বিশ্বসংগীত ও হলিউডের ইতিহাসে যে কজন নারী নিজেদের ফ্যাশন, কণ্ঠ আর ব্যক্তিত্ব দিয়ে বারবার নতুন করে সামনে আসেন, তাদের মধ্যে চেরিলিন সার্কিসিয়ান অন্যতম। সারা বিশ্বে যিনি কেবল ‘শের’ (Cher) নামে পরিচিত। এই বিশেষ মে মাসে তিনি জীবনের ৮০টি বসন্ত পূর্ণ করলেন। ১৯৪৬ সালের ২০ মে ক্যালিফোর্নিয়ার এল সেন্ট্রোতে এক আর্মেনিয়ান-আমেরিকান পরিবারে জন্ম নেওয়া এই অসামান্য নারী গত ছয় দশক ধরে পপ সংস্কৃতির অন্যতম শীর্ষ আইকন হিসেবে রাজত্ব করে আসছেন। সংগীত দুনিয়ায় তাকে ‘পপ সম্রাজ্ঞী’ (Goddess of Pop) হিসেবে অভিহিত করা হয়। ডানা ছাঁটা পাখির মতো নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে একক নারী হিসেবে বিনোদন দুনিয়ায় যে সাম্রাজ্য তিনি গড়েছেন, তা আজও নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের জন্য এক পরম অনুপ্রেরণা।
একাকীত্ব থেকে জনপ্রিয় হয়ে উঠার গল্প
শেরের শৈশবটা খুব একটা সহজ ছিল না। তার জন্মের মাত্র ১০ মাস পরই বাবা-মায়ের বিবাহবিচ্ছেদ ঘটে এবং এক পর্যায়ে আর্থিক সংকটের কারণে মা তাকে কিছুদিনের জন্য একটি অনাথ আশ্রমে রেখে আসতে বাধ্য হন। হাইস্কুলে পড়ার সময় শের নিজেকে খুব একটা আকর্ষণীয় বা প্রতিভাবান ভাবতেন না, তবে বিখ্যাত হওয়ার এক অদম্য ইচ্ছা ছিল তার মনে। এরপর ১৯৬২ সালে মাত্র ১৬ বছর বয়সে লস অ্যাঞ্জেলেসে তার আলাপ হয় পারফর্মার সনি বোনোর সাথে। এই পরিচয় তার জীবনের চাকা সম্পূর্ণ ঘুরিয়ে দেয়। সনি প্রথমে শেরকে একক শিল্পী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু প্রবল মঞ্চভীতির কারণে শের একা গাইতে অস্বীকৃতি জানান এবং সনিকে তার সাথে মঞ্চে থাকার অনুরোধ করেন। শের পরবর্তীতে এক সাক্ষাৎকারে বলেন, তিনি মূলত সনির চোখের দিকে তাকিয়ে পুরো দর্শকদের উদ্দেশ্যে গাইতেন এবং এভাবেই তার ভেতরের ভয় কেটে যায়।
বেল বটমস পোশাকে আলোড়ন জাগানিয়া
ষাট ও সত্তরের দশকে ‘সনি অ্যান্ড শের’ জুটি বিশ্বজুড়ে দারুণ আলোড়ন সৃষ্টি করে। বিশেষ করে ১৯৬৫ সালে বিখ্যাত রক ব্যান্ড ‘দ্য রোলিং স্টোনস’-এর পরামর্শে এই জুটি যখন ইংল্যান্ডে যায়, তখন তাদের অদ্ভুত ও ব্যতিক্রমী পোশাকের কারণে লন্ডনের হিলটন হোটেল থেকে তাদের বের করে দেওয়া হয়েছিল। এই ঘটনাই রাতারাতি তাদের আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের লাইমলাইটে নিয়ে আসে। তাদের পরা বেল বটমস প্যান্ট, স্ট্রাইপ শার্ট আর পশমি ভেস্ট বিশ্বজুড়ে তরুণ-তরুণীদের প্রধান ফ্যাশন ট্রেন্ডে পরিণত হয়। সে সময় অসংখ্য তরুণী শেরের মতো দেখতে হওয়ার জন্য নিজেদের চুল সোজা করে কালো রঙে রাঙাতে শুরু করে। এরপর ‘আই গট ইউ বেব’ গানের অভাবনীয় সাফল্য এই জুটিকে পপ সংগীতের শিখরে পৌঁছে দেয়। পরবর্তীতে সংগীতের পাশাপাশি টেলিভিশন শো-তেও এই জুটি দারুণ জনপ্রিয়তা পায়।
অস্কারের মঞ্চ জয়
সনি বোনোর সাথে দাম্পত্য ও পেশাদারি বিচ্ছেদের পর শেরের ক্যারিয়ারে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়। তিনি প্রমাণ করেন যে তিনি কারো ওপর নির্ভরশীল নন। আশির দশকে তিনি গান থেকে কিছুটা বিরতি নিয়ে পুরোদমে অভিনয়ে আত্মনিয়োগ করেন। ব্রডওয়ে থিয়েটার দিয়ে শুরু করে একে একে ‘সিল্কউড’ এবং ‘মুনস্ট্রাক’-এর মতো কালজয়ী চলচ্চিত্রে অভিনয় করে তিনি বিশ্বজুড়ে ব্যাপক প্রশংসা কুড়ান। ১৯৮৭ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত রোমান্টিক কমেডি সিনেমা ‘মুনস্ট্রাক’-এ অনবদ্য অভিনয়ের জন্য তিনি শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী হিসেবে একাডেমি পুরস্কার বা অস্কার জয় করেন। গায়িকা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর হলিউডের সর্বোচ্চ সম্মান ছিনিয়ে নেওয়া শেরের বহুমুখী প্রতিভার এক অনন্য প্রমাণ ছিল।
আশি বছরের চিরতরুণী ও বিলবোর্ডের রেকর্ড
সংগীত ইতিহাসে শের একমাত্র শিল্পী যিনি বিগত ছয় দশকের প্রতিটিতে (১৯৬০ থেকে ২০২০ দশক) বিলবোর্ড চার্টের এক নম্বর পজিশনে অন্তত একটি একক গান রাখার অনন্য রেকর্ড গড়েছেন। বিশেষ করে ১৯৯৮ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত তার ‘বিলিভ’ (Believe) গানটি বিশ্বজুড়ে রেকর্ড পরিমাণ বিক্রি হয় এবং ডিজিটাল অডিও-টিউন বা ‘শের ইফেক্ট’ প্রযুক্তির এক নতুন দুয়ার খুলে দেয়। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি সংগীতশিল্পী গ্রেগ অলম্যানকেও বিয়ে করেছিলেন এবং চাজ ও ইলাইজা ব্লু নামের দুই সন্তানের জননী তিনি। বর্তমানে জীবনের আশি বছরে পা দিয়েও শের তার চেয়ে বয়সে প্রায় ৪০ বছরের ছোট মিউজিক এক্সিকিউটিভ আলেকজান্ডার এডওয়ার্ডসের সাথে জমিয়ে প্রেম করছেন এবং গুঞ্জন রয়েছে যে এই বিশেষ জন্মদিনের পরপরই তারা বিয়ের পিঁড়িতে বসতে পারেন। বয়স যে কেবল একটি সংখ্যা মাত্র এবং মন ভালো থাকলে জীবনকে যেকোনো বয়সেই তারুণ্যে উদ্ভাসিত রাখা যায়, পপ সম্রাজ্ঞী শের যেন নিজের জীবন দিয়ে প্রতিনিয়ত সেটিই প্রমাণ করে চলেছেন।