদের ব্যক্তিগত পর্যায়ে করার নজির পৃথিবীতে নেই। পৃথিবীর সব দেশেই আলাদা রিসার্চ সেন্টার থাকে, ব্যুরো থাকে, রিসার্চ অফিস থাকে, যারা এই প্রশাসনিক কাজগুলো করতে সহযোগিতা করে। আমাদের এখানেও গবেষণার জন্য আলাদা ইকোসিস্টেম তৈরি করা উচিত।’

​অতীতে বরাদ্দকৃত টাকা অব্যবহৃত থাকার নজির

​অতীতে বরাদ্দকৃত টাকা পুরোটা খরচ করতে না পারার একটি পুরোনো নজিরও রয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের। বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার দফতরের আগের কিছু তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের তুলনায় ঢাবির গবেষণার বাজেট এমনিতেই কম, অথচ বিগত বছরগুলোতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সেই সামান্য টাকারও পুরোটা ব্যয় করতে পারেনি।

২০২৪-২৫ অর্থবছরে গবেষণা বরাদ্দের প্রায় ৩৭ শতাংশ টাকাই অব্যবহৃত রয়ে গিয়েছিল। এমনকি বিগত পাঁচ বছরে মোট বরাদ্দের মধ্যে ১৩ কোটি ৩৬ লাখ ৩৭ হাজার টাকা খরচ করতে না পেরে সরকারকে ফেরত দিতে হয়েছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষায়িত গবেষণা কেন্দ্রগুলোও অতীতে তাদের বরাদ্দের একটি বড় অংশ সময়মতো খরচ করতে পারেনি, যা মূলত প্রাতিষ্ঠানিক আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে হয়েছিল।

দেশের প্রথিতযশা শিক্ষাবিদ ও ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী (১ জুলাই) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০৫ তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষ্যে আয়োজিত সেমিনারে বলেছেন, ‘গবেষণার পরিমাণ ও উপযোগিতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রেও দায়িত্ব বিশ্ববিদ্যালয়ের যতটা নয়, তার চেয়ে অধিক রাষ্ট্রব্যবস্থার।’ তিনি রাষ্ট্রকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে বলেন, ‘রাষ্ট্র যখন শিক্ষাকে বিভিন্ন ভাগে বিভক্ত করে ফেলে, তখনই জ্ঞানের আসল সংকট তৈরি হয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রচুর গবেষণা হয়। কিন্তু, সকল গবেষণা প্রকাশ পায় না, প্রচারও তেমন ঘটে না। এমনকি গবেষণার ফল অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিসরে প্রযুক্ত হয় না।’ এসব সমস্যা নিরসন করলে গবেষণা খরার অভিযোগটি কেটে উঠবে বলে আশা করেন তিনি।

এদিকে ইউজিসি ঢাবির গবেষণা বরাদ্দ ব্যবস্থায় আনা পরিবর্তনে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাদা দল। গবেষণা তহবিল সরাসরি বিশ্ববিদ্যালয়কে না দিয়ে ইউজিসির মাধ্যমে পরিচালনা করার নতুন এই সিদ্ধান্ত দেশের প্রাচীনতম ও শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা কার্যক্রম, একাডেমিক স্বায়ত্তশাসন এবং গবেষকদের স্বাধীনতা খর্ব করবে বলে সাদা দল আশঙ্কা প্রকাশ করেছে। সাদা দল আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. মো. মোর্শেদ হাসান খান, যুগ্ম আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. আবদুস সালাম ও অধ্যাপক ড. মো. আবুল কালাম সরকারের সই করা এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এই তথ্য জানানো হয়েছে।

তারা জানান, প্রথাগতভাবে গবেষণা প্রকল্পে অনুদান বিশ্ববিদ্যালয়ের বাজেটের অংশ হিসেবে বরাদ্দ হতো এবং বিশ্ববিদ্যালয় নিজস্ব নীতিমালা ও অগ্রাধিকার অনুযায়ী তা পরিচালনা করত। এই ব্যবস্থা বিশ্ববিদ্যালয়কে গবেষণা তহবিল বরাদ্দের ক্ষেত্রে দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং গবেষকদের প্রয়োজন অনুযায়ী তহবিল বণ্টনের সুযোগ দিত। অথচ এ অর্থবছরে বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য গবেষণা খাতে কোনো বরাদ্দ না দিয়ে সেই অর্থ ইউজিসির মাধ্যমে পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিদ্যমান গবেষণা ব্যবস্থাপনা অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।

নতুন সিদ্ধান্তের ফলে গবেষণা অনুমোদন, অর্থছাড় ও প্রকল্প বাস্তবায়নে অতিরিক্ত আমলাতান্ত্রিক জটিলতা সৃষ্টি হবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য গবেষণায় আলাদা বরাদ্দ না দেওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ৬৩ টি ব্যুরো ও গবেষণা কেন্দ্রের মাধ্যমে পরিচালিত গবেষণা কার্যক্রম, গবেষণা অনুদান ব্যবস্থাপনা এবং সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক কার্যক্রমও ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এর নেতিবাচক প্রভাব শিক্ষক ও গবেষকদের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের গবেষণার সুযোগ, বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক সুনাম এবং সামগ্রিকভাবে দেশের গবেষণা পরিবেশের উন্নয়নকেও ক্ষতিগ্রস্ত করবে।

সাদা দলের দাবি, এই প্রেক্ষাপটে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাদা দল ইউজিসি ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে গবেষণা বাজেট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের মাধ্যমে বরাদ্দ রীতি পুনর্বহালের জোর দাবি জানাচ্ছে। পাশাপাশি দেশের উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ বিবেচনায় এ খাতে বাজেট বৃদ্ধি এবং গবেষণার স্বাধীন, কার্যকর পরিবেশ নিশ্চিত করতে এ বিষয়ে দ্রুত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানায়।

বিজ্ঞাপন

আরো

সম্পর্কিত খবর