রংপুর: রংপুর নগরীতে এইচএসসি পরীক্ষার্থী নুজসাত আক্তারের আত্মহত্যার ঘটনায় নতুন ও চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে। মৃত্যুর ঠিক আগে অভিযুক্ত প্রাইভেট শিক্ষক শাহরিয়ার আহমেদ সাকিনের সঙ্গে চারবার ফোনে কথা বলেছেন তিনি। গত তিন মাসে তাদের মধ্যে মোট ১১৮ বার ফোনালাপের রেকর্ড পাওয়া গেছে, যা অভিযুক্তের দাবির সম্পূর্ণ বিপরীত।
রোববার (২৮ জুন) দুপুরে রংপুরের অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মুহাম্মদ রাশেদ হোসাইনের আদালতে সাকিনকে হাজির করে তিনদিনের রিমান্ড আবেদন করে পুলিশ। শুনানি শেষে আদালত একদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন এবং আসামির জামিন আবেদন নাকচ করে দেন।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও কোতোয়ালি থানার ওসি (তদন্ত) রফিকুল ইসলাম আদালতকে জানান, সিডিআর (কল ডিটেইলস রেকর্ড) বিশ্লেষণে নুজসাত ও সাকিনের মধ্যে গভীর রাতেও অস্বাভাবিক ফোনালাপের প্রমাণ মিলেছে। বিশেষ করে ১৬ জুন ভোর ৩টা ৪৬ মিনিটে তারা টানা প্রায় ৫০ মিনিট ফোনে কথা বলেন, যা সাধারণ শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্কের চেয়ে অনেক বেশি গভীর সম্পর্কের ইঙ্গিত দেয়।
আত্মহত্যার আগে মুছে ফেলেন মোবাইলের সব তথ্য
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ছাদ থেকে লাফ দেওয়ার ঠিক আগে নুজসাত তার মোবাইল ফোনটি ‘ফ্যাক্টরি রিসেট’ (সব তথ্য মুছে ফেলা) করেন। ফলে ফোনে সংরক্ষিত চ্যাট, ছবি ও অন্যান্য ডিজিটাল তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে সিমের কল ডিটেইলস বিশ্লেষণ করে তাদের মধ্যে নিয়মিত ও ঘনিষ্ঠ যোগাযোগের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পেয়েছে পুলিশ।
আদালতে আসামিপক্ষের আইনজীবীরা দাবি করেন, এসব ফোনালাপ শিক্ষক-শিক্ষার্থীর স্বাভাবিক কথোপকথন ছিল।
তবে বাদীপক্ষের আইনজীবী আবু হায়দার মোহাম্মদ আব্দুল মবিন বলেন, শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্কের কথা বললেও গভীর রাতে তাদের মধ্যে দীর্ঘক্ষণ কথোপকথন ভিন্ন কিছু ইঙ্গিত দেয়। রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে ঘটনার প্রকৃত কারণ উদঘাটন হবে।
নুজসাতের বাবার সুষ্ঠু তদন্ত ও ন্যায়বিচারের দাবি
মামলার বাদী ও নিহত শিক্ষার্থীর বাবা নজরুল ইসলাম আদালতের রিমান্ড আদেশে সন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, ‘আমি আমার মেয়ের ন্যায়বিচার চাই। সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন হোক এবং দোষী ব্যক্তি যেন শাস্তি পায়।’
পুলিশ জানিয়েছে, রিমান্ডে সাকিনকে জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে যেসব বিষয়গুলো খতিয়ে দেখা হচ্ছে তারমধ্যে ভোর ৩টায় ৫০ মিনিটের ফোনালাপের বিষয়বস্তু, আত্মহত্যার ঠিক আগে চারবার ফোনালাপের কারণ, নুজসাতকে আত্মহত্যায় প্ররোচিত করার কোনো প্রমাণ রয়েছে কিনা, ফ্যাক্টরি রিসেটের পেছনে সাকিনের কোনো ভূমিকা ছিল কিনা।
উল্লেখ্য, গত ২২ জুন বিকেলে রংপুর নগরীর পায়রা চত্বর এলাকার ‘নর্থ ভিউ হোটেল অ্যান্ড রেস্টুরেন্ট’-এর ছাদ থেকে লাফ দিয়ে মারা যান নুজসাত। এ ঘটনায় তার বাবা বাদী হয়ে সাকিনের বিরুদ্ধে আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগে মামলা দায়ের করেন।
এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘটনাটি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা চলছে। শিক্ষার্থীরা সাকিনের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তি দাবি করে বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে প্রতিবাদ জানাচ্ছেন। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সাকিন একটি কোচিং সেন্টারের শিক্ষক ছিলেন এবং নুজসাত সেখানে পড়াশোনা করতেন।
পুলিশ জানিয়েছে, রিমান্ড শেষে সাকিনকে আবার আদালতে হাজির করে আরও জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রিমান্ড আবেদন করা হতে পারে। ঘটনার সঙ্গে জড়িত অন্য কেউ আছে কিনা তাও তদন্তে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।