কক্সবাজার: কক্সবাজারে বন্যার পানি নেমেছে, কিন্তু শুকায়নি কৃষকের চোখের জল। জেলার প্রায় ৪৩ হাজার কৃষকের কাছে এই বন্যা শুধু ফসল নয়, জীবিকার ভরসাও কেড়ে নিয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা মনে করছেন, ত্রাণ নয়, দ্রুত কৃষি পুনর্বাসন জরুরি। আর কৃষি বিভাগ বলছে, বীজ ও চারা সহায়তার মাধ্যমে কৃষকদের দ্রুত চাষাবাদে ফিরিয়ে আনতে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের কক্সবাজার কার্যালয়ের উপপরিচালক ড. বিমল কুমার প্রামানিক বলেন, ‘গত ৭-৮ দিনের টানা ভারী বৃষ্টিতে জেলার প্রায় ৪ হাজার ২১১ হেক্টর কৃষিজমি পানিতে তলিয়ে যায়। গত দুইদিনে পানি নেমে যাওয়ার পর মাঠপর্যায়ে প্রাথমিক ক্ষয়ক্ষতির মূল্যায়ন করা হয়েছে। এতে প্রায় ৩ হাজার হেক্টর জমির ফসল সম্পূর্ণ নষ্ট হয়েছে। ক্ষতির মধ্যে রয়েছে আমন ধানের বীজতলা, আউশ ধান, গ্রীষ্মকালীন সবজি এবং কিছু পানের বরজ।’
তিনি জানান, প্রাথমিক হিসাবে কৃষকদের ক্ষতির পরিমাণ ৮০ কোটি টাকারও বেশি। তবে এখনো আমন মৌসুম থাকায় কৃষকদের দ্রুত নতুন করে বীজতলা তৈরির পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। বিষয়টি এরইমধ্যে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। তাদের আশ্বাস অনুযায়ী, ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের বীজ সহায়তা দেওয়া হবে। পাশাপাশি যাদের নিজস্বভাবে বীজতলা তৈরির সুযোগ নেই, তাদের জন্য সরকারি উদ্যোগে কমিউনিটিভিত্তিক বীজতলা তৈরি করে সেখান থেকে চারা সরবরাহের পরিকল্পনাও নেওয়া হচ্ছে।
কক্সবাজারের চান্দেরপাড়া এলাকার কৃষক ইসমাঈল মোহাম্মদ বলেন, ‘৪ কানি জমিতে পুঁইশাক, পাটশাক ও করলাসহ তিন ধরনের শাক-সবজি চাষ করেছিলাম। সবমিলিয়ে প্রায় ৮ লাখ টাকা খরচ হয়েছে। কিন্তু সাম্প্রতিক বন্যায় সবকিছু শেষ হয়ে গেছে। পুরো খেত বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে। পানি নামলেও জমির ওপর এক কোমর সমান কাদামাটি জমে আছে। এখন বুঝতে পারছি না, আগে কাদামাটি সরাব, নাকি নতুন করে চাষ শুরু করব। নতুন করে চাষের জন্য টাকা কোথায় পাব, কে দেবে, কী করব, কিছুই বুঝে উঠতে পারছি না।’
ইসমাঈলের মতো একই পরিণতি হয়েছে কক্সবাজার সদর, রামু, চকরিয়া, পেকুয়া, মাতামুহুরী, উখিয়া ও টেকনাফ উপজেলার হাজারো কৃষকের। সবজির ভান্ডারখ্যাত রামু, চকরিয়া ও মাতামুহুরী অঞ্চলের বিস্তীর্ণ কৃষিজমি টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে তলিয়ে যায়। নয়দিন পর পানি নেমেছে, কিন্তু মাঠজুড়ে এখন শুধু নষ্ট ফসল আর অনিশ্চিত ভবিষ্যতের ছবি।
চকরিয়ার কৃষক আবসার উদ্দিন জানান, টানা বৃষ্টিতে তার প্রায় ৩ লাখ টাকার বীজতলা সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গেছে। একই সঙ্গে মৎস্য ঘের থেকে প্রায় ২০ লাখ টাকার মাছ ভেসে গেছে।
মাতামুহুরী এলাকার কৃষক রুহুল কাদের জানান, বন্যার পানিতে তার বীজতলা নষ্ট হয়ে যাওয়ার পাশাপাশি ঘরে মজুত প্রায় ১০ মণ ধানও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ ছাড়া শাক-সবজির খেত পানিতে তলিয়ে গেছে। তিনি বলেন, ‘এই ক্ষতির পর এখন আমি চরম দুশ্চিন্তায় আছি। কীভাবে ধার-দেনা পরিশোধ করব এবং কীভাবে সংসারের খরচ চালাব, তা নিয়ে আমি উদ্বিগ্ন।’
রামুর মুক্তারকুল এলাকার কৃষক মফিজুর রহমান বলেন, ‘এখনো পর্যন্ত মাঠে আমরা কোনো কৃষি কর্মকর্তাকে দেখিনি। কৃষি কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দ্রুত মাঠে এসে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সঙ্গে বসা উচিত। কার কী ধরনের ক্ষতি হয়েছে, তা সরেজমিনে দেখে প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করা দরকার। প্রান্তিক কৃষকদের এই সংকটে সরকারকে কার্যকর ভূমিকা নিতে হবে।’
আরেক কৃষক ফরিদুল আলম বলেন, ‘আমরা খেটে খাওয়া মানুষ, আমরা কৃষক। আমাদের ত্রাণের প্রয়োজন নেই; আমরা চাই দ্রুত ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ। সরকার যদি বীজ, সার, কৃষিঋণ ও পুনর্বাসন সহায়তা দেয়, তাহলে আমরা আবার উৎপাদনে ফিরতে পারব। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে যেন এমন দুর্ভোগের মুখে পড়তে না হয়, সে জন্য সরকারকে টেকসই ও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।’