সিলেট: আটলান্টিকের ওপারে বরফশুভ্র দেশ কানাডায় এবার রচিত হলো লাল-সবুজের এক অনন্য মহাকাব্য। সকল জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে কানাডার ফেডারেল উপ-নির্বাচনে টরন্টোর ‘স্কারবোরো সাউথওয়েস্ট’ আসন থেকে সংসদ সদস্য (এমপি) নির্বাচিত হয়ে ইতিহাস গড়েছেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ডলি বেগম।
মৌলভীবাজারের মনু নদীর পাড় থেকে উঠে আসা এই অদম্য নারীর সাফল্যে এখন উচ্ছ্বসিত বিশ্বের আনাচে-কানাচে থাকা কোটি প্রবাসী বাংলাদেশি।
বিশ্লেষকদের মতে, ডলি বেগমের এই জয় কেবল একটি ব্যক্তিগত সাফল্য নয়, বরং কানাডার জাতীয় রাজনীতিতে এক মহাগুরুত্বপূর্ণ মোড়। প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নির নেতৃত্বাধীন লিবারেল পার্টির জন্য এই আসনটি ছিল অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই। ডলি বেগমের এই বিশাল বিজয়ের মধ্য দিয়ে লিবারেল পার্টি দেশটির হাউজ অব কমন্সে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে, যা বর্তমান সরকারকে শক্তিশালী অবস্থানে নিয়ে গেছে।
মৌলভীবাজার জেলার মনুমুখ ইউনিয়নের বাজরাকোনা গ্রামের সাধারণ এক পরিবারে জন্ম নেওয়া ডলি বেগমের শৈশব কেটেছে মনু নদের হাওয়ায়। মাত্র ১২ বছর বয়সে পরিবারের সাথে ভাগ্যান্বেষণে পাড়ি জমান কানাডায়।

কানাডায় নিরাপদ সড়ক চাই অভিষেক অনুষ্ঠানে ডলি বেগম।
সেখানে টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতক শেষ করে লন্ডনের ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডন (ইউসিএল) থেকে উন্নয়ন প্রশাসন ও পরিকল্পনায় স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি এনালিস্ট হিসেবে কাজ করেছেন দ্য সোসাইটি অব এনার্জি প্রফেশনালসে। বিভিন্ন সামাজিক সংঘটনের পাশাপাশি তিনি নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন দীর্ঘদিন থেকে।
নতুন দেশে থিতু হওয়া থেকে শুরু করে রাজনীতির শীর্ষ শিখরে পৌঁছানোর পথটি মোটেও মসৃণ ছিল না। তবে অদম্য ইচ্ছাশক্তি আর শিক্ষার আলো তাকে পথ দেখিয়েছে। তিনি ইউনিভার্সিটি অফ টরন্টো থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতক এবং বিশ্বখ্যাত ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডন থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।
ডলি বেগমের এই বিজয় প্রমাণ করে যে, সুযোগ পেলে এবং মেধা থাকলে গ্রামের মাটি থেকেও বিশ্বমঞ্চের নেতৃত্ব দেওয়া সম্ভব। তিনি প্রবাসে বেড়ে ওঠা নতুন প্রজন্মের কাছে এখন এক জীবন্ত কিংবদন্তি। তার এই অর্জন কানাডার মতো বহুসাংস্কৃতিক সমাজে অভিবাসীদের প্রতিনিধিত্ব ও অংশগ্রহণের গুরুত্বকে নতুন এক উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
ডলি বেগমের এই অনন্য সাফল্যে আজ গর্বিত পুরো বাংলাদেশ। বিশেষ করে সিলেটের গণমানুষের কাছে তিনি এখন এক প্রেরণার নাম। তার এই জয় প্রমাণ করেছে, স্বপ্ন যখন পাহাড়সম আর পরিশ্রম যখন আকাশচুম্বী হয়, তখন সফলতা ধরা দিতে বাধ্য। ডলি বেগমের এই বীরত্বগাথা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সাহস, আত্মবিশ্বাস এবং বিশ্বমঞ্চে স্বপ্ন দেখার নতুন শক্তি জোগাবে—এমনটাই প্রত্যাশা সবার।
বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত কানাডার নাগরিক ডলি বেগম এমপি নির্বাচিত হওয়ার পূর্বে গত বছর দেশটির অন্টারিও প্রাদেশিক পার্লামেন্টের নির্বাচনে এমপিপি পদে তৃতীয়বারের মতো বিজয়ী হয়েছিলেন। তখন তিনি টরন্টোর স্কারবরো সাউথওয়েস্ট নির্বাচনি আসন থেকে নিউ ডেমোক্রেটিক পার্টির (এনডিপি) প্রার্থী হিসেবে জয়ী হন।
এর আগে, ডলি বেগম ২০১৮ সালের প্রাদেশিক নির্বাচনে প্রথম এবং ২০২২ সালে দ্বিতীয়বার নির্বাচিত হয়েছিলেন। কানাডার তিন স্তরের সরকার পদ্ধতির কোনো আইন পরিষদে তিনিই প্রথম বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত নিউ ডেমোক্র্যাট।
ডলি বেগমের চাচা আব্দুস শহীদ সারাবাংলাকে জানান, পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি বাবা রাজা মিয়া ২০০১ সালে এক সড়ক দুর্ঘটনায় দীর্ঘদিন বিছানায় থাকার কারণে পারিবারিকভাবে অনেক কঠিন সময় অতিক্রম করতে হয়েছে ডলি বেগমের। সে সময় একমাত্র ছোট ভাই মহসিন মিয়াকে নিয়ে হিমসিম খেতে হয়েছে ডলি বেগমের। ডলি বেগমের বিজয়ে আজ পুরো সিলেটবাসী গর্বিত। ডলি বেগম সিলেটের অহংকার।
মনুরমুখ ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান শাহ ইমরান সাজু সারাবাংলাকে জানিয়েছেন, আমার ইউনিয়নের একটি মেয়ে কানাডা জয় করেছে তা আমাদের সিলেট তথা পুরো দেশের জন্য গর্বের। আমরা ইউনিয়নবাসী খুবই আনন্দিত। ডলি বেগমের বিজয়ে জন্মস্থান মনুপাড়ে আনন্দের জোয়ার বইছে।