সিরাজগঞ্জ: প্রচণ্ড গরমে হাঁসফাঁস করছে জনজীবন। দিনের বেলায় তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সিরাজগঞ্জ শহর ও গ্রামাঞ্চলে বেড়েছে মৌসুমি ফল তালের শাঁসের চাহিদা। রাস্তার মোড়, বাজার, বাসস্ট্যান্ড ও গুরুত্বপূর্ণ সড়কের পাশে এখন দেখা মিলছে তালের শাঁস বিক্রেতাদের। গরমে স্বস্তি পেতে এবং শরীর ঠান্ডা রাখতে অনেকেই ভিড় করছেন এসব অস্থায়ী দোকানে।
সিরাজগঞ্জ শহরের বাজার স্টেশন, এসএস রোড, ধানবান্ধি, রেলগেট, মিরপুর, কড্ডার মোড় ও নলকা এলাকায় ঘুরে দেখা যায়, ছোট ছোট ভ্যানে ও ঠেলাগাড়িতে সাজিয়ে রাখা হয়েছে কচি তালের শাঁস। ক্রেতাদের সামনে তাল কেটে শাঁস বের করে বিক্রি করছেন বিক্রেতারা। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ক্রেতাদের ভিড় লেগেই থাকছে।
স্থানীয়দের মতে, কয়েকদিন ধরে জেলার ওপর দিয়ে বয়ে যাচ্ছে তীব্র তাপপ্রবাহ। দুপুরের দিকে রাস্তাঘাট প্রায় ফাঁকা হয়ে গেলেও তালের শাঁসের দোকানগুলোতে ক্রেতাদের উপস্থিতি চোখে পড়ার মতো। বিশেষ করে শ্রমজীবী মানুষ, রিকশাচালক, ভ্যানচালক, শিক্ষার্থী ও পথচারীরা গরম থেকে সাময়িক স্বস্তি পেতে তালের শাঁস কিনে খাচ্ছেন।
সিরাজগঞ্জ শহরের মিরপুর এলাকায় তালের শাঁস কিনতে আসা স্কুল শিক্ষার্থী মোছা: সুমাইয়া বলেন, ‘প্রচণ্ড গরমে বাইরে বের হওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। কোমল পানীয়ের চেয়ে আমি তালের শাঁস খেতে বেশি পছন্দ করি। এটি প্রাকৃতিক খাবার, খেতেও সুস্বাদু এবং শরীর ঠান্ডা রাখে।’
একই এলাকার বাসিন্দা গৃহিণী রোকসানা খাতুন বলেন, ‘বাচ্চাদের জন্য প্রায়ই তালের শাঁস কিনে নিয়ে যাই। গরমে এটি শরীরের জন্য ভালো। বাজারে অনেক ধরনের পানীয় পাওয়া গেলেও প্রাকৃতিক খাবারের প্রতি মানুষের আগ্রহ এখন বেড়েছে।’
তালের শাঁস বিক্রেতা মো: জরিফ জানান, ‘গরম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিক্রিও বেড়েছে। প্রতিদিন ভোরে বিভিন্ন এলাকা থেকে তাল সংগ্রহ করে শহরে নিয়ে আসেন তিনি।’
তিনি বলেন, ‘অন্য সময় দিনে ২০০ থেকে ৩০০টি শাঁস বিক্রি হতো। এখন প্রতিদিন ৬০০ থেকে ৭০০টি শাঁস বিক্রি করছি। দুপুরের পর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি ক্রেতা আসে। গরম যত বাড়ছে, বিক্রিও তত বাড়ছে।’
শহরের আরেক বিক্রেতা সজিব হাসান বলেন, ‘তালের শাঁসের মৌসুম খুব বেশি দিনের নয়। তাই এই সময়ে বিক্রি ভালো হলে কিছু বাড়তি আয় করা যায়। অনেক ক্রেতা একসঙ্গে ১০ থেকে ১৫টি শাঁস কিনে বাড়িতে নিয়ে যান।’
চিকিৎসকরা বলছেন, তালের শাঁসে রয়েছে প্রচুর পানি, খনিজ লবণ ও প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান, যা গরমে শরীরের পানিশূন্যতা দূর করতে সহায়তা করে। এছাড়া এটি শরীরকে সতেজ রাখে এবং তাৎক্ষণিক শক্তি জোগায়।
এ বিষয়ে সিরাজগঞ্জের চিকিৎসক ডা. মোহসেনুল মমিন বলেন, ‘প্রচণ্ড গরমে শরীর থেকে ঘামের মাধ্যমে প্রচুর পানি ও লবণ বের হয়ে যায়। তালের শাঁসে প্রাকৃতিকভাবে পানি ও কিছু প্রয়োজনীয় খনিজ উপাদান থাকে, যা শরীরের পানিশূন্যতা কমাতে সহায়ক ভূমিকা রাখে। তবে যেকোনো খাবারই পরিমিত পরিমাণে খাওয়া উচিত এবং নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশে বিক্রি হওয়া খাবার গ্রহণ করা প্রয়োজন।’
কৃষি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, তালের গাছ বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতি ও পরিবেশের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। একসময় গ্রামের প্রায় প্রতিটি বাড়ির আঙিনায় তালগাছ দেখা গেলেও বর্তমানে এর সংখ্যা কমে এসেছে। তারপরও জেলার বিভিন্ন এলাকায় থাকা তালগাছ থেকে সংগ্রহ করা কচি তাল বাজারে বিক্রি হচ্ছে।
সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার কয়েকজন কৃষক জানান, বর্ষা মৌসুমের আগে কচি তালের শাঁস বিক্রি করে অনেক পরিবার বাড়তি আয় করছে। বিশেষ করে যেসব এলাকায় তালগাছ বেশি রয়েছে, সেখানকার মানুষ মৌসুমি এই ব্যাবসার সঙ্গে যুক্ত হচ্ছেন।
পরিবেশবিদদের মতে, তালগাছ শুধু ফলই দেয় না, এটি বজ্রপাত প্রতিরোধ, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাই তালগাছ সংরক্ষণ ও নতুন করে রোপণের উদ্যোগ বাড়ানো প্রয়োজন।
এদিকে সিরাজগঞ্জ তাড়াশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের কর্মকর্তা মো: জাহিদুল ইসলাম বলেন, ‘পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী কয়েকদিন তাপমাত্রা উচ্চ পর্যায়ে থাকতে পারে। ফলে তালের শাঁসসহ বিভিন্ন মৌসুমি ও প্রাকৃতিক ফলের চাহিদা আরও বাড়তে পারে বলে মনে করছেন ব্যবসায়ীরা।’
গরমের এই সময়ে যখন মানুষ স্বস্তির খোঁজে ছুটছে, তখন তালের শাঁস হয়ে উঠেছে সিরাজগঞ্জবাসীর কাছে এক পরিচিত ও জনপ্রিয় প্রাকৃতিক খাবার। স্বাস্থ্যকর, সুস্বাদু এবং তুলনামূলক সাশ্রয়ী হওয়ায় প্রতিদিনই বাড়ছে এর কদর। তীব্র গরমের মধ্যেও তালের শাঁসের দোকানগুলোতে ক্রেতাদের ভিড় প্রমাণ করে, প্রাকৃতিক খাবারের প্রতি মানুষের আগ্রহ এখনও অটুট রয়েছে।