Saturday 20 June 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

কারবালা-পলাশী-তেহরান-ঢাকা

মুস্তাফা নূর সিদ্দিকী
২০ জুন ২০২৬ ১৬:৪৮

‘রক্তাক্ত কারবালা’- মক্কা বিজয়ের পর যখন ইসলামের আলো পৃথিবীজুড়ে ছড়িয়ে পড়তে লাগলো তখনই ইসলামের ছায়াতলে দলে দলে সত্যান্বেষী মানুষ আশ্রয় নিতে থাকে। ইসলামের এই অগ্রযাত্রা যদি থামানো না যায় তাহলে গত হওয়া কাফের-মুশরিকের মনগড়া মতবাদ হুমকীর মুখে পড়বে এবং এক পর্যায়ে জাজিরাতুল আরব থেকে শুরু করে পৃথিবীর প্রত্যেক স্থান থেকে তা নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। আল্লাহ প্রদত্ত ন্যায়ভিত্তিক জীবনব্যবস্থা ও সমাজব্যবস্থা সকল প্রকার অন্যায়-জুলুম-অবিচার থেকে মুক্তি প্রদান করবে। এই অগ্রযাত্রাকে শুরুতেই যাতে থামিয়ে দেওয়া যায় সেজন্য ইসলামের লেবাস পরিধান করা ব্যক্তিদের হাত ধরে ইসলামের সর্বশ্রেষ্ঠ নবী ও রাসূল হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ) ও তার বংশধর যাদেরকে আল্লাহ ‘আহলে বাইত’ বলেছেন, তাদের বিরুদ্ধে নানারকম ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়।

বিজ্ঞাপন

বনী সাকিফা থেকে সিফফিন, সিফফিন থেকে নেহেরওয়ান এবং নেহেরওয়ান থেকে কারবালা। প্রতিটা ঘটনাই কারবালার বীজ বপন করেছে। ইমাম হুসাইন (আঃ) ও নবী পরিবারের সদস্যদের সাথে হৃদয়বিদারক ট্র্যাজেডি, রাসূল (সাঃ) যেই উম্মতকে বিশ্বাস করেছিলেন এবং সেই উম্মতের কাছ থেকে বিশ্বাসঘাতকতারই নামান্তর। যেখানে বিদায় হজ্বের ভাষণে বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ) গোটা উম্মাহর জন্য দুটি মহামূল্যবান জিনিস রেখে গেছেন একটি ‘আল্লাহর কিতাব’ ও অপরটি ‘রাসূলের ইতরত ও আহলে বাইত’, কাল হাশরের ময়দানে রাসূল (সাঃ) সকলকে জিজ্ঞেস করবেন, রাসূলের রক্তজ ‘কুরবা’ এর সাথে কেমন আচরণ করা হইয়েছে, তখন কি এই উম্মত সেই প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবে কি?

কারবালার মরু প্রান্তরে রাসূল (সাঃ) এর নাতি ইমাম হুসাইন (আঃ) সহ বাহাত্তর জন নবী পরিবারের সদস্যদের যখন উমাইয়্যা এজিদের বাহিনী পিপাসারত অবস্থায় শহীদ করলো তখন রাসূলের (সাঃ) উম্মতের কি একজনও অবশিষ্ট ছিলোনা যে ইমাম হুসাইন (আঃ) এর সাহায্যে এগিয়ে আসবে?

জান্নাতের যুবকদের সর্দারের গলায় ছুরি চালিয়ে কি তারা জান্নাত আশা করেছিলো? রাসূল (সাঃ) একটি আল্লাহপ্রদত্ত সুন্দর জীনবনব্যবস্থা, রাষ্ট্রব্যবস্থা ও সমাজব্যবস্থা উম্মতকে দিয়ে গেছিলেন সেই ব্যবস্থা তাহলে কারা পছন্দ করেনি?

ইসলামের শত্রুরা যারা ইসলামকে মেনে নিতে পারেনি ন্যায় ও ইনসাফ মেনে নিতে পারেনি তারাই ইসলামে প্রবেশ করে ইসলামের ক্ষতি করেছে। রাসূল (সাঃ) প্রণীত জীবনব্যবস্থা কিভাবে মুলুকিয়াতে রুপ নিলো এবং এক সময়ের ইসলামের ঘোরশত্রুরা কিভাবে ইসলামের শাসকে উপনীত হলো এবং রাসূলের বংশধরদের নিশ্চিহ্ন করে দিলো রাসূলের ওফাতের পঞ্চাশ বছরের মধ্যেই!

মুলত এর বীজ রোপীত হয়েছিলো সাকিফায়ে বনী সায়েদায় যেখানে কতিপয় আনসার ও মুহাজিরিণদের মধ্যে রাসূলের ওফাতের পর খেলাফতের দায়িত্বকে কেন্দ্র করে গাদীরে খুমের রাসূলের ঐতিহাসিক ঘোষণা, ইমাম আলী ইবনে আবি তালিব (আঃ) বেলায়েতের বায়াত ভঙ্গের মাধ্যমেই। রাসূল (সাঃ) ও রাসূলের পরিবারের সাথে বিশ্বাসঘাতকতাই মুসলিম উম্মাহর দুর্দশার অন্যতম কারণ।

‘রক্তাক্ত পলাশী’– পলাশী বাংলার ইতিহাসের এক বিষাদময় ঘটনার সাক্ষী। ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন পলাশীর আম্রকাননে যে দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা ঘটেছিলো তাতে বাংলার সাড়ে পাঁচশত বছরের মুসলিম শাসনের অবসান ঘটে। এর মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় সম্পদ, বাণিজ্য অবকাঠামো ও রাষ্ট্রীয় শাসন ব্যবস্থার ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হয়। শস্য-শ্যামল, স্বয়ংসম্পূর্ণ একটি জনপদ ধংসের ঘটনা ইতিহাসে বিরল।

এদেশীয় কিছু লোভী, চাটুকার, উগ্রবাদী, অসৎ ও হিংসুক মানুষরুপী ইবলিশদের ষড়যন্ত্রের কারণে বাংলার সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে বিপর্যয় ঘটে। ইংরেজ বেনিয়ারা বাংলার ধন-সম্পদ ও প্রাচুর্যের লোভে শাসনক্ষমতা দখল করতে শঠতা, প্রতারণা ও বিভেদনীতির আশ্রয় নিয়েছিলো। ব্যবসা-বাণিজ্যের নামে সম্পদ লুট করাই ছিলো তাদের মূল উদ্দেশ্য। আর তাদের ষড়যন্ত্র বাস্তবায়নে মূখ্য ভূমিকা রেখেছিলো উগ্র হিন্দুত্ববাদী শেঠ বেনিয়ারা। এরা চাটুকারিতার মাধ্যমে মুসলিম শাসকদের আস্থা অর্জন করে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদ বাগিয়ে নিয়েছিলো। সেনাপতি হওয়ার কারণে ঘটনাচক্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়েছিলো অপদার্থ মীর জাফর। কিন্তু পেছনের প্রধান চক্রান্তকারীরা আড়ালেই থেকে যায়।

নবাব সিরাজুদ্দৌলা মাত্র পনেরো মাস বাংলার মসনদে ছিলেন। এই সময়ে ইংরেজদের চতুরতা উপলব্ধি এবং অভ্যন্তরীণ কোন্দল দমনে উদ্যোগী হয়েছিলেন। এতে তার মধ্যে যুবক বয়সেই দূরদর্শিতা ও দেশপ্রেম পরিলক্ষিত হয়। কিন্তু এতোকিছুর পরও নবাবের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে এই বাংলার উগ্র হিন্দু জমিদার ও শেঠ ব্যবসায়ীদের একটা বড় হাত খুঁজে পাওয়া যায়। বাংলার স্বাধীনতা রাতারাতি ইংরেজদের হাতে চলে যাওয়া এবং এইদেশের বড় বড় পদে আসীন থাকা লোকদের নিষ্প্রভ থাকার কারণেই ঘটেছে। এমনকি নবাবের কাছ থেকে ক্ষমতা কেড়ে নেওয়ার পর নবাব ও নবাব পরিবার সম্পর্কে মিথ্যা ইতিহাস রচনা করেছে এবং তা একশ্রেণীর তল্পীবাহক মুসলিম লেখকদেরকে দিয়েও তা লিপিবদ্ধ করার মতো ধৃষ্টতা দেখিয়েছে।

ঐতিহাসিকভাবে প্রমাণিত যে, নবাব আলীবর্দি খাঁ এর সময় থেকেই অধিকাংশ উচ্চপদস্থ রাজকর্মচারী ছিলো জমিদার হিন্দু। তৎকালীন প্রশাসন ব্যবস্থার ‘দেওয়ান’, ‘তানদেওয়ান’, ‘সাবদেওয়ান’ ও বখশীসহ সাতটি গুরুত্বপূর্ণ পদের ছয়টিতেই হিন্দুরা অধিষ্ঠিত। এদের মধ্যে একমাত্র মুসলিম ছিলো সেনাপতি মীর জাফর। এছাড়া বাংলা, বিহার, পাটনা ও উড়িষ্যার ১৯ জন জমিদার ও রাজার মধ্যে ১৮ জনই হিন্দু। ফলে একজন স্বাধীন নরপতি হিসেবে নবাব যখন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে হুশিয়ার করে দেন যে, এই বাংলার আইনের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে যদি শান্তিপূর্ণভাবে ব্যবসা করতে চায় তাহলে সহযোগীতা করা হবে অন্যথায় দেশ থেকে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে তাড়ানোর ব্যবস্থা করা হবে। নবাবের এই হুশিয়ার আমলে না নিয়ে আরও ঔদ্ধত্য আচরণ করেছে। এর মূল কারণ হিন্দু প্রভাবশালী জমিদারদের ভেতর থেকেই ইন্ধন পাচ্ছিলো ইংরেজরা। ফোর্ট উইলিয়াম কাউন্সিল এবং বাংলার জমিদারদের সাথে ষড়যন্ত্রমূলক চুক্তিতে উমিচাঁদ, জগতশেঠ, রায়দুর্লভ, রাজবল্লভ, মানিকচাঁদ, কৃষ্ণচন্দ্র, নন্দকুমার এবং ক্ষমতার লোভ দেখিয়ে নবাবের সেনাপতি মীর জাফর ও ঘষেটি বেগমকে ষড়যন্ত্রে শামিল করা হয়। এরাই ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজুদ্দৌলার বিরুদ্ধে পলাশীর প্রহসনমুলক যুদ্ধ সংঘটিত করে।

বাংলার জাতীয় বেইমানরা দেশ ও জাতির সাথে চরম বিশ্বাসঘাতকতা করে বাংলার স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে ইংরেজ বেনিয়াদের কাছে বিক্রি করে দেয়। এই ষড়যন্ত্রের ইতিহাস ইংরেজরা ও হিন্দুত্ববাদীরা কখনোই সাধারণ মানুষকে জানতে দিতে চায়নি। পলাশীর ঘটনাকে তারা অভ্যন্তরীণ কলহের ফল এবং বাংলার মানুষকে ইংরেজরা উদ্ধার করে মুক্তি দেওয়ার নামে কথিত রচনা তৈরি করেছে।

ইংরেজদের কৃপাধন্য হিন্দু ঐতিহাসিক রাজীব লোচন লিখেছেন, যবন রাজত্বের অবসান ঘটানোর জন্যই হিন্দু আমাত্য-জমিদারেরা উদ্যোগী হয়েছিলেন। বিষ্ময়কর ব্যপার হলো, পলাশীর যুদ্ধকে কোনো কোনো হিন্দু লেখক ‘দেবাসুর সংগ্রাম’ নামে আখ্যায়িত করেছেন। শুধু এখানেই থেমে থাকেনি বর্ণবাদী হিন্দুরা, তারা পলাশীর শোকাবহ বিপর্যয়কে উপজীব্য করে বিজয় উৎসব পালনের লক্ষ্যে বাংলায় শারদীয় দুর্গোৎসব পালন করে লর্ড ক্লাইভকে দেবতাতুল্য সংবর্ধনা দেয় ১৭৫৭ সালে।

পলাশীর যুদ্ধের পর ষড়যন্ত্রকারীদের এই দেশের সম্পদ লুটপাটের ইতিহাস একবারে বিরল। বাংলার মানুষের সম্পদের ব্যাপক লুন্ঠন করে ১৭৭০ সালে (বাংলা-১১৭৬) কৃত্রিমভাবে দুর্ভিক্ষ সৃষ্টি করা হয়েছিলো যা বাংলার ইতিহাসে ছিয়াত্তরের মন্বন্তর নামে পরিচিত। অন্যজাতির গোলামীর জিঞ্জির সেদিনই পরেছিলো বাংলার মানুষ যেদিন শেষ স্বাধীন সূর্য সন্তানকে পরাজিত করা হয় এবং বাংলার স্বাধীনতার সূর্য চিরদিনের জন্য অস্তমিত হয়ে যায়।

‘রক্তাক্ত তেহরান’- পরাশক্তিদের অস্ত্র প্রশিক্ষণের ময়দান হিসেবে পরিচিত দোযখ হলো মধ্যপ্রাচ্য। যুগে যুগে এই মধ্যপ্রাচ্য সবসময়ই অশান্ত থেকেছে। আধুনিক অস্ত্রের যুগে এসেও যেনো মধ্যপ্রাচ্যে শান্তির অবকাশ নেই। দিনকে দিন যেনো বারুদে পরিণত হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো। পরাশক্তি খ্যাত আমেরিকার সামরিক ঘাটি একেকটা জ্বলন্ত আগুণে পরিণত হয়েছে। পরমানু প্রযুক্তির উন্নয়ন নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সংঘাত চলে আসছে।

এই সংঘাতের আসল উষ্কানীদাতা হলো মধ্যপ্রাচ্যে শিশুরাষ্ট্র দখলদার ইসরায়েল। ইরানের শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন করে সেখানকার তেল,গ্যাস, খনিজ সম্পদ লুট করতে চায় পশ্চিমারা। তাই বিগত ৪৭ বছর ধরে ইরানকে শত শত বাণিজ্য, সামরিক ও অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা দিয়ে আসছে যুক্তরাষ্ট্র।

আসলে মধ্যপ্রাচ্যে যেসব দেশে যুক্তরাষ্ট্রের ঘাটি আছে সেসব দেশের তেলসম্পদও আমেরিকারই নিয়ন্ত্রণে। গণতন্ত্রের বুলি আউড়ানো আমেরিকা সেসব দেশে তার অনুগত সরকার ও রাজতন্ত্র টিকিয়ে রেখেছে। ইরানে ১৯৭৯ সালে ইসলামী বিপ্লব ঘটিয়ে সেখানকার আমেরিকার তাবেদার শাহকে ক্ষমতাচ্যুত করেছিলো ইরাণের বিপ্লবী জনগণ। ধর্মীয় নেতা সাইয়্যেদ রুহুল্লাহ মুসাভী খোমেইনীর বলিষ্ঠ নেতৃত্ব ইরানকে যেকোনো পরশক্তির সামনে মাথা তুলে দাঁড়াবার সাহস যুগিয়েছে। ইমাম খোমেইনীর পর সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচিত হন শহীদ আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ আলী খামেনেয়ী। সুদীর্ঘ ত্রিশ বছর ইরানের ধর্মীয় নেতার দায়িত্ব পালন করেন।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরাক-ইরান যুদ্ধ, আফগান যুদ্ধ, ইরাক যুদ্ধ এবং ইরানের ভেতর হামলা চালিয়ে সামরিক ও বেসামরিক ক্ষতি করেছে। কিন্তু ইরানকে সামরিক কায়দায় নতজানু করতে পারেনি। শহীদ আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ আলী খামেনেয়ীর বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর ইরানী দেশপ্রেমিক ও সাহসী মুসলমানদেরকে পশ্চিমা আধিপত্যবাদকে চ্যালেঞ্জ করার সাহস যুগিয়েছে। তিনি ছিলেন গণমানুষের নেতা। এই কণ্ঠস্বরকে থামিয়ে দিতে আমেরিকা ও দখলদার ইসরায়েল নানা ষড়যন্ত্র করেছে। ইরানী ইসলামী বিপ্লবের নেতাকে অনেকবার হত্যাচেষ্টা করেছে। এমন কী দেশের জনগণের মাঝে পশ্চিমা মদদপুষ্ট মতবাদ প্রচার করে বিভিন্ন রঙ্গিন বিপ্লব ঘটিইয়ে দেশকে ভেতর থেকে দুর্বল করার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছে যায়োনবাদী শক্তি।

দেশের ভেতর কতিপয় যায়নবাদী অনুচরদের গোপন তথ্যের ভিত্তিতে দীরঘদিন ধরে আয়াতুল্লাহ খামেনেয়ীর গতিবিধির উপর নজরদারী করে আসছিলো। ২৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬ তারিখে নিজ বাস ভবনে যায়োনবাদীদের মিসাইলের আঘাতে শহীদ হন মুসলিম বিশ্বের এই দৃঢ়চেতা লৌহমানব।

যায়োনবাদীরা ভেবেছিলো ইরানের সর্বোচ্চ নেতাকে শহীদ করলেই ইরান ভেঙ্গে পড়বে। নেতা হয়তো মারা যায় কিন্তু নেতার আদর্শ থাকে চিরকাল। ইরানের সাথে সংহতি জানিয়ে ল্যাটিন আমেরিকার একটি স্বাধীন রাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনেয়ীর প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিলেন। ইরানের সাথে ভেনেজুয়েলার দীর্ঘদিনের সুসম্পর্ক যা দুই দেশের বাণিজ্যিক প্রসারতা বৃদ্ধি করেছিলো সেটিকে রোধ করতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ঘৃণ্য ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়। ভেনেজুয়েলার মতো একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের তেলক্ষেত্র দখলের জন্য বিশেষ সামরিক সেনা পাঠিয়ে ভেনেজুয়েলার দেশপ্রেমী প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে স্ত্রীসহ অপহরণ করে আমেরিকার কারাগারে বন্দী করে রাখে। আন্তর্জাতিক সকল আইনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে যায়োনবাদী শক্তি এভাবেই তাদের বিরোধী মতকে দমন পীড়ন করে মোড়লগীরি করে বেড়ায়।

‘রক্তাক্ত ঢাকা’- ঢাকার বুকে এখনো একটা বংশধারা আছেন যারা একসময়ে বীর প্রতাপে এই বাংলা ভূখন্ড, বিহার, উড়িষ্যা, মুর্শিদাবাদ ও ঢাকা শাসন করতেন। বাংলার নবাব সিরাজুদ্দৌলার বংশধারা এখনো ঢাকার বুকে সেই পুরোনো স্মৃতি বহন করে যাচ্ছেন।

কালের পরিক্রমায় ব্রিটিশদের শোষণের মাত্রা সকলেরই জানা। আর সেটা যখন একজন দেশপ্রেমিক নবাবের বংশের উপরে আপতিত হয় তখন সেখানে দুর্দশা ও আফসোসের শেষ নেই। ১৭২৭ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর। বাংলা-বিহার ও উড়িষ্যার অধিপতি নবাব আলীবর্দী খাঁর কন্যা আমেনা বেগমের কোলজুড়ে জন্ম নেন মির্জা মুহাম্মদ। তার বাবা ছিলেন হাশেম জৈনুদ্দিন আহমদ। পরবর্তী সময়ে মির্জা মুহাম্মাদ ইতিহাসের মহানায়ক নবাব সিরাজউদ্দৌলা নামে পরিচিতি লাভ করেন।

রাজনৈতিক অস্থিরতায় তার জীবন স্বল্পায়ু হলেও রক্তধারা এগিয়ে চলে ইকরামউদ্দৌলা ও সিরাজউদ্দৌলার বংশের ভেতর দিয়ে। সিরাজউদ্দৌলার একমাত্র কন্যা উম্মে জহুরা বেগমকে নিকাহ দেওয়া হয় ভাই ইকরামউদ্দৌলার ছেলে মুরাদউদ্দৌলার সঙ্গে।

সেখান থেকে জন্ম নেয় শমসের আলী, এরপর সৈয়দ লুৎফে আলী, তারপর ফাতেমা বেগম, তারপর হাসমত আরা বেগম। এ ধারার মধ্য দিয়েই আবির্ভূত হন সৈয়দ জাকির রেজা আর জাকির রেজার পুত্র সৈয়দ গোলাম মোর্তজা। ঢাকার নবাব স্যার সলিমুল্লার আবেদনেই জাকি রেজাকে ১৯১৩ সালে ব্রিটিশ সরকার বাংলার স্বাধীনতার প্রথম শহীদ শীর্ষ মুক্তিযোদ্ধা সিরাজউদ্দৌলার উত্তরসূরি হিসেবে সম্মান জানিয়ে সরকারি চাকরিতে নিয়োগ দেয়। বংশধারা এর পর এগিয়ে আসে মুর্শিদাবাদ থেকে পূর্ববাংলায়, রাজশাহী-খুলনা পেরিয়ে ঢাকায়।

এই দীর্ঘ যাত্রার সাক্ষী হয়ে ওঠেন নবাব পরিবারের ষষ্ঠ থেকে নবম প্রজন্ম। এই রক্তধারার অষ্টম প্রজন্মে জন্মনেন সৈয়দ গোলাম মোস্তাফা। তিনি ছিলেন বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) নির্বাহী প্রকৌশলী, একজন দক্ষ সংগঠক ও সততার প্রতীক। দেশের বিদ্যুৎ খাতে তার অবদান অনন্য। টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া পর্যন্ত বিদ্যুতের টাওয়ার ও খুঁটি দাঁড়িয়েছে তার পরিকল্পনা ও নেতৃত্বে। দেশের যেকোনো প্রান্তে বিদ্যুৎ বিপর্যয় ঘটলে তিনি ছিলেন সর্বশেষ ভরসা। সহকর্মীদের সংগঠিত ও প্রকৌশলীদের ঐক্যবদ্ধ রাখা এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদ রক্ষায় তার দৃঢ় অবস্থান তাকে আলাদা মর্যাদা দিয়েছে।

ইঞ্জিনিয়ার সৈয়দ গোলাম মোস্তাফার জীবনধারাও ছিলো নবাব পরিবারের ঐতিহ্যের মতোই সেবামুখী। নিজের আয়ের বড় অংশ তিনি ব্যয় করতেন দরিদ্র-অসহায়দের সেবামূলক কাজে। কোনো রাজনৈতিক দলে সরাসরি যুক্ত না থেকেও দেশপ্রেমিক আন্দোলন, সমাজসেবা ও ইসলামী চিন্তায় তিনি সক্রিয় ভূমিকা রাখতেন।

তিনি বলতেন—’আমার শক্তির জায়গাটা আমার পরিবার। সহধর্মিণী মহীয়সী নারী সৈয়দা হোসনে আরা বেগম ও চার সন্তান আমার জীবনের লাকি চার্ম।’ ইতিহাসে দেখা যায় বাংলার এই ঐতিহ্যবাহী নবাব পরিবার যেমন বাংলার স্বার্থে লড়েছিল, তেমনি সৈয়দ গোলাম মোস্তাফা নিজের কর্মক্ষেত্রে দেশের বিদ্যুৎ খাতে নিরলস সংগ্রাম চালিয়েছেন। ধর্মীয় মূল্যবোধ ও অনুশাসনের প্রতি আকৃষ্ট ছিলেন এবং নানা সেবাকাজে তিনি নিজেকে বিলিয়ে দিতে পছন্দ করতেন। আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে অনুদানসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সহযোগীতায় এগিয়ে আসতেন।

উনার এই সমাজসেবামূলক কাজ বিগত সরকারের ভেতরে থাকা বিশ্বাসঘাতকেরা সহ্য করতে পারেন নি! তাই তাকে দমানোর জন্য এবং তার পরিবারের ক্ষতিসাধনের জন্য নানা রকম চক্রান্ত ও ষড়যন্ত্রের আশ্রয় নেয়! চেষ্টা করা হয় গুপ্ত হত্যার! বারবার চেষ্টা করে শেষ পর্যন্ত সফলও হয়েছে। এ যেনো বাংলার ঐতিহ্যবাহী নবাব পরিবারের দেশপ্রেমী প্রজন্মের প্রতি দেশি-বিদেশি কুচক্রীদের বিশ্বাসঘাতকতার ক্ষত চিহ্ন তার পরবর্তী বংশধরদেরও বহন করতে হচ্ছে।

বন্ধুরা বাংলাদেশের ক্ষমতার মসনদে কেউ কি কালা যাদু করে রেখেছে বোধহয়। কারণ যেই বসে সেই গোলাম হয়ে যায়। আর এইটা ঘটছে ১৭৫৭ সালের পলাশির প্রান্তরের ঘটনার পর। বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজুদ্দৌলার কাছ থেকে বাংলার ক্ষমতা কেড়ে নেওয়ার মাধ্যমেই আর কখনোই বাঙালীরা মাথা উঁচু করে দাড়াতে পারে নাই। অভিশাপ বলে একটা কথা আছে। যা বাংলাদেশের মানুষকে আজীবন বয়ে বেড়াতে হবে এবং হচ্ছে।

আমার কথা হাসি দিয়ে অনেকে উড়িয়ে দিবে। কিন্তু একটা জিনিস চিন্তা করেন বাংলাদেশ ভূখন্ড ১৭৫৭ সালের পর থেকে আজকের তারিখ পর্যন্ত কখনোই স্থিতিশীল হয় নাই। যেই ক্ষমতার মসনদে বসেছে কারো না কারো, কোনো না কোনো দেশের বা জাতির গোলামীই করে গেছে এবং যাচ্ছে। বাংলাদেশের মানুষের উচিত আসল যায়গায় হাত দেওয়া।

১৭৫৭ সালের ভুলের প্রায়শ্চিত্ত আজও বাংলাদেশের মানুষকে দিতে হচ্ছে। এই মাশুল শেষ হবে কিভাবে সেটাই এখন বড় প্রশ্ন। নবাব সিরাজুদ্দৌলার দেহকে যখন টেনে হিচড়ে নিয়ে যাচ্ছিলো সেখানে উপস্থিত যতজন বাঙালী ছিলো তারা যদি এক টা করে ঢিল নিক্ষেপ করতো তাহলে আজ গোলামী করতে হতোনা। বাংলাদেশের মানুষ গোলামীর জিঞ্জির সেইদিনই গলায় পড়ে নিয়েছে যেদিন শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজুদ্দৌলাকে টেনে হিচড়ে নিয়ে যাচ্ছিলো। হাতি দিয়ে পিষ্ট করার সময়ও কোনো বাঙালীর মন কাঁদলো না!

আজ একজন হাদি মরে গেসে বাঙালীর দু:খের শেষ নাই। এরকম ১০০ না ১০০০০০ হাদি যদি মরে তারপরও তার বিচার হবেনা এইদেশের মাটিতে। কারণ বাঙালী নিজেই ঠিক নাই। গোলামীর জিঞ্জির আজ বাঙালীর রন্ধ্রে রন্ধ্রে। এই জিঞ্জির যেদিন গলা থেকে নামাতে পারবে সেদিনই ১৭৫৭ সালের পাপের মোচন হবে।

বাংলাদেশ সরকারের উচিত ঐতিহ্যবাহী নবাব সিরাজউদ্দৌলা পরিবারের দেশপ্রেমী প্রজন্ম নবাবজাদা আলি আব্বাসউদ্দৌলার জন্য আলাদা মর্যাদার ব্যবস্থা করা, শেষ স্বাধীন নবাবের বংশধর আব্বাসউদ্দৌলা এখনো বাংলার বুকে অযত্ন অবহেলায় রয়েছেন! ব্রিটেনের রাজপরিবার এখনো সসম্মানে থাকতে পারে। স্পেনের রাজপরিবার এখনো সসম্মানে রাষ্ট্রে হয়ে বিশ্বে ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশ??? হায় আফসোস।

বেশ পরিতাপের সাথে বলতে হয় বাংলাদেশের মানুষ যতদিন নবাব সিরাজউদ্দৌলা পরিবারের প্রাপ্য সম্মান নবাবের দেশপ্রেমী প্রজন্ম আব্বাসউদ্দৌলাকে বুঝিয়ে দিবে না ততদিন বাংলাদেশের মানুষের মুক্তি নেই। মানুষ যেদিন বুঝবে ১৭৫৭ সালে তাদের পূর্বপুরুষ ভুল করেছে সেদিনই গোলামীর জিঞ্জির থেকে আমরা বাংলাদেশের মানুষ মুক্ত হতে পারবো ইনশাআল্লাহ।

ঐতিহ্যবাহী নবাব সিরাজউদ্দৌলা পরিবারের উচিত বাংলাদেশের রাজনীতির মাঠে আবারও সরব হওয়া। ১৭৫৭ সালের পর বাংলার মানুষ কখনই মুক্তি পায়নি। আমরা চাই বাংলার ভাইজান সৈয়দ গোলাম আব্বাস আরেব ওরফে নবাবযাদা আলি আব্বাসউদ্দৌলার নেতৃত্বে বাংলার সমাজ আবারও জেগে উঠুক। বাংলার ভাইজান আমাদের আপনজন আব্বাসউদ্দৌলাকে পাশে নিয়ে আমাদের গণমুখী কাজ করা উচিত। তাহলেই অভিশপ্ত সোনার বাংলা কলঙ্কমুক্ত হবে। সিরাজউদ্দৌলা জিন্দাবাদ আব্বাসউদ্দৌলা জিন্দাবাদ।

সারাবাংলা/এফএন/এএসজি