ঢাকা: গ্রিসে পাঠানোর প্রলোভন দেখিয়ে মানব পাচারের সঙ্গে জড়িত একটি সংঘবদ্ধ চক্রের সদস্য মোহাম্মদ মিকাইল ইসলামকে (৫২) গ্রেফতার করেছে অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।
চলতি বছরের মার্চ মাসে ভূমধ্যসাগরে অনাহার, তৃষ্ণা ও পানিশূন্যতায় ১৮ বাংলাদেশির প্রাণ হারানোর ঘটনায় তদন্ত করতে গিয়ে তার সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া যায়।
বুধবার (১৭ জুন) সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার (মিডিয়া) জসীম উদ্দিন খান স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।
তিনি জানান, সিআইডির মানব পাচার প্রতিরোধ (টিএইচবি) ইউনিট গত ১৫ জুন সিলেট বিমানবন্দর এলাকা থেকে মিকাইল ইসলামকে গ্রেফতার করে।
গ্রেফতার মিকাইল ইসলাম সুনামগঞ্জ জেলার দিরাই উপজেলার মিঠাপুর গ্রামের বাসিন্দা।
জসীম উদ্দিন খান বলেন, উন্নত জীবনের আশায় অনেক মানুষ দালাল চক্রের প্রলোভনে পড়ে অবৈধ পথে বিদেশ যাওয়ার ঝুঁকি নেন। এসব মানব পাচারকারী চক্র বিদেশে কর্মসংস্থানের স্বপ্ন দেখিয়ে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নেয় এবং পরে তাদের জীবনকে চরম ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেয়।
সিআইডি জানায়, নিহতদের একজন মাসুম (ছদ্মনাম) ও গ্রেফতারকৃত মিকাইল ইসলাম একই গ্রামের বাসিন্দা। আর্থিক সংকট দূর করার আশায় মাসুমকে গ্রিসে পাঠানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে তার পরিবারের কাছ থেকে প্রায় ১৩ লাখ টাকা আদায় করা হয়। চক্রটি প্রথমে লিবিয়ায় পাঠানোর জন্য ৫ লাখ ৫০ হাজার টাকা এবং গ্রিসে পৌঁছানোর পর আরও ৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা দেওয়ার শর্ত দেয়।
তিনি বলেন, ‘তদন্তে জানা গেছে, ঢাকায় ১৭ দিন অবস্থানের পর মাসুমকে লিবিয়ায় পাঠানো হয়। সেখানে পৌঁছানোর পর তার পরিবারকে আরও অর্থ পরিশোধ করতে বলা হয়। নির্দেশনা অনুযায়ী গত জানুয়ারিতে মাসুমের বাবা একটি ব্যাংক হিসাবে ৪ লাখ টাকা জমা দেন এবং পরবর্তীতে গ্রেফতার হওয়া মিকাইল ইসলামের কাছে নগদ ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা প্রদান করেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘২০২৬ সালের ২১ মার্চ ১৮ বাংলাদেশিসহ মোট ৪৫ জন অভিবাসনপ্রত্যাশীকে অবৈধ সমুদ্রপথে গ্রীসের উদ্দেশ্যে পাঠানো হয়। যাত্রাপথে নৌযানটি ভূমধ্যসাগরে আটকে পড়ে। খাদ্য ও পানির তীব্র সংকটে যাত্রীরা চরম মানবিক বিপর্যয়ের মুখে পড়েন। কয়েকদিন আটকে থাকার পর এক পর্যায়ে অনাহার ও পানিশূন্যতায় প্রাণ হারান একাধিক ব্যক্তি যাদের মধ্যে ১৮ জন বাংলাদেশি ছিলেন।’
জীবিত উদ্ধার হওয়া কয়েকজনের বরাত দিয়ে সিআইডি জানায়, পাচারকারীদের নির্দেশে মৃত ব্যক্তিদের মরদেহ মাঝ সমুদ্রে ফেলে দেওয়া হয়েছিল।
জসীম উদ্দিন খান বলেন, ‘তদন্তে একটি সংঘবদ্ধ আন্তর্জাতিক মানব পাচারকারী চক্রের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে। চক্রটি বৈধ অভিবাসনের পরিবর্তে লিবিয়া হয়ে অবৈধভাবে ইউরোপে পাঠানোর নামে বিদেশগমনেচ্ছু ব্যক্তিদের কাছ থেকে বিপুল অর্থ আদায় করত। একই সঙ্গে ভুক্তভোগীদের আটকে রেখে বিভিন্নভাবে অর্থ আদায় এবং ঝুঁকিপূর্ণ সমুদ্রপথে পাঠানোর ব্যবস্থাও করত। গ্রেফতার হওয়া মিকাইল ইসলাম প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে মানব পাচার কার্যক্রমে সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেছেন। তাকে আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে।’
সিআইডির এই কর্মকর্তা বলেন, ‘মামলাটির তদন্ত এখনও চলমান রয়েছে। মানব পাচারকারী চক্রের অন্যান্য সদস্যদের শনাক্ত ও গ্রেফতার, আর্থিক লেনদেনের উৎস অনুসন্ধান এবং আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কের সম্পৃক্ততা উদ্ঘাটনে তদন্ত কার্যক্রম অব্যাহত আছে।’
এদিকে বিদেশে কর্মসংস্থান, অভিবাসন কিংবা ভ্রমণের ক্ষেত্রে শুধুমাত্র সরকার অনুমোদিত বৈধ প্রক্রিয়া অনুসরণের জন্য জনগণের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে সিআইডি। পাশাপাশি মানব পাচার, জাল ভিসা বা অভিবাসী চোরাচালান সংক্রান্ত কোনো তথ্য থাকলে তাৎক্ষণিকভাবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জানানোর অনুরোধ করা হয়েছে।