Friday 05 Jun 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

সুবিধা পাচ্ছেন না জেলেরা / অকেজো পড়ে আছে ভোলার ১৩ কোটি টাকার দুটি মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র

এম হেলাল উদ্দিন, ডিস্ট্রিক্ট করেসপন্ডেন্ট
৫ জুন ২০২৬ ০৮:০৫ | আপডেট: ৫ জুন ২০২৬ ০৯:৫০

ভোলায় নির্মাণাধীন সামুদ্রিক মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র।

ভোলা: চাহিদা ও সম্ভাবনার কথা মাথায় রেখে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে ভোলা সদর উপজেলার কাচিয়া ইউনিয়নের কাঠিরমাথা এবং লালমোহন উপজেলার লর্ড হার্ডিঞ্জ ইউনিয়নের বুড়িরদোন এলাকায় প্রায় ১৩ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হয়েছিল দুটি আধুনিক সামুদ্রিক মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র। উদ্দেশ্য ছিল- জেলেদের জন্য আধুনিক মাছ সংরক্ষণ, বিপণন ও অবকাঠামোগত সুবিধা নিশ্চিত করা। কিন্তু  নানা ত্রুটি, অনিয়ম ও পরিকল্পনার দুর্বলতায় কেন্দ্র দুটি এখন কার্যত অকেজো হয়ে পড়ে আছে। কোটি কোটি টাকার ব্যয়ে নির্মিত স্থাপনা জেলেদের কোনো উপকারে আসছে না।

এই প্রকল্পের নির্মাণকাজে শুরু থেকেই ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া মেঘনা নদীর যে ঘাটে অবতরণ কেন্দ্র নির্মাণ করা হয়েছে, সেখানে আসে না জেলে নৌকা বা ট্রলার। যাতায়াতের সহজ রাস্তাও নেই। উপজেলা মৎস্য অফিস থেকে কেন্দ্রগুলো দূরে হওয়ায় নিয়মিত নজরদারিও সম্ভব নয়।

বিজ্ঞাপন

জানা গেছে, মৎস্য অধিদফতরের ‘সাসটেইনেবল কোস্টাল অ্যান্ড মেরিন ফিশারিজ’ প্রকল্পের আওতায় এ দুটি অবতরণ কেন্দ্র নির্মাণ করা হয়। ২০২২ সালে প্রকল্প শুরুর আগে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, ব্যবসায়ী ও জমির মালিকদের সঙ্গে একাধিক সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে আধুনিক মাছঘাট, বরফকল, কোল্ডস্টোরেজ, স্যানিটেশন ও জেলেদের সুবিধার নানা আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল। স্থানীয়রা সেই আশ্বাসে জমি ব্যবহারে সম্মতি দেন। কিন্তু বাস্তবে সেই প্রতিশ্রুতির অধিকাংশই বাস্তবায়ন হয়নি।

সম্প্রতি সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, প্রকল্পের আওতায় সদর উপজেলার কাচিয়া ইউনিয়নের কাঠিরমাথা এলাকায় প্রায় সাড়ে ৫ কোটি টাকা ব্যয়ে মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র নির্মাণ করা হয়। এর  সিঁড়ির টাইলস ভেঙে যাচ্ছে, বিভিন্ন স্থানে প্লাস্টার খসে পড়ছে এবং পাইপলাইন খুলে পড়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, নির্মাণকাজে নদীর লবণাক্ত পানি ব্যবহার করায় ভবনের স্থায়িত্ব নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। এছাড়া ওই ভবনের সামনেই বিশাল চর থাকায় বড় কোনো নৌযান এই ঘাটে ভিড়তে পারছে না। ফলে ওই ঘাটে মাছ খালাস করা বা বেচাকেনা অসম্ভব।

স্থানীয় ব্যবসায়ী ইবরাহীম বলেন, ‘সিঁড়ির পিলার ২৫ ফুট হওয়ার কথা থাকলেও মাত্র ৫ ফুট করা হয়েছে। প্লেট ভেঙে গেছে, ট্যাংক চুঁইয়ে পানি পড়ছে। ভবনের নিচের অংশে খাল তৈরি হওয়ায় ধসে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।’

অন্যদিকে লালমোহনের বুড়িরদোন কেন্দ্রেও একই ধরনের অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। নদীতীরে নির্মিত এই কেন্দ্রটির আশপাশে কোনো বড় মাছঘাটের অস্তিত্ব নেই। স্থানীয় জেলেরা জানান, সেখানে নিয়মিত মাত্র ৪০টি নৌকা মাছ বেচাকেনা করে। বড় ট্রলার বা সাগরগামী বোট সেখানে খুব কমই আসে।

স্থানীয় জেলে ও ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, খালটি যথাযথভাবে খনন করা হয়নি। ওপরে প্রশস্ত হলেও নিচে গভীরতা কম থাকায় নৌকা চলাচলে সমস্যা হচ্ছে। এছাড়া নির্মাণকাজে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহারের কারণে ভবনে ইতোমধ্যে ফাটল দেখা দিয়েছে।

বুড়িরদোন মাছঘাটের আড়তদার মো. শাহাদাত হোসেন বলেন, ‘এটি কার জন্য নির্মাণ হয়েছে, তা কেউ জানে না। নির্মাণের সময় অনিয়ম নিয়ে কথা বললে ঠিকাদারের লোকজন ভয়ভীতি দেখাতো।’

জেলে মিজান মাঝি বলেন, ‘চালুর আগেই টাইলস ভেঙে যাচ্ছে। ভালো মানের ইট-বালু-পাথর ব্যবহার করা হয়নি।’

অভিযোগ রয়েছে, নির্মাণকাজ চলাকালে মৎস্য বিভাগের কোনো প্রকৌশলী নিয়মিত তদারকি করেননি। স্থানীয়দের দাবি, পুরো প্রকল্প চলাকালে প্রকৌশলীরা মাত্র দুই-তিনবার পরিদর্শনে এসেছেন।

তবে অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ঠিকাদার শহিদুল ইসলাম। তিনি বলেন, সদর উপজেলার অবতরণকেন্দ্রে ১ কোটি টাকা এবং লালমোহনের কেন্দ্রে প্রায় ৩ কোটি টাকা অতিরিক্ত ব্যয় করেছেন, যার অনুমোদন পাননি। তিনি দাবি করেন, ‘বরাদ্দের চেয়েও অতিরিক্ত ব্যয় করেছি। যা যা বরাদ্দ ছিল, সবই দেওয়া হয়েছে।’

ভোলা মৎস্য বিভাগের জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. ইকবাল হোসাইন বলেন, ‘ভোলা সদর উপজেলার কাচিয়া কাঠিরমাথা ও লালমোহন উপজেলার লর্ডহার্ডিঞ্জ ইউনিয়নের বুড়িরদোন এলাকায় দুটি মৎস্য অবতরণকেন্দ্র নির্মাণ করা হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে মৎস্য অধিদফতরের একটি বড় প্রকল্পের আওতায় এসব ভবন বাস্তবায়ন করা হয়েছে। প্রকল্পটির মেয়াদ গত বছরের অক্টোবর মাসে শেষ হলেও তখন কাজ শেষ হয়নি। পরে নকশা অনুযায়ী চলতি বছরের মার্চ মাসে কাজ শেষ হয়েছে। এরইমধ্যে ভবন দুটি আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করা হয়েছে। এজন্য ৫ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছিল এবং গত এপ্রিলে তাদের কাছে ভবন দুটি বুঝিয়ে দেওয়া হয়।’

তিনি বলেন, ‘এটুকুর বাইরে বিস্তারিত কোনো তথ্য ভোলা কার্যালয় বা স্থানীয় মৎস্য কর্মকর্তাদের কাছে নেই। ভোলার কোনো কর্মকর্তাকে এ প্রকল্পের সঙ্গে সম্পৃক্ত রাখা হয়নি। অধিদফতরের প্রকল্প কর্মকর্তারা ঢাকা থেকে অবতরণকেন্দ্রগুলোর কাজ বাস্তবায়ন করেছেন। নকশা কেমন ছিল, কত টাকা বরাদ্দ ছিল, কাজের মান কেমন হয়েছে—এসব বিষয়ে আমরা কিছুই জানি না। এটি কীভাবে পরিচালিত হবে, সে বিষয়ে নতুন করে গাইডলাইন তৈরি হচ্ছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘এ প্রকল্পের সঙ্গে মৎস্য বিভাগের একজন প্রকৌশলী যুক্ত ছিলেন। তিনি ভোলাসহ কয়েকটি জেলার দায়িত্বে ছিলেন এবং বরিশালে বসে প্রকল্প কর্মকর্তা ও প্রকৌশলীদের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ দেখভাল করেছেন। তিনি গত এপ্রিলে অবসরে গেছেন। প্রকল্পের এখন পর্যন্ত ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে, কিছু কাজ বাকি রয়েছে। ভবন হস্তান্তরের সময় আমরা সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীর কাছে জানতে চেয়েছিলাম এটি গ্রহণ করা ঠিক হবে কি না। তিনি গ্রহণ করতে বলায় আমরা ভবন দুটি বুঝে নিয়েছি।’

এদিকে মৎস্য অবতরণকেন্দ্র নির্মাণে অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করে মৎস্য বিভাগের প্রকৌশলী গৌতম চন্দ্র দে বলেন, ‘অনেকে অনেক কথা বলবে। কেউ বলবে এখানে আইস মিল থাকার কথা ছিল, এটা থাকার কথা ছিল, সেটা থাকার কথা ছিল। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে—বিল্ডিং তো আছে। এখানে বরফ ক্রাশিংয়ের জায়গা, প্যাকেজিংয়ের জায়গা, ক্রেতা-বিক্রেতাদের বসার জায়গা, জেলে ও ফার্মারদের সভা করার কক্ষ, মাছ ওঠানো-নামানোর ব্যবস্থা—সবই রাখা হয়েছে। ট্রের মতো ব্যবস্থাও রয়েছে। প্রকল্পটি পরে সংশোধন ও রিভাইজ করা হয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘প্রকল্পের সুনির্দিষ্ট ব্যয় এই মুহূর্তে বলতে পারব না। এটি প্রকল্প পরিচালক বলতে পারবেন। সম্ভবত ১১ থেকে ১২ কোটি টাকার মতো ব্যয় হয়েছে। দুটি কেন্দ্রের নকশাও আলাদা।’

শর্ত অনুযায়ী অনেক কাজ বাস্তবায়ন হয়নি—এমন অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এগুলো ছিল মূলত জনসাধারণের সঙ্গে করা প্রাথমিক পরিকল্পনা। শুরুতে আমরা যেভাবে করতে চেয়েছিলাম, সরকার সেভাবে অর্থের ব্যবস্থা করতে পারেনি। ফলে অনেক কিছু কাটছাঁট করতে হয়েছে। কাচিয়াতে বাঁধ পর্যন্ত ফ্লাইওভার নির্মাণের পরিকল্পনা ছিল, কিন্তু বাজেট সংকটের কারণে মাঝপথে কাজ বন্ধ হয়ে যায়। প্রথমে যেভাবে নকশা বা পরিকল্পনা করা হয়েছিল, পরে অর্থের সীমাবদ্ধতায় সেভাবে বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি।’

প্রকৌশলী আরও বলেন, ‘এখন যেটা করা হয়েছে, সেখানে নদী থেকে মাছ এনে স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশে কেনাবেচা করা যাবে। নিলাম, প্যাকেটিং এবং স্বল্প সময়ের জন্য বরফ দিয়ে মাছ সংরক্ষণের ব্যবস্থাও রয়েছে। বাইরের ক্রেতা-বিক্রেতারা এসে বসে আলোচনা করতে পারবেন। এসব ব্যবস্থাপনার জন্য আলাদা কক্ষ ও শৌচাগারের সুবিধাও রাখা হয়েছে।’

হস্তান্তরের আগেই বিভিন্ন স্থানে ভাঙন, কাচ ভেঙে যাওয়া বা পাইপ খুলে পড়ার বিষয়ে জানতে চাইলে গৌতম চন্দ্র দে বলেন, ‘কাচ ভেঙে থাকলে পরে কেউ ভেঙে থাকতে পারে। এটি তো একটি পাবলিক প্লেস। সেখানে দেখভালের জন্য কোনো লোক নিয়োগ নেই। সংরক্ষিত এলাকা হলে নিয়মিত দেখভাল করা যেত। হস্তান্তরের পর সেখানে কে আসছে, কে যাচ্ছে—তা দেখারও হয়তো কেউ নেই। আর ওভারহেড ট্যাংক তো প্লাস্টিকের, সেখান থেকে পানি চুইয়ে পড়ার কথা নয়।’

প্রকল্পের উপপরিচালক আজহারুল ইসলাম বলেন, ‘স্থান নির্বাচন অনেক বিষয় বিবেচনা করেই করা হয়েছে। এখন যেহেতু ভবন নির্মাণ হয়ে গেছে, তাই সবার সহযোগিতায় এটি চালু করা সম্ভব।’

ভোলা জেলা মৎস্য অফিসে প্রকল্পসংক্রান্ত তথ্য না থাকার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘জেলা মৎস্য কর্মকর্তা যদি না জেনে থাকেন, তাহলে জেনে নেওয়া তার দায়িত্ব।’