ঢাকাই চলচ্চিত্রের ইতিহাস পর্যালোচনায় নব্বইয়ের দশকের বিনোদন জগত ও পর্দা কাঁপানো চলচ্চিত্রের প্রসঙ্গে খলচরিত্রের জনপ্রিয় অভিনেতা আশরাফুল হক ডনের নাম বিশেষভাবে উঠে আসে। সম্প্রতি চিত্রনায়ক সালমান শাহ হত্যা মামলায় গ্রেফতারের পর বিনোদন অঙ্গনে নতুন করে ব্যাপক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছেন এই অভিনেতা।
১৯৭১ সালে বগুড়ার এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্ম নেওয়া ডন ছিলেন তার বাবা-মায়ের দশ ভাই-বোনের মধ্যে সবার ছোট। শৈশবেই পিতৃহারা হওয়ার পর তার মা বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন। রূপালী জগতের জমকালো আলোর ছটায় আসার আগে তরুণ বয়সে ডনের জীবনযাত্রা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্নধর্মী এবং আধ্যাত্মিক আবহে ঢাকা। চলচ্চিত্র অঙ্গনে পা রাখার পূর্বে তিনি স্থানীয় একটি মসজিদে নিয়মিত নিষ্ঠার সঙ্গে আজান দিতেন এবং মুয়াজ্জিনের দায়িত্ব পালন করতেন। পরবর্তীতে বগুড়া থেকে রাজধানী ঢাকায় আগমন করার পর খ্যাতিমান চলচ্চিত্র নির্মাতা সোহানুর রহমান সোহানের সঙ্গে তার পরিচয় ঘটে, যা তার জীবনের মোড় সম্পূর্ণরূপে ঘুরিয়ে দেয়। সোহানুর রহমান সোহানের হাত ধরেই চলচ্চিত্রে আত্মপ্রকাশের প্রথম সুযোগ পান ডন এবং তার পরিচালনায় ‘লাভ’ চলচ্চিত্রে প্রথম অভিনয় করেন।
তবে তার অভিনীত প্রথম মুক্তিপ্রাপ্ত চলচ্চিত্র ছিল নব্বইয়ের দশকের ইতিহাস সৃষ্টিকারী সিনেমা ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’। এই চলচ্চিত্রের দৃশ্যধারনের মাধ্যমেই পরিচয় ঘটেছিল সেসময়ের উদীয়মান পরাণপুরুষ সালমান শাহর সঙ্গে, যা পরবর্তীতে এক বিরল ও গাঢ় সামাজিক বন্ধুত্বে রূপান্তরিত হয়।
রুপালি জগতের বন্ধুত্বের সেই বন্ধন পরবর্তীতে ঢালিউডের ইতিহাসের এক চিরস্মরণীয় উপাখ্যান হয়ে দাঁড়ায়, যেখানে ডন ছিলেন সালমান শাহর সবচেয়ে নিকটতম এবং বিশ্বস্ত বন্ধুদের অন্যতম। প্রিয় বন্ধুকে নিয়ে কথা উঠলেই সবসময় পুরোনো দিনের নানা স্মৃতিচারণে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়তেন এই খলঅভিনেতা। রূপালী পর্দায় সালমান শাহ অভিনীত মোট ২৭টি চলচ্চিত্রের মধ্যে ২৪টিতেই খলনায়কের চরিত্রে অবতীর্ণ হয়ে দর্শকদের বিপুল প্রশংসা ও সাড়া কুড়ান ডন। নব্বইয়ের দশকে এই জুটির অভিনীত একের পর এক বাণিজ্যিক সফল চলচ্চিত্র বাংলা চলচ্চিত্রের দর্শকদের হৃদয়ে আলাদা স্থান করে নেয়, যার মধ্যে ‘এ জীবন তোমার আমার’, ‘বিক্ষোভ’, ‘ভালোবাসার মূল্য কত’, ‘তোমাকে চাই’, ‘ফুলের মতো বউ’, ‘বিয়ের ফুল’, ‘জীবন সংসার’, ‘ভালোবাসা কারে কয়’ এবং ‘মহামিলন’ অন্যতম। দীর্ঘ অভিনয় ক্যারিয়ারে প্রায় সাড়ে ৬০০ চলচ্চিত্রে অভিনয় করে বাংলা সিনেমা জগতে খল অভিনেতা হিসেবে নিজের একটি স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরি করেছেন ডন। শুধু বড় পর্দায় খলনায়কের অশুভ চরিত্রে সীমাবদ্ধ না থেকে ছোট পর্দার টেলিভিশন নাটক ও টেলিফিল্মেও নিজের সফল পদচারণা বজায় রেখেছিলেন তিনি। এমনকি কৌশিক হোসেন তাপস পরিচালিত জনপ্রিয় টেলিফিল্ম ‘কত ভালোবাসি তোমাকে’-তে চিত্রনায়িকা জনার বিপরীতে প্রধান নায়ক চরিত্রে অভিনয় করে নিজের বহুমুখী অভিনয় দক্ষতার পরিচয় দেন এই শিল্পী।
অভিনয় জীবনের পাশাপাশি বিনোদন জগতের নানা অঙ্গনে সক্রিয়ভাবে যুক্ত থেকে প্রযোজক হিসেবে ‘এক জনমের ভালোবাসা’ নামে একটি চলচ্চিত্র প্রযোজনা করেন ডন। এছাড়া সংগীতের প্রতি ভালোবাসার জায়গা থেকে গড়ে তোলেন ব্যান্ড দল ‘আর্কাইভ’ এবং বিভিন্ন সামাজিক ও কল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডে নিজের নিবেদিত উপস্থিতি বজায় রাখেন। একসময় বাংলাদেশ চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক সম্পাদকের মতো গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক দায়িত্বও সফলতার সঙ্গে পালন করেন তিনি। তবে রুপালি পর্দার বাস্তব জীবনের নাটকীয়তায় প্রিয় বন্ধুর অকাল মৃত্যুর দীর্ঘ সময় পর সেই বন্ধুত্বের সম্পর্ক এক জটিল আইনি মোড়ে এসে দাঁড়ায়।
রাজধানীর রমনা থানায় সালমান শাহর মামা মোহাম্মদ আলমগীর কর্তৃক দায়েরকৃত হত্যা মামলায় সালমান শাহর সাবেক স্ত্রী সামিরা হক ও খল অভিনেতা আশরাফুল হক ডনসহ মোট ১১ জনকে অভিযুক্ত করা হয়। পরবর্তীতে আদালতের নির্দেশনায় সিআইডি এই মামলার তদন্তভার গ্রহণ করে এবং গ্রেফতারের পর নতুন করে আশরাফুল হক ডনকে ঘিরে বিনোদন অঙ্গনে জোর চর্চা শুরু হয়। মসজিদের মুয়াজ্জিন থেকে চলচ্চিত্রের সফল খলনায়ক এবং পরবর্তীতে বিতর্কিত আইনি ঘটনার মুখোমুখি হওয়া ডনের জীবনপ্রবাহ যেন সিনেমার কাহিনিকেও হার মানায়।