Saturday 16 May 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

কতটা হতাশায় আছে অর্থনীতি?

ফরহাদ হোসেন তালুকদার
১৬ মে ২০২৬ ১৩:১৩

ঈদুল আযহা দরজার কড়া নাড়ছে। কোরবানিকে সামনে রেখে চলছে পশুরু হাটের প্রস্তুতি। কোথাও কোথাও কেনাবেচা শুরু হয়ে গেছে। খামারে খামারে বেড়েছে ব্যস্ততা। কৃষক তার পোষা গরু বা ছাগলকে শেষ মুহূর্তের যত্নআত্তি করছেন। বলা হয়ে থাকে, কোরবানিকেন্দ্রিক বিশ্বের সবচেয়ে বড় অর্থনীতি বাংলাদেশের। এক গবেষণা বলছে, কোরবানিকেন্দ্রিক অর্থনীতির আকার প্রায় ৫ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলারের। টাকার অংকে যা ৭০ হাজার কোটি টাকার বেশি (প্রতি ডলার ১২৩ টাকা হিসাব ধরে)।

পুরো অর্থনীতির বিবেচনায় এটি সামান্য একটি অংশ মাত্র। উন্নয়নের মহাসড়কে ভেসে চলা বাংলাদেশের অর্থনীতি যে ফুলানো বেলুন ছিল তা প্রমাণ হয়েছে জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের পর। অন্তরবর্তী সরকার খাদে পড়া ওই অর্থনীতিকে টেনে তুললেও গতি বাড়াতে প্রয়োজন যথাযথ সংস্কার। কিন্তু নতুন সংসদের প্রথম অধিবেশনে দেখা গেলো আকাঙ্খিত সংস্কার সহসাই হচ্ছে না। বরং গভর্নর নিয়োগ, ব্যংক লুটেরাদের আবারও ফিরে আসার সুযোগ দিয়ে আইনে পরিবর্তন, জনগণের মাঝে তৈরি করেছে এক ধরনের হতাশা।

বিজ্ঞাপন

এমন পরিস্থিতিতে অন্তরবর্তী সরকারের রেখে যাওয়া স্থিতিশীল অর্থনীতি আগামী দিনগুলোতে আরও খারাপ পরিস্থিতির মুখে পড়ার শঙ্কা দেখছে আন্তর্জাতিক ঋণমান সংস্থা ফিচ রেটিংস। যেখানে অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা, দুর্নীতি, সংস্কারের ঘাটতির পাশাপাশি আছে মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতের বড় প্রভাব। মার্কিন ও ব্রিটেন ভিত্তিক এই সংস্থাটি ১৩ মে তাদের নতুন প্রতিবেদনে, বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি ঋণমান বা রেটিংয়ের পূর্বাভাস (আউটলুক) স্থিতিশীল (Stable) থেকে পরিবর্তন করে নেতিবাচক (Negative) করেছে। তবে বাংলাদেশের ক্রেডিট রেটিং আগের মতোই বি প্লাস (B+) রাখা হয়েছে। অর্থাৎ বাংলাদেশের ঋণ পরিশোধ ক্ষমতা এখনও সবল আছে।

পূর্বাভাস কমানোর কারণ

বাংলাদেশের অর্থনীতির এই নেতিবাচক পূর্বাভাসের প্রধান কারণ হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতকে দায়ী করা হয়েছে। এছাড়া ফিচ মনে করে, দেশের নীতি কাঠামো, সরকারি অর্থায়ন এবং আর্থিক খাতের দুর্বলতাগুলো কাটিয়ে ওঠার জন্য প্রয়োজনীয় সংস্কারের অগ্রগতি খুবই সামান্য। পাশাপাশি দীর্ঘস্থায়ী দুর্বল সুশাসন দেশের যেকোনো বড় অর্থনৈতিক ধাক্কা সামলানোর ক্ষমতাকে দিন দিন কমিয়ে দিচ্ছে।

তবে রেটিং বি-প্লাস অব্যাহত রাখার কারণ হিসেবে বলা হয়, বাংলাদেশের সরকারি ঋণের পরিমাণ এখনো সহনীয় পর্যায়ে আছে। বিভিন্ন দাতা সংস্থা থেকে সহজ শর্তে বৈদেশিক ঋণ পাওয়ার সুযোগ আছে। যদিও এই ইতিবাচক দিকগুলোর বিপরীতে রয়েছে কিছু দুর্বলতা, যেমন-বৈদেশিক মুদ্রার স্বল্পতা, সমপর্যায়ের দেশগুলোর তুলনায় নিম্নমানের সুশাসন, ব্যাংকিং খাতের সমস্যা এবং অন্যান্য কাঠামোগত দুর্বলতা।

এই বিষয়গুলো নীচে বিস্তারিত আলোচনার চেষ্টা করবো। এতে ধারণা পাওয়া যাবে বাংলাদেশের অর্থনীতি আসলে এখন কোন পর্যায়ে আছে এবং আগামীতে কোথায় যেতে পারে। তার আগে জানিয়ে রাখি, আন্তর্জাতিক ক্রেডিট রেটিং এজেন্সি বা ঋণমান সংস্থাগুলোর পর্যবেক্ষণ বিদেশি বিনিয়োগকারীরা অনুসরণ করে থাকে। কোন দেশে তারা বিনিয়োগ করবে কিনা কিংবা বিনিয়োগ বাড়াবে না কমাবে সেই সিদ্ধান্তে এসব রিপোর্ট প্রভাব ফেলে।

মধ্যপ্রাচ্য সংঘাত

ফিচ বলছে, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য বড় ধরনের নেতিবাচক ঝুঁকি তৈরি করছে। সংস্থাটির মতে, জ্বালানি আমদানির ব্যয় বৃদ্ধি ও প্রবাসী আয় (রেমিট্যান্স) বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তীব্র হচ্ছে। বাংলাদেশের মোট রেমিট্যান্সের প্রায় অর্ধেকই আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে, যা ২০২৫ সালে দেশের মোট জিডিপির ৩.৫ শতাংশের সমান ছিল।

অবশ্য আশার দিক হলো, গেল ডিসেম্বর থেকেই বাংলাদেশের গড় রেমিট্যান্স আয় ৩ বিলিয়ন ডলারের ওপর আসছে। এমনকি মধ্যপ্রাচ্য সংঘাত শুরুর পর মার্চে ৩.৭৫ বিলিয়ন ডলারের রেকর্ড তৈরি হয়েছে। এপ্রিলেও এসেছে ৩.১২ বিলিয়ন ডলার। বুঝা যাচ্ছে এখনও মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতের প্রভাব এই রেমিট্যান্সে অতটা পড়েনি। সামনে কী হয় বলা যাচ্ছে না। রপ্তানির ধারাবাহিক পতনের মধ্যে এই রেমিট্যান্সই এখন অর্থনীতির জন্য ভরসা।

ফিচও বলছে, চলতি অর্থবছর শেষ পর্যন্ত শক্তিশালী প্রবাসী আয় বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার মজুতে কিছুটা সাময়িক স্বস্তি দিচ্ছে। তবে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত কতদিন স্থায়ী হবে, তা নিয়ে গভীর অনিশ্চয়তা আছে। এই দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তা বাংলাদেশের বাহ্যিক অর্থনীতির জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

সেই ঝুঁকির প্রতিফলন হলো জ্বালানি আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়া। মার্চে মধ্যপ্রাচ্য সংঘাত শুরুর পর চলতি অর্থবছরের জুলাই-মার্চ সময়ে জ্বালানি পণ্য আমদানি হয়েছে ৬.৩০ বিলিয়ন ডলার, যা গেল অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ৫৪ শতাংশ বেশি। জ্বালানি তেল আমদানির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভরশীলতার কথা তুলে ধরে ফিচ বলছে, অপরিশোধিত তেল ও পেট্রোলিয়াম পণ্য মিলিয়ে মোট আমদানির প্রায় ১৫ শতাংশ বা প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হয় এই অঞ্চলের জন্য।

রিজার্ভ নিয়ে স্বস্তি নেই

বাড়তি আমদানি ব্যয়ের ফলে ঝুঁকিতে পড়ে যাচ্ছে রিজার্ভ। সেই উদ্বেগের কথাও তুলে ধরেছে ফিচ। বলছে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও ডলারের বিনিময় হার নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সংস্থাটির তথ্যমতে, ২০২৬ সালের মার্চ মাস শেষে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ২৯ দশমিক ৫ বিলিয়ন। মাঝে কিছুটা বাড়লেও গত ১২ মে আবারও ২৯ বিলিয়ন ডলারে নেমে গেছে রিজার্ভ।

এই পরিমাণ রিজার্ভ দিয়ে মাত্র চার মাসের আমদানি ব্যয় মেটানো সম্ভব। তবে বি-প্লাস রেটিং পাওয়া সমপর্যায়ের দেশগুলোর গড় রিজার্ভের তুলনায় এটি কম। ফিচ বলছে, বর্তমানে ক্রলিং পেগ (এক ধরনের বিনিময় হার পদ্ধতি) এবং উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে বৈদেশিক ঋণের প্রবাহ অব্যাহত থাকায় রিজার্ভের ওপর চাপ কিছুটা কমেছে।

তবে এই স্বস্তি দীর্ঘস্থায়ী নাও হতে পারে বলে সতর্ক করেছে সংস্থাটি। ফিচ-এর মতে, যদি চলতি হিসাবের (Current Account) ঘাটতি আরও বেড়ে যায়, অভ্যন্তরীণ বাজারে ডলারের চাহিদা তীব্র হয় কিংবা আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ঋণের কিস্তি নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়, তবে দেশের মুদ্রা ও রিজার্ভের ওপর আবারও বড় ধরনের চাপ তৈরি হতে পারে।

বিশেষ করে আইএমএফের কর্মসূচি থেকে অর্থ পাওয়া বাধাগ্রস্ত হলে বা কমে গেলে বৈদেশিক অর্থায়নের প্রবাহ সংকুচিত হতে পারে, যা সরাসরি টাকার মানকে অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে। ওয়াশিংটনে বার্ষিক সাধারণ সভায় ঋণের কিস্তি নিয়ে কোন সিদ্ধান্তে পৌছাতে পারেনি আইএমএফ। ঢাকায় ফিরে এ বিষয়ে সুস্পষ্ট কোন বার্তাও দিতে পারেনি অর্থমন্ত্রী।

রাজস্ব আদায়ে বড় দুর্বলতা

জিডিপির তুলনায় রাজস্ব আদায়ের নিম্নহার বাংলাদেশের অর্থনীতির একটি দীর্ঘস্থায়ী কাঠামোগত দুর্বলতা হিসেবে রয়ে গেছে বলে মনে করে ফিচ। ২০২৪ অর্থবছরে জিডিপির বিপরীতে রাজস্ব আদায়ের হার ছিল ৮.৩ শতাংশ, যা ২০২৫ অর্থবছরে আরও কমে মাত্র ৭.৯ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। ফিচ তাদের পর্যবেক্ষণে বলেছে, মূলত তিনটি কারণে কাঙ্ক্ষিত হারে রাজস্ব আদায় হচ্ছে না। বড় অংকের কর ছাড়, অদক্ষ কর প্রশাসন ও সাধারণ মানুষের মধ্যে কর দেওয়ার ক্ষেত্রে অনীহা বা দুর্বল সংস্কৃতি।

সংস্থাটি সতর্ক করেছে যে, রাজস্ব আদায়ের এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত না হওয়া বা রাজস্বের বড় ঘাটতি শেষ পর্যন্ত সরকারের বাজেট ঘাটতিকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। ফিচ-এর পূর্বাভাস অনুযায়ী, এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে ২০২৭ সাল নাগাদ বাজেট ঘাটতি জিডিপির ৩.৬ শতাংশে পৌঁছাতে পারে।

ইতোমধ্যেই চলতি অর্থবছরের জুলাই-মার্চ সময়ে রাজস্ব আয়ে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ঘাটতি প্রায় ১ লাখ কোটি টাকা। এর মাঝেই সরকার ৯ লাখ কোাটি টাকার বিশাল এক বাজেট পরিকল্পনা করছে নতুন অর্থবছরের জন্য যেখানে ৩ লাখ কোটি টাকার উচ্চাভিলাষী উন্নয়ন কর্মসূচি অনুমোদন দেয়া হতে পারে চলতি মাসেই।

উচ্চ মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি

দেশে নিত্যপণ্যের সংকটের কারণে মূল্যস্ফীতির চাপ এখনও উচ্চপর্যায়ে আছে। ফিচের মতে, সম্প্রতি জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির ফলে এই চাপ আগামীতে আরও বাড়তে পারে। ২০২৬ সালের মার্চ মাসে সাধারণ মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমে ৮.৭১ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা ফেব্রুয়ারিতে ছিল ৯.১৩ শতাংশ। তবে মূল্যস্ফীতির এই হার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের চলতি অর্থবছরের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা ৬.৫ শতাংশ থেকে অনেক বেশি।

ফিচ বলছে, গত ১৯ এপ্রিল ২০২৬ থেকে সরকার কেরোসিন, ডিজেল, অকটেন, পেট্রল এবং তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) দাম বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে। এই সিদ্ধান্তের ফলে বাজারে নতুন করে দ্রব্যমূল্যের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি হবে। যার ফলে এপ্রিলে মূল্যস্ফীতি আবারও ৯ শতাংশে চলে এসেছে।

ভবিষ্যৎ পূর্বাভাসে ফিচ জানিয়েছে, আগামী অর্থবছরেও গড় মূল্যস্ফীতির হার চলতি অর্থবছরের মতো ৯ শতাংশে অপরিবর্তিত থাকতে পারে। মূলত নতুন করে মূল্যস্ফীতির চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কার কারণেই এই হার কমার সম্ভাবনা দেখছে না সংস্থাটি।

নাজুক ব্যাংকিং খাত

বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের সূচকগুলো এখনো অত্যন্ত নাজুক পর্যায়ে আছে। বিশেষ করে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানিয়েছে ফিচ রেটিংস। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে খেলাপি ঋণের হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩০ দশমিক ৬ শতাংশে, যার সিংহভাগই রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর দখলে।

ফিচ সতর্ক করেছে, বর্তমানে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ঋণ পরিশোধে যেসব নীতিগত ছাড় দিয়েছে সেগুলো তুলে নেওয়া হলে খেলাপি ঋণের পরিমাণ আরও বাড়তে পারে। যদি দেশে আর্থিক চাপ বা ঋণ সংকটের তীব্রতা বাড়ে, তবে এই বিশাল অংকের খেলাপি ঋণ সরকারের জন্য বড় ধরনের আর্থিক দায় তৈরি করবে বলে সংস্থাটি মনে করছে।

ফিচ বলছে, বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি নাটকীয়ভাবে কমে গেছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে প্রবৃদ্ধি কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৬ শতাংশে, যা মাত্র দুই বছর আগেও ছিল প্রায় ১০ শতাংশ। বেসরকারি খাতে ঋণের এই মন্থর গতি দেশের সামগ্রিক বিনিয়োগ কার্যক্রমের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে এবং বিনিয়োগ কমিয়ে দিচ্ছে বলে মনে করছে ফিচ।

সরকারি ঋণ সহনীয়

ফিচ রেটিংস বলছে, মধ্যমেয়াদে বাংলাদেশের সরকারি ঋণের পরিমাণ মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৩৮ শতাংশে স্থিতিশীল থাকতে পারে। সংস্থাটির মতে, এটি বি-প্লাস রেটিং পাওয়া সমপর্যায়ের দেশগুলোর গড় ঋণের তুলনায় অনেক কম। তবে এখানে সামান্য ফাঁক রয়েছে। যেহেতু ফিচ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর জন্য কাজ করে থাকে, তাই ওই সব সংস্থার ঋণ ব্যবসার জন্য এই পর্যবেক্ষণটি হয়তো কাজে দেবে।

কিন্তু বাস্তবতা হলো আগের দেড় দশকে যেভাবে মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপিকে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে দেখানো হয়েছে সেটার প্রকৃত হিসেব যদি করা হয়, তাহলে ফিচের উল্লেখিত জিডিপির অনুপাতে সরকারি ঋণ ৫০ শতাংশ ছাড়িয়ে যেতে পারে। যদিও এই ধরনের কোন কথা ফিচের রিপোর্টে নেই।

তবে ঋণের ইতিবাচক ধারার বিপরীতে কিছু ঝুঁকিও দেখছে ফিচ। সংস্থাটি সতর্ক করেছে যে, ব্যাংকিং খাতের সম্ভাব্য দায়বদ্ধতা, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর ঋণ এবং ক্রমবর্ধমান ঋণের খরচ ভবিষ্যতে সরকারি ঋণের ভারসাম্যের ক্ষেত্রে ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। দেশি এবং বিদেশি মিলিয়ে সরকারের এখন মোট ঋণের পরিমাণ ২০ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে।

রাজস্বের বড় অংশই যাচ্ছে সুদে

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সরকারের আয়ের তুলনায় সুদের ব্যয় আশঙ্কাজনক ভাবে বাড়ছে। ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ সুদ ও রাজস্বের অনুপাত ২৯ শতাংশে পৌঁছেছে। অর্থাৎ ১০০ টাকা রাজস্ব আয় হলে তার থেকে ২৯ টাকা ব্যয় হচ্ছে সুদ পরিশোধে। ফিচ বলছে, এই হার বি-প্লাস রেটিং পাওয়া দেশগুলোর গড় ১৪ শতাংশের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। এই উচ্চ সুদ ব্যয় দেশের রাজস্ব কাঠামোর ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে।

তবে বৈদেশিক ঋণের ক্ষেত্রে একটি ইতিবাচক দিকও তুলে ধরেছে সংস্থাটি। বাংলাদেশের সিংহভাগ বৈদেশিক ঋণ মূলত বিভিন্ন দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে নেওয়া। ফিৎচ প্রত্যাশা করছে যে, এই উৎসগুলো থেকে ঋণের প্রবাহ অব্যাহত থাকবে, যা বাংলাদেশের ঋণ পরিশোধের সক্ষমতাকে শক্তিশালী করবে। তবে হতাশার খবর হলো, স্বল্পসুদের ঋণের বড় উৎস জাপান, বাংলাদেশের জন্য তাদের সুদহার ২.৯ থেকে বাড়িয়ে ৩.৬ শতাংশ করেছে।

সংস্কারের সদিচ্ছার ঘাটতি

নতুন প্রশাসনের সংস্কার বাস্তবায়নের সদিচ্ছা নিয়ে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা দেখছে আন্তর্জাতিক ঋণমান সংস্থা ফিচ রেটিংস । সংস্থাটি জানিয়েছে, ব্যাংকিং খাতের সুশাসন এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সরকারি প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে নেয়া প্রধান কিছু আর্থিক সংস্কার কার্যক্রম বর্তমানে সরকার পুনর্বিবেচনা করছে।

ফিচের পর্যবেক্ষণ হলো, গণভোটের মাধ্যমে সমর্থিত সাংবিধানিক সংস্কারের কাজগুলোও বর্তমানে থমকে আছে। যার মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর পদের মেয়াদ নির্দিষ্ট করা এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতা শক্তিশালী করার মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবগুলোও অন্তর্ভুক্ত আছে।

এদিকে সুশাসনের ক্ষেত্রেও সমপর্যায়ের দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশ অনেক পিছিয়ে আছে বলে জানিয়েছে ফিচ। বিশ্বব্যাংকের সমন্বিত সুশাসন সূচকেও বাংলাদেশ অনেক পিছিয়ে। সংস্থাটি মনে করে, এই দীর্ঘস্থায়ী প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসনের অভাব দেশের বড় কোনো অর্থনৈতিক ধাক্কা সামলানোর ক্ষমতাকে দিন দিন কমিয়ে দিচ্ছে।

কমছে প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস

রাজনৈতিক দুর্বলতা অর্থনীতিকে আরও চাপে ফেলে দেয়ায় সবশেষ প্রভাব পড়বে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর। এজন্যই প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা কমিয়ে এনেছে ফিচ। সংস্থাটি পূর্বাভাস দিয়েছে, চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমে ৩.৭ শতাংশ এবং আগামী অর্থবছরে আরও কমে ৩.৫ শতাংশ হতে পারে। সংস্থাটি সতর্ক করে দিয়ে বলেছে, দীর্ঘ সময় ধরে জ্বালানি তেলের উচ্চমূল্য এবং ক্রমবর্ধমান বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা বজায় থাকলে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির এই পূর্বাভাস আরও নেতিবাচক হতে পারে।

প্রবৃদ্ধি যত কমবে কর্মসংস্থানও তত কমবে। এর ফলে মানুষের আয়ও কমবে। কর্মসংস্থান কমানর ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়বে প্রধান শিল্প খাত তৈরি পোশাকে। ফিচ বলছে, দেশের প্রধান খাত থেকে রপ্তানি আয় ক্রমান্বয়ে কমছে। এর পেছনে প্রধান তিনটি কারণ, মার্কিন পাল্টা শুল্ক-যার প্রভাবে কমছে ক্রয়াদেশ। এছাড়ও বিশ্ববাজারে পোশাকের চাহিদা কমার পাশাপাশি জ্বালানির দাম বাড়ায় দেশের অভ্যন্তরে উৎপাদন ও পরিচালনা ব্যয় বাড়ছে।

ফিচের এই পর্যবেক্ষণ দেখলে মনে হয় অর্থনীতির জন্য হতাশা ছাড়ার আর কিছু নেই। কিন্তু এই পরিস্থিতি একদিনে তৈরি হয়নি বরং বিগত সময়ের অগণতান্ত্রিক পরিবেশে যে লুটেরাতন্ত্র দেশে তৈরি হয়েছিল তারা ভিতর থেকে অর্থনীতিতে ধস নামিয়েছে। যার দায় গিয়ে পড়ছে এখনকার ক্ষমতাসীনদের ওপর। তবে সঠিক নীতি পরিকল্পনা আর সংস্কারই পারে এই পরিস্থিতি পাল্টাতে। নাগরিক হিসেবে আমরা সেই প্রত্যাশাতেই থাকতে চাই।

লেখক: বার্তা সম্পাদক, স্টার নিউজ

সারাবাংলা/জিএস/এএসজি