Sunday 17 May 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

অপপ্রচারের আড়ালে বাংলাদেশের সম্প্রীতির ইতিহাস

সাইফুল ইসলাম শান্ত
১৭ মে ২০২৬ ১৭:৩৬

দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরেই একটি সহনশীল, ও মানবিক রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত। অথচ সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিক কিছু মাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে পার্বত্য চট্টগ্রাম ও জাতিগত প্রশ্নকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে যেন বাংলাদেশ একটি নিপীড়নমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থার দিকে এগোচ্ছে। বাস্তবতা হলো এই দেশের সৃষ্টি হয়েছিল ভাষা, সংস্কৃতি ও নাগরিক অধিকারের প্রশ্নে। কোন ধর্ম, জাতি কিংবা সম্প্রদায়ের ভিত্তিতে নয়। সম্প্রতি মার্কিনভিত্তিক সাময়িকী The Diplomat-এ প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে কিছু জাতিগোষ্ঠীর মানুষের মিয়ানমারে চলে যাওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে এমন একটি বয়ান তৈরি করা হয়েছে, যা বাংলাদেশের সামাজিক বাস্তবতা, রাষ্ট্রীয় নীতি এবং ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটকে যথেষ্ট ভারসাম্যের সঙ্গে উপস্থাপন করেনি। বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনার ভিত্তিতে পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থা, সেনাবাহিনী কিংবা দেশের সামাজিক কাঠামোকে প্রশ্নবিদ্ধ করার প্রবণতা শুধু অসম্পূর্ণ নয় বাস্তবতারও পরিপন্থী।

বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশ এমন একটি রাষ্ট্র, যার জন্মই হয়েছিল বৈষম্য, দমন-পীড়ন ও সাংস্কৃতিক নিপীড়নের বিরুদ্ধে সংগ্রামের মধ্য দিয়ে। ১৯৭১ সালে এই দেশের মানুষ ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে নয়, ভাষা, সংস্কৃতি ও নাগরিক অধিকারের প্রশ্নে ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল। বাংলাদেশের সংবিধানের মূল চেতনাতেও রয়েছে ধর্মনিরপেক্ষতা, মানবিক মর্যাদা এবং সকল নাগরিকের সমান অধিকার। ফলে এই দেশকে সাম্প্রদায়িক নিপীড়নের রাষ্ট্র হিসেবে উপস্থাপন করা ইতিহাসের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

পার্বত্য চট্টগ্রাম বাংলাদেশের একটি জটিল ও সংবেদনশীল অঞ্চল। সেখানে ভৌগোলিক বৈচিত্র্য যেমন আছে তেমনি রয়েছে বহু জাতিগোষ্ঠীর দীর্ঘ ইতিহাস, সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য এবং রাজনৈতিক দাবি। স্বাধীনতার পর বিভিন্ন সময় সেখানে সংঘাত হয়েছে, শান্তিচুক্তিও হয়েছে আবার কিছু ক্ষেত্রে বিচ্ছিন্ন উত্তেজনাও তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশ সরকার পার্বত্য অঞ্চলের উন্নয়ন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামো ও রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তির জন্য ধারাবাহিকভাবে কাজ করেছে। ১৯৯৭ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি দক্ষিণ এশিয়ায় সংঘাত নিরসনের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও স্বীকৃতি পেয়েছিল। এই চুক্তির মাধ্যমে অস্ত্রধারী সংঘাতের অবসান ঘটে এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ও প্রশাসনিক অধিকার নিশ্চিত করার পথ তৈরি হয়।

সীমান্তবর্তী অঞ্চলে মানুষের যাতায়াত নতুন কিছু নয়। পারিবারিক, নৃতাত্ত্বিক ও জীবিকাগত কারণে বাংলাদেশ, মিয়ানমার ও ভারতের সীমান্ত অঞ্চলে বহু দশক ধরেই সীমিত আকারে চলাচল রয়েছে। গত এক দশকে বিশ্বের অন্যতম ভয়াবহ মানবাধিকার সংকটের জন্ম দিয়েছে মিয়ানমার। জাতিসংঘ মিয়ানমারের রাখাইনে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে পরিচালিত অভিযানে ‘জাতিগত নিধনের উপাদান’ থাকার কথা বলেছে। ২০১৭ সালে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর অভিযানের মুখে ১২ লক্ষের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়। বিশ্বের বহু ধনী ও শক্তিশালী দেশ সীমান্ত বন্ধ করে দিলেও বাংলাদেশ মানবিক কারণে তাদের আশ্রয় দিয়েছে। কক্সবাজার আজ বিশ্বের বৃহত্তম শরণার্থী শিবিরের আবাসস্থল। এই বাস্তবতা প্রমাণ করে বাংলাদেশ ধর্ম বা জাতিগত পরিচয়ের ভিত্তিতে মানুষকে বিচার করে না, মানবিক মূল্যবোধকে অগ্রাধিকার দেয়। বাংলাদেশ যদি প্রকৃত অর্থেই সাম্প্রদায়িক বা জাতিগত নিপীড়নের রাষ্ট্র হতো তাহলে এত বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গাকে বছরের পর বছর আশ্রয়, খাদ্য, স্বাস্থ্যসেবা ও নিরাপত্তা দেওয়া সম্ভব হতো না। এই দায়িত্ব আমাদের অর্থনীতি ও সমাজের ওপর বড় চাপ তৈরি করলেও রাষ্ট্র মানবিক অবস্থান থেকে সরে আসেনি। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বারবার বাংলাদেশের এই ভূমিকার প্রশংসা করেছে। জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা বাংলাদেশকে মানবিকতার এক গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেছে। এখানে মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টানসহ বিভিন্ন ধর্মের মানুষ শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে একসঙ্গে বসবাস করছে। দুর্গাপূজা, বুদ্ধ পূর্ণিমা, বড়দিন কিংবা ঈদ—সব ধর্মীয় উৎসবই জাতীয় পরিসরে উদযাপিত হয়। রাষ্ট্রীয়ভাবে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উৎসবে নিরাপত্তা দেওয়া হয়। সরকারি ছুটি ঘোষণা করা হয় এবং সাংস্কৃতিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হয়।

বাংলাদেশ সেনাবাহিনী আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বিশ্বের অন্যতম সুনামধন্য বাহিনী। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশ বহু বছর ধরেই শীর্ষ অবদানকারী দেশগুলোর একটি। আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীরা জীবন বাজি রেখে শুধু নিরাপত্তা রক্ষাই করেননি, স্থানীয় জনগণের আস্থা অর্জনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। তাদের পেশাদারিত্ব, শৃঙ্খলা ও মানবিক আচরণ আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত। যদি একটি বাহিনী নিজ দেশে ধারাবাহিকভাবে জাতিগত নিপীড়নের সঙ্গে জড়িত থাকত তাহলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সেই বাহিনীর এমন গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হতো না। পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনাবাহিনীর উপস্থিতির পেছনেও একটি নিরাপত্তাগত বাস্তবতা রয়েছে। সীমান্তবর্তী এই অঞ্চল দীর্ঘদিন ধরে অস্ত্র চোরাচালান, বিচ্ছিন্নতাবাদী তৎপরতা এবং আন্তঃসীমান্ত সশস্ত্র গোষ্ঠীর কার্যক্রমের ঝুঁকিতে ছিল। কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট (কেএনএফ)-এর মতো সংগঠন সশস্ত্র তৎপরতা চালালে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বাহিনী অভিযান পরিচালনা করবে—এটাই স্বাভাবিক। এখানে আরেকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ—পার্বত্য অঞ্চলে উন্নয়ন কার্যক্রম। গত এক দশকে সেখানে সড়ক যোগাযোগ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্যসেবা, বিদ্যুৎ সংযোগ ও ডিজিটাল অবকাঠামোতে উল্লেখযোগ্য উন্নয়ন হয়েছে। সেনাবাহিনীও বিভিন্ন সামাজিক ও মানবিক কার্যক্রমে অংশ নেয়, যেমন চিকিৎসাসেবা, শিক্ষা সহায়তা এবং দুর্যোগ মোকাবিলা। পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর বহু তরুণ এখন সরকারি চাকরি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও জাতীয় পর্যায়ের বিভিন্ন ক্ষেত্রে যুক্ত হচ্ছেন। এই ইতিবাচক পরিবর্তনগুলো আন্তর্জাতিক অনেক প্রতিবেদনে অনুপস্থিত থাকে।

আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের একটি অংশ প্রায়ই দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোকে এমনভাবে উপস্থাপন করে যেখানে জটিল সামাজিক বাস্তবতাকে সরলীকরণ করা হয়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও একই প্রবণতা দেখা যায়। অথচ এই দেশটি গত পাঁচ দশকে দারিদ্র্য হ্রাস, নারীর ক্ষমতায়ন, স্বাস্থ্যসেবা, শিশু মৃত্যুহার কমানো এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে অসাধারণ অগ্রগতি অর্জন করেছে। জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা বাংলাদেশকে উন্নয়নের ‌‌‘রোল মডেল’ হিসেবে উল্লেখ করেছে। এই অর্জনের পেছনে ধর্মীয় সম্প্রীতি, সামাজিক সহনশীলতা এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক নীতির বড় ভূমিকা রয়েছে। আমাদের দেশে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা, ভূমি বিরোধ কিংবা স্থানীয় সংঘাতের ঘটনা একেবারেই নেই—এমন দাবি কেউ করবে না। কিন্তু একটি দেশের বিচ্ছিন্ন সমস্যা আর রাষ্ট্রীয় নীতি এক জিনিস নয়। বাংলাদেশ রাষ্ট্রীয়ভাবে কখনো ধর্মীয় বা জাতিগত নিপীড়নকে সমর্থন করেনি। বরং সংবিধান, আদালত, প্রশাসন এবং সামাজিক কাঠামোর মাধ্যমে সমঅধিকার নিশ্চিত করার চেষ্টা করেছে।

সবশেষে বলা যায়, বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে যেকোনো আলোচনা অবশ্যই ভারসাম্যপূর্ণ, তথ্যভিত্তিক এবং ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় হওয়া উচিত। বিচ্ছিন্ন অভিজ্ঞতাকে পুরো রাষ্ট্রের চরিত্র হিসেবে উপস্থাপন করা যেমন অন্যায়, তেমনি বাংলাদেশের মানবিক ভূমিকা, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি এবং উন্নয়ন প্রচেষ্টাকে অস্বীকার করাও বাস্তবতার বিকৃতি। বাংলাদেশ এমন একটি দেশ, যেখানে ধর্মের চেয়ে নাগরিক পরিচয় বড়, মানবিক মূল্যবোধ রাজনৈতিক বিভাজনের চেয়েও শক্তিশালী এবং সংকটের মধ্যেও সহাবস্থানের সংস্কৃতি টিকে আছে। এই দেশকে বুঝতে হলে তার সংগ্রাম, মানবিকতা এবং বহুত্ববাদী বাস্তবতাকে একসঙ্গে দেখতে হবে।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট