এক সময় দূর দেশে পাড়ি জমাতে মাসের পর মাস জাহাজের ডেকের ওপর কাটাতে হতো। এরপর জুল ভার্নের কল্পবিজ্ঞান আর রাইট ভ্রাতৃদ্বয়ের হাত ধরে আকাশে ডানা মেলল উড়োজাহাজ। সময়কে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে নিমেষেই এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে পৌঁছে যাওয়া এখন হাতের মোয়া। তবে এই গতির আনন্দ উপভোগ করতে গিয়ে অনেকের পকেটই গড়ের মাঠ হয়ে যায়। কিন্তু একটু বুদ্ধি খাটালেই আকাশপথের এই খরচ অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব।
আসুন জেনে নেই, বাজেট-বান্ধব বিমান টিকিট বুকিংয়ের কিছু উপায়…
‘আগে আসলে আগে পাবেন’ নীতি
টিকিট কাটার ক্ষেত্রে যত বেশি সময় হাতে রাখবেন, তত কম খরচে বুকিং করতে পারবেন। আন্তর্জাতিক তো বটেই, অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটের ক্ষেত্রেও এই নিয়ম খাটে। অন্তত দুই মাস বা ৬০ দিন আগে টিকিট কেটে রাখলে শেষ মুহূর্তের তুলনায় প্রায় ৪০ থেকে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত টাকা বাঁচানো সম্ভব।
ট্রাভেল এজেন্টের মধ্যস্থতা বাদ দিন
মাঝখানের দালাল বা ট্রাভেল এজেন্সির ওপর নির্ভর না করে নিজেই টিকিটের খোঁজ নিন। অনেক সময় এই এজেন্সিগুলোর নির্দিষ্ট কিছু বিমান সংস্থার সাথে চুক্তি থাকে, যার ফলে নিজস্ব কমিশন ও লাভের জন্য তারা আপনাকে বেশি দামের টিকিট গছিয়ে দিতে পারে।
স্মার্ট বুকিং অ্যাপের দুনিয়া
টিকিট কাটার আগে বিভিন্ন অনলাইন পোর্টাল ও অ্যাপের সাহায্য নিন। মেকমাইট্রিপ, এক্সপিডিয়া বা বুকিং ডট কমের মতো প্ল্যাটফর্মগুলো প্রায়ই দারুণ সব ছাড় দেয়। তবে বর্তমান সময়ে সবচেয়ে কাজের অ্যাপ হলো ‘স্কাইস্ক্যানার’ (Skyscanner)। এটি একই সাথে বিভিন্ন সাইটের দাম তুলনা করে সবচেয়ে সস্তা টিকিটটি আপনার সামনে এনে দেয় এবং দাম কমলে নোটিফিকেশনের মাধ্যমে অ্যালার্ট পাঠায়।
ইনকগনিটো মোডের ম্যাজিক
টিকিট খোঁজার সময় ব্রাউজারের প্রাইভেট বা ইনকগনিটো (Incognito) মোড অন করে নিন। সাধারণ মোডে সার্চ করলে ব্রাউজারের ‘কুকিজ’ আপনার খোঁজার ইতিহাস ট্র্যাক করে ফেলে। বিমান সংস্থাগুলো যখন দেখে আপনি একই রুটের টিকিট বারবার খুঁজছেন, তখন তারা কৃত্রিমভাবে টিকিটের দাম বাড়িয়ে দেয়।
আইপি অ্যাড্রেস লুকিয়ে রাখা (ভিপিএন)
শুধু প্রাইভেট ব্রাউজিংই শেষ কথা নয়, বিমান সংস্থাগুলো আপনার ডিভাইসের আইপি অ্যাড্রেসও ট্র্যাক করতে পারে। তাই একটি ভালো ভিপিএন (VPN) ব্যবহার করে নিজের অবস্থান ও আইপি লুকিয়ে টিকিট সার্চ করুন। এতে করে টিকিট আরও কম দামে পাওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে।
ছুটির দিনের ট্রাভেল এড়িয়ে চলুন
সপ্তাহান্তের দিনগুলোতে (যেমন বাংলাদেশে বৃহস্পতি থেকে শনি, আর বিদেশে শনি ও রবিবার) মানুষের ভ্রমণের চাপ বেশি থাকে। স্বাভাবিকভাবেই এ সময় টিকিটের চাহিদার সাথে দামও আকাশচুম্বী হয়। তাই ছুটির দিনের ঠিক আগের বা পরের ফ্লাইটগুলো এড়িয়ে চলাই বুদ্ধিমানের কাজ।
সপ্তাহের মাঝামাঝি দিনগুলোর ফায়দা নিন
সপ্তাহের কর্মব্যস্ত দিনগুলোতে, বিশেষ করে সোম থেকে বৃহস্পতিবারের টিকিট কিছুটা সস্তা হয়। বৈশ্বিক এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, সাধারণত মঙ্গলবার বিমান সংস্থাগুলো সবচেয়ে কম মূল্যে টিকিট অফার করে। মঙ্গলবারের টিকিট কাটলে অন্যান্য দিনের তুলনায় প্রায় ১০% খরচ বাঁচানো যায়।
সময় নির্বাচনের চতুরতা
টিকিট কাটার সময় কোন বেলার ফ্লাইট ধরছেন তা গুরুত্বপূর্ণ। এশিয়ার রুটগুলোতে সাধারণত ভোরের বা সকালের দিকের ফ্লাইটের দাম কম থাকে। অন্যদিকে, পশ্চিমা দেশগুলোতে সন্ধ্যার বা রাতের ফ্লাইটের দরদামে তারতম্য হয় বলে সেখানে রাতের টিকিট সস্তায় মেলার সম্ভাবনা বেশি।
সরাসরি বিমান সংস্থার দ্বারস্থ হওয়া
মাঝেমধ্যে থার্ড-পার্টি অ্যাপের চেয়ে সরাসরি কোনো নির্দিষ্ট এয়ারলাইন্সের অফিশিয়াল ওয়েবসাইট, ইমেইল বা কাস্টমার কেয়ারের মাধ্যমে টিকিট কাটলে ভালো ডিসকাউন্ট পাওয়া যায়। যদিও সব এয়ারলাইন্সের সাথে আলাদাভাবে যোগাযোগ করা কিছুটা সময়সাপেক্ষ, তাও চেষ্টা করে দেখতে পারেন।
প্রমোশনাল অফার ও লাস্ট-মিনিট ডিল
বিভিন্ন এয়ারলাইন্সের নিউজলেটার বা প্রমোশনাল মেইল সাবস্ক্রাইব করে রাখুন। অনেক সময় যাত্রার ঠিক দু-একদিন আগে কিছু সিট অবিক্রীত থেকে যায়। তখন বিমান সংস্থাগুলো লোকসান এড়াতে একদম শেষ মুহূর্তে পানির দরে সেই টিকিটগুলো বিক্রি করে দেয়। এই সুযোগটি লুফে নিতে পারেন।
অফ-পিক সিজনে ভ্রমণের পরিকল্পনা
ঈদ, পূজা, বড়দিন বা গ্রীষ্মকালীন ছুটির মতো উৎসবের দিনগুলোতে ভ্রমণের চাহিদা থাকে তুঙ্গে, তাই টিকিটের দামও থাকে কয়েক গুণ বেশি। খুব বেশি জরুরি না হলে এই ‘পিক সিজন’গুলো এড়িয়ে অফ-পিক বা অফ-সিজনে ভ্রমণের ছক সাজান।
রিটার্ন বনাম ওয়ান-ওয়ে টিকিট এবং ট্রানজিট পলিসি
অনেকে মনে করেন রাউন্ড ট্রিপ বা আসা-যাওয়ার টিকিট একসাথে কাটলে সস্তা হয়, তবে সব সময় তা সত্যি নয়। কখনো কখনো আলাদাভাবে দুটি ওয়ান-ওয়ে টিকিট কাটলে খরচ কম পড়ে। এছাড়া কানেক্টিং বা ট্রানজিট ফ্লাইটের ক্ষেত্রে পুরো যাত্রাপথ যেন একই এয়ারলাইন্সের হয়, সেদিকে খেয়াল রাখুন। আলাদা আলাদা কোম্পানির টিকিট কাটলে উল্টো খরচ বেড়ে যেতে পারে।
টিকিট কেনার আগে একটি জরুরি সতর্কতা
কম দামে টিকিট দেখেই হুট করে পেমেন্ট করে বসবেন না। সস্তা টিকিট দেখানোর আড়ালে অনেক সময় ‘লুকানো চার্জ’ (Hidden Charges) থাকে। বুকিং করার আগে ভালো করে দেখে নিন টিকিটের মূল্যের সাথে ব্যাগেজের খরচ, দূরের যাত্রার খাবার ও অন্যান্য ট্যাক্স যুক্ত আছে কি না। অনেক সময় দেখা যায় সস্তা টিকিটে ব্যাগেজ এলাউন্স থাকে না, যা পরে আলাদা কিনতে গিয়ে মূল টিকিটের চেয়েও বেশি খরচ হয়ে যায়।
উল্লেখ্য, উড়োজাহাজ শুধু ধনকুবেরদের বিলাসবহুল বাহন, এই ধারণা এখন অতীত। উপরের এই ছোটখাটো কৌশলগুলো মেনে চললে আপনিও খুব সহজে এবং সাশ্রয়ী মূল্যে মেঘের রাজ্যে ডানা মেলতে পারবেন।