বাকৃবি: বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) পোলট্রি বিজ্ঞান বিভাগের গবেষকেরা দীর্ঘ ১৫ বছরের গবেষণায় নতুন একটি রঙিন মাংস উৎপাদনকারী মুরগির জাত উদ্ভাবন করেছেন। গবেষকদের দাবি, নতুন জাতটি ভোক্তার চাহিদা, খামারিদের লাভজনক উৎপাদন এবং নিরাপদ মাংস নিশ্চিত করার লক্ষ্যকে সামনে রেখে উদ্ভাবন করা হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের পোলট্রি বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. বজলুর রহমান মোল্যার নেতৃত্বে গবেষণাটি পরিচালিত হয়। প্রাণিসম্পদ ও ডেইরি উন্নয়ন প্রকল্পের (এলডিডিপি) অর্থায়নে বাস্তবায়িত এ গবেষণায় দীর্ঘ প্রায় দেড় দশক ধরে বিভিন্ন প্যারেন্ট লাইন সংরক্ষণ, নির্বাচন ও সংকরায়ণের মাধ্যমে নতুন লাইন উন্নয়ন করা হয়েছে।
অধ্যাপক মোল্যা বলেন, ‘গবেষণায় সেক্স-লিংক হোয়াইট লাইনকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে এর সমজাতীয়তা বা হোমোজাইগোসিটি ৮৯ থেকে ৯৩.১১ শতাংশে উন্নীত হয়েছে, যা একটি স্থায়ী জাত হিসেবে বাণিজ্যিক উৎপাদনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ ছাড়া মুরগির পালকের রঙ নির্ধারণকারী এসওএক্স-১০ জিনের ডিলিশন শনাক্তে একটি সহজ পিসিআর পদ্ধতি উদ্ভাবন করা হয়েছে, যা ভবিষ্যৎ প্রজনন কর্মসূচিতে বড় ভূমিকা রাখবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘জাতটির কিছু প্যারেন্ট লাইন ৬২ সপ্তাহে প্রায় ২০৫টি পর্যন্ত ডিম উৎপাদনে সক্ষম হয়েছে। এ ছাড়া প্রচলিত সোনালি মুরগির একদিন বয়সি বাচ্চার ওজন যেখানে সাধারণত ২৬ থেকে ২৮ গ্রাম হয়, সেখানে নতুন উদ্ভাবিত সংকর লাইনে বাচ্চার ওজন পাওয়া গেছে প্রায় ৩৮ গ্রাম। একদিন বয়সি বাচ্চার ওজনে প্রতি এক গ্রাম বৃদ্ধির ইতিবাচক প্রভাব বাজারজাতকরণের সময় প্রায় ৫০ গ্রাম অতিরিক্ত চূড়ান্ত ওজনে প্রতিফলিত হয়, যা খামারিদের বাড়তি মুনাফা নিশ্চিত করবে।’
গবেষণা প্রকল্পের অংশ হিসেবে মাঠপর্যায়েও প্রযুক্তি হস্তান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হয়। গবেষণা দল গ্রামে গিয়ে ১৫-২৫ জনের ক্লাস্টারভিত্তিক নারী খামারিদের হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ দেয়।
গবেষকদের দাবি, নিয়মিত কারিগরি সহায়তা, সময়মতো টিকাদান ও স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণের ফলে খামারগুলোতে মুরগির বৃদ্ধি, খাদ্য রূপান্তর দক্ষতা ও উৎপাদনশীলতা বেড়েছে এবং মৃত্যুহার কমেছে। বাজারে চাহিদা থাকায় অনেক খামারি নির্ধারিত ৫০ দিনের পরিবর্তে ১০-১২ সপ্তাহ পর্যন্ত মুরগিগুলো পালন করছেন। এতে প্রতি কেজি ৭০০ টাকা পর্যন্ত দামে বিক্রি করে তারা লাভবান হচ্ছেন বলেও জানানো হয়।
ভোক্তা অধিকার ও স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়ে ড. মোল্যা দাবি করেন, ঢাকার একটি উন্নত গবেষণাগারে এই মুরগির মাংস পরীক্ষা করে কোনো অ্যান্টিবায়োটিকের অবশিষ্টাংশ পাওয়া যায়নি।
বাজারে দেশি মুরগির নামে চালিয়ে ক্রেতাদের সঙ্গে প্রতারণার কোনো সুযোগ থাকবে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান যে, দেশি মুরগির নাম ভাঙানো নয়, বরং উন্নত স্বাদ, পুষ্টিগুণ ও শতভাগ নিরাপদ মাংসের নিশ্চয়তা দিয়ে এটিকে বাজারে একটি স্বতন্ত্র রঙিন মাংসের ব্র্যান্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠা করাই তাদের মূল লক্ষ্য।
উদ্ভাবনটির মাঠপর্যায়ে প্রসারের ওপর গুরুত্ব দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ. কে. ফজলুল হক ভূঁইয়া বলেন, ‘শুধু ল্যাবরেটরিতে জাত উদ্ভাবন করলেই হবে না, সেই প্রযুক্তি ও সুফল খামারিদের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়াই এই প্রকল্পের মূল দর্শন। এর মাধ্যমে খামারিরা লাভবান হবেন এবং দেশের নিরাপদ প্রাণিজ প্রোটিন উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘ভবিষ্যতে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব গবেষণায় উৎপাদিত দুগ্ধ, মাংস ও পোলট্রিজাত সব পণ্য সরাসরি বিক্রয় কেন্দ্রের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের কাছে সুলভ মূল্যে পৌঁছে দিতে হবে।’
মঙ্গলবার (৩০ জুন) বিশ্ববিদ্যালয়ের পোলট্রি বিজ্ঞান বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ড. মো. শওকত আলীর সভাপতিত্বে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে গবেষণাটির চূড়ান্ত ফলাফল উপস্থাপন করা হয়। অনুষ্ঠানে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, গবেষক ও পোলট্রি খাতের উদ্যোক্তারা উপস্থিত ছিলেন। শেষে নতুন উদ্ভাবিত মুরগির মাংস দিয়ে প্রস্তুত করা খাবার পরিবেশন করা হয়।