ঢাকা: মতিঝিল মেট্রোস্টেশনের নিচে আইইডি, মিরপুর ও ফার্মগেটে বোমাসদৃশ বস্তু উদ্ধারের ঘটনা, মিরপুর-১০ স্টেশন থেকে এক হাজার ৭০২টি ইয়াবাসহ গ্রেফতার, কারওয়ান বাজার স্টেশনে সাতটি ইয়াবা ও শেওড়াপাড়া স্টেশনে আট কেজি গাঁজা উদ্ধার— মেট্রোরেল ঘিরে এসব সাম্প্রতিক ঘটনা। আর এই ঘটনাগুলোই প্রশ্ন তুলছে মেট্রোস্টেশনের স্ক্যানিং ব্যবস্থা ও নিরাপত্তা নিয়ে।
রাজধানীর যানজট এড়িয়ে দ্রুত ও স্বস্তিদায়ক যাতায়াতের অন্যতম প্রধান মাধ্যম মেট্রোরেল। উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত প্রায় ২০ কিলোমিটার পথ অল্প সময়ে পাড়ি দিতে প্রতিদিন চার লাখেরও বেশি মানুষ এই পরিবহণ ব্যবহার করেন। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর পর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে উঠেছেন যাত্রীরা।
এদিকে এসব ঘটনাকে বিচ্ছিন্ন বলার চেষ্টা করা হলেও মেট্রোরেল ঘিরে নিরাপত্তা ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে বিপুলসংখ্যক যাত্রীর চাপের মধ্যে অস্ত্র, বিস্ফোরক বা মাদক নিয়ে কেউ স্টেশনে ঢুকছে কি না, তা কতটা কার্যকরভাবে শনাক্ত করা যাচ্ছে— এখন সেটিই বড় প্রশ্ন।
মেট্রোরেলে মাদক পরিবহণ
গত ১৭ আগস্ট সকালে মিরপুর-১০ মেট্রোরেল স্টেশনের গেইট থেকে এক হাজার ৭০২টি ইয়াবাসহ জামাল মোল্যা (৪৩) নামের একজনকে গ্রেফতার করে মিরপুর মডেল থানা-পুলিশ। এমআরটি পুলিশের সহায়তায় তাকে আটক করা হয়। তার কাছ থেকে ইয়াবার পাশাপাশি একটি মুঠোফোন ও নগদ এক হাজার ৪০০ টাকা উদ্ধার করা হয়। পুলিশ জানিয়েছে, জামাল মোল্যার বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা হয়েছে।
এর আগে ৩১ জুলাই রাত আটটার দিকে কারওয়ান বাজার মেট্রোরেল স্টেশনে দু’জনকে সন্দেহজনকভাবে ঘোরাফেরা করতে দেখেন আনসার সদস্যরা। ধাওয়া করে একজনকে আটক করা হয়। তল্লাশিতে তার কাছ থেকে সাতটি ইয়াবা উদ্ধার করা হয়। পরে তাকে ডিএমপির কাছে হস্তান্তর করা হয়।
আর গত বছরের ২৪ নভেম্বর শেওড়াপাড়া মেট্রোরেল স্টেশন থেকে আট কেজি গাঁজাসহ মাহাবুবুর হাওলাদার (৫০) ও তার মেয়ে সুমিকে (৩০) গ্রেফতার করে এমআরটি পুলিশ। পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে তারা জানিয়েছিল, শেওড়াপাড়া থেকে মেট্রোরেলে উঠে মতিঝিল স্টেশনে নামার কথা ছিল তাদের।
পর পর এসব ঘটনায় প্রশ্ন উঠছে, মাদক পরিবহণে মেট্রোরেলকে কি কেউ ব্যবহার করছে? নাকি এসব বিচ্ছিন্ন ঘটনা? এর উত্তর পেতে হলে শুধু গ্রেফতার হওয়া ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মামলা করাই যথেষ্ট নয়; মাদকের উৎস, গন্তব্য, সহযোগী এবং মেট্রোরেল ব্যবহারের কারণও খুঁজে দেখা প্রয়োজন বলে মনে করছেন অপরাধ বিশেষজ্ঞরা।
স্টেশনের নিচে আইইডি
মেট্রোরেলের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে স্টেশনের আশপাশে বিস্ফোরক বা বিস্ফোরকসদৃশ বস্তু পাওয়ার ঘটনাও। গত ২৫ জুলাই মতিঝিল মেট্রোরেল স্টেশনের নিচের সড়ক থেকে একটি ছাতার ভেতর রাখা বোমা উদ্ধার করে পুলিশ। ডিএমপির বোমা উদ্ধার ও নিষ্ক্রিয়কারী দল পরে সেটি নিষ্ক্রিয় করে।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, উদ্ধার করা বস্তুটি ছিল আইইডি। বোমাটি নিষ্ক্রিয় করার সময় বিস্ফোরণের শব্দ হয়। এ সময় বোমার স্প্লিন্টার চোখে লেগে একজন আহত হন। ঘটনাটি ঘটে ব্যস্ত মতিঝিল এলাকায় মেট্রোরেল স্টেশনের ঠিক নিচে। ফলে সেখানে বিস্ফোরণ ঘটলে যাত্রী ও পথচারীদের মধ্যে বড় ধরনের হতাহতের আশঙ্কা ছিল।
এর কয়েকদিন পর গত ১ আগস্ট মিরপুর-১০ ও ফার্মগেট মেট্রোস্টেশনের নিচে বোমাসদৃশ বস্তু পাওয়ার খবর পাওয়া যায়। ফার্মগেট স্টেশনের নিচে একটি পিলারের কাছে বস্তা পড়ে থাকতে দেখে মেট্রোরেল কর্তৃপক্ষ পুলিশকে খবর দেয়। পরে বোমা নিষ্ক্রিয়কারী দল পরীক্ষা করে জানায়, সেটি ছিল একটি খালি বস্তা। অবশ্য সন্দেহজনক কোনো বস্তু পাওয়া গেলে তা পরীক্ষা না করে উপায় নেই। কারণ, মেট্রোরেলের মতো জনবহুল স্থাপনায় ছোট একটি নিরাপত্তাঝুঁকিও বড় ধরনের আতঙ্ক বা ক্ষয়ক্ষতির কারণ হতে পারে।
যাত্রীর চাপে তল্লাশি কতটা কার্যকর
মেট্রোরেল কর্তৃপক্ষের দাবি, স্টেশনগুলোতে নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার রয়েছে। এমআরটি পুলিশ ও আনসার সদস্যরা দায়িত্ব পালন করছেন। সিসিটিভি ক্যামেরা ও নিয়ন্ত্রণকক্ষের মাধ্যমে নজরদারিও করা হয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, ব্যস্ত সময়ে স্টেশনগুলোতে যাত্রীর চাপ অনেক বেশি থাকে। ফলে প্রত্যেক যাত্রীর দেহ ও ব্যাগ সমানভাবে তল্লাশি করা কতটা সম্ভব, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
মেট্রোরেলের নিয়মিত যাত্রী আশকোনার বাসিন্দা বাবুল আক্তার সারাবাংলাকে বলেন, ‘যাত্রীর চাপের কারণে প্রত্যেককে আলাদাভাবে তল্লাশি করা কঠিন।’ তার মতে, আধুনিক আর্চওয়ে ও মেটাল ডিটেক্টর ব্যবহার করে দ্রুত যাত্রী পরীক্ষা করা গেলে নিরাপত্তা বাড়ানোর পাশাপাশি যাত্রীদের ভোগান্তিও কমানো সম্ভব।
কর্তৃপক্ষ যা বলছে
ঢাকা মেট্রোরেলের উপপ্রকল্প পরিচালক (গণসংযোগ) ও তথ্য কর্মকর্তা মো. আহসান উল্লাহ শরিফী সারাবাংলাকে বলেন, ‘নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার রয়েছে বলেই অপরাধীরা ধরা পড়ছে। পাশাপাশি নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা দলকে আরও সতর্ক করা হয়েছে, যাতে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা এড়ানো যায়।’
যাত্রীর চাপের কারণে সবাই আর্চওয়ে দিয়ে প্রবেশ করেন না বা দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের পক্ষে সব সময় পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব হয় না- এমন পরিস্থিতিতে বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়ার পরিকল্পনা আছে কি না? জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘গণপরিবহণে অতিরিক্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা বাস্তবায়নের কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মেট্রোরেলেও একই ধরনের নিরাপত্তাব্যবস্থা দেখা যায়।’ তবে বিষয়টি নিয়ে লিখিত প্রশ্ন পেলে তিনি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করবেন।
এমআরটি পুলিশের পরিদর্শক (অপারেশন) মোহাম্মদ মহসিন সারাবাংলাকে বলেন, ‘সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের পাশাপাশি সাধারণ যাত্রীদের ওপর নজরদারি ও তল্লাশি কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। নিয়মিত তল্লাশির অংশ হিসেবেই মিরপুর-১০ স্টেশন থেকে ইয়াবার চালানটি জব্দ করা সম্ভব হয়েছে।’
তিনি জানান, ভবিষ্যতে প্রতিটি স্টেশনে আধুনিক নিরাপত্তা সরঞ্জাম স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হবে। গেট স্ক্যানার, লাগেজ স্ক্যানার ও আর্চওয়ে মেটাল ডিটেক্টর থাকলে যাত্রী ও তাদের মালামাল আরও কার্যকরভাবে পরীক্ষা করা সম্ভব হবে।
নিরাপত্তায় প্রযুক্তির ব্যবহার
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক সারাবাংলাকে বলেন, ‘মেট্রোরেলের যাত্রীদের তল্লাশি ও নিরাপত্তা আরও বাড়ানো প্রয়োজন। প্রতিটি স্টেশনে স্ক্যানিং মেশিন স্থাপনের পাশাপাশি আইন লঙ্ঘনকারী ব্যক্তিদের শনাক্তে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে।’
অপরাধের ধরণ ও ঝুঁকি বিশ্লেষণ করে নিরাপত্তাব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করার পরামর্শ দেন তিনি। তবে শুধু প্রযুক্তি স্থাপন করলেই নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে না বলে মনে করেন এই বিশেষজ্ঞ। তার মতে, যন্ত্রপাতি পরিচালনার জন্য প্রশিক্ষিত জনবল, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এবং উদ্ধার হওয়া অপরাধের তথ্য বিশ্লেষণের ব্যবস্থাও থাকতে হবে।