নিঝুম রাতে যখন পুরো পৃথিবী গভীর ঘুমে মগ্ন থাকে, তখন কিছু পরম সৌভাগ্যবান মানুষ বিছানার আরাম ত্যাগ করে মহান স্রষ্টার সমীপে এসে দাঁড়ায়। তারা অবনত মস্তকে সিজদায় লুটিয়ে পড়ে, অশ্রুসিক্ত চোখে রবের কাছে নিজেদের গুনাহের ক্ষমা চায়, রহমত ও সঠিক পথের দিশা খোঁজে।
রাতের শেষ প্রহরের এই ইবাদতকে মহান আল্লাহ তাআলা এক অনন্য ও বিশেষ মর্যাদায় ভূষিত করেছেন। এটি সৎকর্মশীল বান্দাদের একটি অন্যতম প্রধান লক্ষণ এবং আল্লাহর সান্নিধ্য অর্জনের সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম।
কোরআনের আলোয় রাতের ইবাদতকারী
পবিত্র কোরআনে মুমিনদের গুণাবলি বর্ণনা করতে গিয়ে মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন:
‘কেবল তারাই আমার আয়াতসমূহের ওপর ঈমান আনে, যাদেরকে উপদেশ দেওয়া হলে তারা সিজদায় লুটিয়ে পড়ে এবং অহংকার বর্জন করে তাদের প্রতিপালকের তাসবিহ ও প্রশংসা গান করে। তারা শয্যা ত্যাগ করে ভয় ও আশা নিয়ে তাদের প্রতিপালককে ডাকে এবং আমি তাদেরকে যে জীবিকা দিয়েছি, তা থেকে তারা ব্যয় করে।’ (সূরা সাজদাহ, আয়াত: ১৫-১৬)
আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের আরেকটি অনন্য গুণের কথা উল্লেখ করে অন্য আয়াতে বলা হয়েছে…
‘তারা রাতের খুব সামান্য অংশই ঘুমে অতিবাহিত করত এবং রাতের শেষ প্রহরে আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা (ইস্তিগফার) করত।’ (সূরা যারিয়াত, আয়াত: ১৭-১৮)
এই আয়াতগুলো স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, শেষ রাতে জাগ্রত হয়ে ইবাদত ও ক্ষমা চাওয়া আল্লাহর খাঁটি বান্দাদের চিরন্তন বৈশিষ্ট্য। এই আত্মিক সৌভাগ্য অর্জন করা মানুষের মর্যাদা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। এজন্যই মহান আল্লাহ তার প্রিয় রাসূল (সা.)-কে লক্ষ্য করে বলেছেন:
‘আর রাতের কিছু অংশে তাহাজ্জুদ পড়ো, এটি তোমার জন্য অতিরিক্ত কর্তব্য। আশা করা যায়, তোমার প্রতিপালক তোমাকে ‘মাকামে মাহমুদ’ বা প্রশংসিত স্থানে অধিষ্ঠিত করবেন।’ (সূরা বনি ইসরাঈল, আয়াত: ৭৯)
শেষ রাতের মহিমান্বিত সুসংবাদ
আমাদের প্রিয় নবী (সা.) শেষ রাতের এই বিশেষ আমলের প্রতি উম্মতদের অত্যন্ত তাগিদ দিয়েছেন। হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
‘আমাদের মহান প্রতিপালক প্রতি রাতের শেষ তৃতীয়াংশে দুনিয়ার আকাশে নেমে আসেন এবং ঘোষণা করতে থাকেন, কে আছ, যে আমাকে ডাকবে? আমি তার ডাকে সাড়া দেব। কে আছ, যে আমার কাছে কিছু চাইবে? আমি তাকে তা দান করব। কে আছ, যে আমার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করবে? আমি তাকে ক্ষমা করে দেব।’ (সহীহ বুখারী, হাদিস: ১১৪৫)
সাহাবায়ে কেরাম এবং পূর্বসূরি নেককার পীর-মাশায়েখদের জীবনে তাহাজ্জুদের গুরুত্ব ছিল অপরিসীম। তারা রাতের শেষ প্রহরটিকে নিজেদের আত্মশুদ্ধি, তাওবা, জিকির ও কান্নাকাটির জন্য উৎসর্গ করতেন। কারণ তারা জানতেন, এই নীরব মুহূর্তের একটি সিজদা কিংবা চোখ থেকে ঝরে পড়া এক ফোঁটা অশ্রু মানুষের পুরো জীবনকে বদলে দিতে পারে।
তাই শেষ রাতের ইবাদত কেবল সাধারণ কোনো নফল আমল নয়; বরং এটি আল্লাহর ভালোবাসা লাভ, গুনাহ খাতা থেকে মুক্তি, দোয়া কবুলের মহাসুযোগ এবং অন্তরের অনাবিল প্রশান্তি অর্জনের এক পরম মাধ্যম। যারা ঘুমের মোহ কাটিয়ে শেষ রাতে আল্লাহর দরবারে হাজিরা দিতে পারেন, তারাই জগতের সবচেয়ে বড় সৌভাগ্যবান। তাদের জন্যই রয়েছে আল্লাহর বিশেষ রহমত ও ক্ষমার সুসংবাদ।