Thursday 16 Apr 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

দালালচক্রের ফাঁদে মরণযাত্রা
কক্সবাজার উপকূলে শত পরিবারে কান্না

ইমরান হোসাইন, ডিস্ট্রিক্ট করেসপন্ডেন্ট
১৬ এপ্রিল ২০২৬ ০৯:৫৭

সমুদ্রযাত্রায় স্বজন হারিয়ে কাঁদছেন এক নারী।

কক্সবাজার: রাত নামলে টেকনাফের লেঙ্গুর বিল কিংবা পেকুয়ার নতুন ঘোনা গ্রামগুলোতে এখন আর আগের মতো স্বাভাবিক নীরবতা নামে না। বাতাসে ভেসে আসে কান্নার শব্দ। কারও স্বামী, কারও ছেলে, কারও ভাই। সবাই যেন একসঙ্গে হারিয়ে গেছে হাজার কিলোমিটারের বেশি দূরের আন্দামান সাগরের অন্ধকারে।

টেকনাফ সদর ইউনিয়নের লেঙ্গুর বিল এলাকার ২৭ বছর বয়সী মোস্তাক আহমদের ঘরে এখন শোকের ভারী বাতাস। তিন বছর আগে বিয়ে করেছিলেন। দেড় বছরের একটি ছোট ছেলে সন্তান আছে। কৃষিকাজ করে কোনো রকমে সংসার চলত। কিন্তু “উন্নত জীবনের” স্বপ্ন দেখিয়ে টেকনাফের হাতিয়ার ঘোনার এক দালাল দম্পতি তাকে নিয়ে যায় অজানা পথে।

বিজ্ঞাপন

স্ত্রী ইসমত আরা জানাচ্ছিলেন, দালালকে দেওয়ার জন্য প্রথমে ৩ লাখ ২০ হাজার টাকা দাবি করা হলেও পরে কমিয়ে ২ লাখ ৮০ হাজার টাকা চাওয়া হয়। কিন্তু টাকা জোগাড়ের আগেই নিখোঁজ হয়ে যান মোস্তাক। শেষবার ফোনে শুধু বলেছিল, দোয়া করো। এরপর আর কোনো খবর নেই। এ কথা শেষ না করতেই নিজেকে আর ধরে রাখতে পারলেন না ইসমত। হাউমাউ করে কেঁদে উঠলেন। একইসঙ্গে পাশেই ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠার শব্দ। সেখানে গিয়ে দেখা যায়, অন্ধকার কক্ষে ভাইয়ের ছবি হাতে কাঁদছে বোন ছাদেকা।

মঙ্গলবার (১৪ এপ্রিল) দুপুরে এবং বিকেলে টেকনাফ উপজেলার সদর ও বাহারছড়া ইউনিয়নের চারটি পরিবারে গিয়ে একই চিত্র দেখা যায়।

পেকুয়ার রাজাখালী ইউনিয়নের মিয়ারপাড়া এলাকার বেলাল উদ্দিনও একই স্বপ্নে পা বাড়িয়েছিলেন সাগরপথে। তার সঙ্গে থাকা একই গ্রামের আরও তিনজন এখনো নিখোঁজ।

পরদিন বুধবার (১৫ এপ্রিল) দুপুরে বেলালের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য। স্ত্রী আয়েশা বেগম দুই শিশুকে বুকে জড়িয়ে বিলাপ করছেন। তিনি অন্তঃসত্ত্বা। তৃতীয় সন্তানের অপেক্ষায়। কিন্তু ১২ দিন ধরে নেই স্বামীর কোনো খোঁজ।

“সে বেঁচে আছে, না সাগরে ডুবে গেছে। আমি জানি না, আমি বাচ্চাদের নিয়ে কীভাবে জীবন কাটাবো,” বলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি।

শুধু ইসমত বা আয়েশা নন, কক্সবাজার উপকূলের শতাধিক পরিবার এখন একই দুঃসহ অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছে। কেউ থানায় ছুটছেন, কেউ জনপ্রতিনিধির কাছে। কিন্তু উত্তর মেলে না, প্রিয়জনেরা কোথায়?

‘তানজিনা সুলতানা’ ট্রলারের ট্র্যাজেডি:

বেঁচে ফেরা ৯ জনের বর্ণনায় উঠে এসেছে সেই বিভীষিকাময় যাত্রার গল্প। গত ৪ এপ্রিল উখিয়ার ইনানী, টেকনাফের নোয়াখালী ও রাজারছড়া থেকে ছোট নৌকায় করে শত শত মানুষকে একটি বড়ো ট্রলারে তোলা হয়। ট্রলারটির নাম ‘তানজিনা সুলতানা’। নারী, শিশু, রোহিঙ্গা শরণার্থীসহ প্রায় ২৫০ থেকে ২৮০ জন মানুষ গাদাগাদি করে উঠেছিলেন তাতে। সবার গন্তব্য মালয়েশিয়া। কিন্তু ছয় দিনের মাথায় ৯ এপ্রিল আন্দামান সাগরে পৌঁছালে বৈরী আবহাওয়ার কবলে পড়ে ট্রলারটি ডুবে যায়।

বেঁচে ফেরা রোহিঙ্গা যুবক রফিকুল ইসলাম নিশ্চিত করেন, “সাগরে ভাসতে দেখে বাণিজ্যিক একটি জাহাজ তাদের উদ্ধার করে ১৩ এপ্রিল বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের কাছে হস্তান্তর করেন।

তার ভাষ্য, ট্রলারে অনেক মানুষ ছিল। দাঁড়ানোর জায়গাও ছিল না। ঝড়ের আঘাতে হঠাৎ ট্রলারটা ডুবে গেল। আমরা সাগরে ভেসে ছিলাম।”

বেঁচে ফেরা আরেকজন রোহিঙ্গা যুবক ইমরান। তিনি দুঃখ প্রকাশ করে বলছিলেন, “ক্যাম্পের জীবন থেকে মুক্তি পেতে চেয়েছিলাম। কিন্তু এই যাত্রা দুঃস্বপ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। ট্রলার ডুবে যাওয়ার মুহূর্ত মনে পড়তে আঁতকে উঠি।”

মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসা ৯ জন:

বাংলাদেশ কোস্টগার্ড মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সাব্বির আলম সুজন নিশ্চিত করেছেন, গত ৯ এপ্রিল আন্দামান সাগরে ভাসমান অবস্থায় ৯ জনকে উদ্ধার করা হয়। বাংলাদেশ অভিমুখী একটি বাণিজ্যিক জাহাজ তাদের দেখতে পেয়ে উদ্ধার করে ১৩ এপ্রিল কোস্টগার্ডের কাছে হস্তান্তর করে। উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ছয়জন বাংলাদেশি ও তিনজন রোহিঙ্গা।

স্থানীয় প্রশাসনের আশঙ্কা, ওই ট্রলারে থাকা মানুষের সঠিক সংখ্যা বা নামের তালিকা কারোর কাছে নেই। তাই নিখোঁজের সংখ্যা নিয়েই এখন আতঙ্ক সবচেয়ে বেশি। কারণ, ট্রলারটিতে থাকা যাত্রীদের বড়ো একটি অংশ হয়ত আর কখনো ফিরবে না। এমন আশঙ্কা করছেন স্বজনেরা।

মানবপাচারের অদৃশ্য জাল:

ভুক্তভোগীদের পরিবারের দেওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে জানা গেছে, এই ঘটনার পেছনে সক্রিয় একটি শক্তিশালী মানবপাচার চক্রের হাত রয়েছে। ভুক্তভোগীদের পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ, শাকের মাঝি, হায়দার আলী, আব্দুল আমিন, সৈয়দ উল্লাহ, মো. ইব্রাহীম, আজিজুল হক, মোস্তাক আহমদ, নুরুল কবির বাদশা, মোহাম্মদ উল্লাহ ও মোজাহের মিয়াসহ বেশ কয়েকজন দালাল দীর্ঘদিন ধরে এই ব্যাবসার সঙ্গে জড়িত।

রোহিঙ্গা শরণার্থী রফিকসহ স্থানীয় সূত্রগুলো বলছে, শহর ও সীমান্ত এলাকার আরও বহু ব্যক্তি এই চক্রে সক্রিয়। উখিয়া, টেকনাফের অন্তত সাতটি রুট দিয়ে নিয়মিত মানুষ পাচার করা হয়।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঘটনার পর বেশির ভাগ দালাল আত্মগোপনে রয়েছে। আর স্থানীয় প্রশাসনের তাদের ধরার কার্যক্রম লক্ষণীয় নয়।

প্রশাসনের বক্তব্য:

টেকনাফ মডেল থানার ওসি সাইফুল ইসলাম দাবি করেছেন, জড়িতদের গ্রেফতারে অভিযান চলছে। কারণ, এই ট্রলারডুবির ঘটনায় ভুক্তভোগীর পক্ষে মানবপাচার প্রতিরোধ আইনে মামলা হয়েছে।

এদিকে, সরকারের পক্ষ থেকেও বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে দাবি করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ। এছাড়া গত মঙ্গলবার টেকনাফে এক অনুষ্ঠানে মানবপাচারকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন তিনি।

আন্তর্জাতিক উদ্বেগ:

এদিকে জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা UNHCR এবং আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা IOM এক যৌথ বিবৃতিতে জানিয়েছে, এই নৌকাডুবিতে নারী-শিশুসহ অন্তত ২৫০ জন নিখোঁজ হয়েছেন।

তাদের মতে, এটি শুধু একটি দুর্ঘটনা নয়, বরং রোহিঙ্গাদের দীর্ঘস্থায়ী বাস্তুচ্যুতি, ক্যাম্পে সীমিত সুযোগ এবং নিরাপদ প্রত্যাবাসনের অনিশ্চয়তার ভয়াবহ প্রতিফলন।

বিবৃতিতে বলা হয়, উন্নত জীবনের প্রলোভন, ভুল তথ্য এবং হতাশা। এই তিনের ফাঁদেই মানুষ এমন ঝুঁকিপূর্ণ সমুদ্রপথ বেছে নিচ্ছে।

উৎসবের দেশে শোকের ছায়া:

বাংলাদেশ যখন নববর্ষের উৎসবে মুখর, তখন কক্সবাজার উপকূলে অন্য এক বাস্তবতা। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কক্সবাজার পৌরসভার সমিতা পাড়ার মো. ইব্রাহিম ৪ এপ্রিল ট্রলারে ওঠার আগে বড় ভাইয়ের কাছে ফোনে দোয়া চেয়েছিলেন। তারপর থেকে নিখোঁজ। একই এলাকার হারুন, নূর, শফির পরিবারও অপেক্ষায়। কবে ফিরবে তাদের প্রিয়জন।

উখিয়া–টেকনাফের অনেক স্কুলপড়ুয়া শিক্ষার্থীও নিখোঁজ বলে দাবি পরিবারের। তারা সবাই শেষবার জানিয়েছিল, মালয়েশিয়া যাচ্ছে। কেউ পরিবারের সম্মতিতে। আবার কেউ অমতে বা গোপনে।

একটি খবরের অপেক্ষা শত পরিবারের:

লেঙ্গুরবিল গ্রামের আয়েশা বেগম দিনের বেশিরভাগ সময় শূন্যতার দিকে তাকান। ভাবেন, হয়ত কোনো ফোন আসবে। অথবা কোনো খবর। “একটা খবর দিলেও হতো। সে বেঁচে আছে কি না।” বলতে বলতেই মঙ্গলবারের বিকেলে বারবার ভেঙে পড়ছিলেন তিনি।

কক্সবাজার উপকূলে এখন প্রতিটি বাড়ি যেন একটি করে অপেক্ষার ঘর। কেউ কেউ এখনো আশা ছাড়েনি। কেউ হয়ত মনে মনে বুঝে গেছেন, প্রিয়জনের ফেরার আর সম্ভাবনা নেই।

সামাজিক সংগঠকদের ক্ষোভ ও দাবি:

সামাজিক সংগঠন কক্সবাজার সিভিল সোসাইটির সভাপতি আবু মোর্শেদ চৌধুরী খোকা দুঃখ প্রকাশ করে বলছিলেন, “আন্দামান সাগরের ঢেউগুলো শুধু একটি ট্রলার নয়। গিলে নিয়েছে শত শত মানুষের স্বপ্ন, পরিবারের ভবিষ্যৎ আর পেছনে রেখে গেছে অপেক্ষা, কান্না আর এক গভীর নীরবতা।”

‘আমরা কক্সবাজারবাসী’ এর সাধারণ সম্পাদক নাজিম উদ্দীন ক্ষোভ জানিয়ে বলছিলেন, “কক্সবাজার উপকূল থেকে সমুদ্রপথে মালয়েশিয়ার উপকূলের দূরত্ব প্রায় ২,০০০ থেকে ২,৫০০ কিলোমিটার। শীত মৌসুমের শান্ত সাগরে যা অনায়াসে পাড়ি দেবার যাবতীয় ব্যবস্থা করেন দালালচক্র। এটি প্রকাশ্যে ঘটে। কিন্তু, আমাদের প্রশাসন মানবপাচার কার্যক্রম প্রতিরোধ করতে পুরোপুরি ব্যর্থ। তারা কেবল ঘটনার পরে দায়সারা দায়িত্ব পালনে সচেষ্ট। এতে কোন প্রাণ রক্ষা পায় না।”

কক্সবাজার নাগরিক আন্দোলনের সদস্য সচিব এইচ. এম. নজরুল ইসলামের দাবি, “মানবপাচার ঠেকাতে দীর্ঘমেয়াদি কার্যক্রমে রাষ্ট্রকে নিয়োজিত হতে হবে। সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। প্রয়োজনে টাস্কফোর্স গঠন করতে হবে তার দাবি, যে-কোনো মূল্যে এ সলিলসমাধি বন্ধ করতে হবে।”

বিজ্ঞাপন

চাকরি দেবে অ্যাকশনএইড
১৬ এপ্রিল ২০২৬ ১০:০৫

আরো

সম্পর্কিত খবর