Saturday 04 Apr 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

আওয়ামী আমলে জিয়া পরিবারের নাম মুছে ফেলা স্থাপনাগুলো কি ফিরবে পুরনো পরিচয়ে?

ফারহানা নীলা সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট
৪ এপ্রিল ২০২৬ ১৬:০৫ | আপডেট: ৪ এপ্রিল ২০২৬ ২০:০৮

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের গত ৫৪ বছর পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, উন্নয়ন আর আদর্শের লড়াইয়ের চেয়েও প্রবল হয়ে উঠেছিল ‘নাম মোছার রাজনীতি’। ১৯৭৫-এর পটপরিবর্তন থেকে শুরু করে ২০২৪-এর ছাত্র-জনতার বিপ্লব,প্রতিটি বাঁকেই শাসকগোষ্ঠী চেয়েছে তাদের পূর্বসূরিদের চিহ্ন মুছে দিতে। বিশেষ করে গত দেড় দশকে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হাতে গড়া অনেক প্রতিষ্ঠান ও আয়োজন রাষ্ট্রীয় পর্যায় থেকে হয় বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল, না হয় নাম পরিবর্তন করে এক ধরণের নির্বাসনে পাঠানো হয়েছিল। বর্তমানে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট পরিবর্তনের পর সেই হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্যগুলো ফিরে আসবে কি ?

জিয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর

বিজ্ঞাপন

২০১০ সালে ‘জিয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর’-এর নাম পরিবর্তন করে ‘হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর’ করা হয়েছিল। এটি ছিল বিএনপির জন্য রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম বড় আঘাত। বর্তমানে বিভিন্ন মহলে দাবি উঠেছে বিমানবন্দরের নাম পুনরায় ‘জিয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর’ করার। যদিও সরকারিভাবে এখনো বড় কোনো ঘোষণা আসেনি। এটি একটি দীর্ঘ প্রশাসনিক প্রক্রিয়া হলেও বিএনপির কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে এই নাম পুনরুদ্ধারের আকাঙ্ক্ষা এখন তুঙ্গে।

আশুগঞ্জ জিয়া সার কারখানা: শিল্পায়নের প্রতীক

জিয়াউর রহমানের শিল্পায়নের অন্যতম প্রতীক ছিল আশুগঞ্জ ‘জিয়া সার কারখানা’। আওয়ামী লীগ আমলে এর নাম পরিবর্তন করে ‘আশুগঞ্জ ফার্টিলাইজার অ্যান্ড কেমিক্যাল কোম্পানি লিমিটেড’ করা হয়েছিল। বর্তমানে এই নাম পরিবর্তনের সিদ্ধান্তটি চ্যালেঞ্জ করার প্রস্তুতি নিচ্ছে সংশ্লিষ্ট মহল। জিয়া পরিবারের নাম জড়িত থাকায় যে শিল্প প্রতিষ্ঠানটি রাজনৈতিক রোষানলের শিকার হয়েছিল, সেটিকে পুনরায় তার আদি নামে ফিরিয়ে আনার দাবি জোরালো হচ্ছে।

গ্রাম সরকার ও ১৯ দফার প্রত্যাবর্তন

জিয়াউর রহমানের অন্যতম রাজনৈতিক দর্শন ছিল ‘গ্রাম সরকার’। এটি ছিল ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের একটি বিশেষ মডেল। আওয়ামী লীগ সরকার এটিকে সম্পূর্ণ বিলুপ্ত করে দিয়েছিল। বর্তমান সময়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার ‘রাষ্ট্র মেরামত’ ও ‘৩১ দফা’র মধ্যে জিয়ার সেই তৃণমূল পর্যায়ের ক্ষমতায়নের ধারণাটিকে নতুন আঙ্গিকে ফিরিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। রাজনৈতিক মাঠে এই আলোচনা আবার প্রাণ পেয়েছে যে, গ্রাম পর্যায় পর্যন্ত মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে জিয়ার সেই দর্শনের বিকল্প নেই।

সার্কিট হাউস ও জিয়া স্মৃতি জাদুঘর

চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে অবস্থিত ‘জিয়া স্মৃতি জাদুঘর’ নিয়ে বিগত সময়ে যে অবহেলা ছিল, তা কাটতে শুরু করেছে। বিগত সরকার এই জাদুঘরের বরাদ্দ কমিয়ে দিয়েছিল এবং এটিকে সাধারণ সার্কিট হাউসে রূপান্তরের চেষ্টা চালিয়েছিল। এখন সেখানে নতুন করে সংস্কার কাজ শুরু হয়েছে এবং জিয়ার স্মৃতিবিজড়িত নিদর্শনগুলো পুনরায় যথাযথভাবে প্রদর্শনের ব্যবস্থা করা হচ্ছে।

ভাসানী নভোথিয়েটার

রাজধানীর বিজয় সরণিতে অবস্থিত নভোথিয়েটারটি ছিল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির প্রসারে একটি বৃহৎ পদক্ষেপ। বিএনপি সরকারের আমলে এর কাজ উল্লেখযোগ্যভাবে এগোলেও পরবর্তীতে এর নাম পরিবর্তন করে ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নভোথিয়েটার’ করা হয়। এর আগে এটি ‘ভাসানী নভোথিয়েটার’ নামে পরিচিত ছিল। মূলত জিয়া পরিবারের সাথে সংশ্লিষ্ট বা তাদের আমলের বড় উদ্যোগগুলোকে দলীয় ছাঁচে ফেলার যে প্রবণতা গত দেড় দশকে দেখা গেছে, নভোথিয়েটারের নাম পরিবর্তন ছিল তারই অংশ। বর্তমানে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা চলছে, রাষ্ট্রীয় এই স্থাপনাটির নাম পরিবর্তনের মাধ্যমে জিয়া পরিবারের অবদানের স্বীকৃতি পুনরায় দেওয়া হবে কি না।

নারীদের উপবৃত্তি ও অবৈতনিক শিক্ষা: একটি যুগান্তকারী অধ্যায়

খালেদা জিয়ার সরকারের আমলে (১৯৯১-৯৬) বাংলাদেশের সমাজব্যবস্থায় সবচেয়ে বড় নীরব বিপ্লবটি এসেছিল নারী শিক্ষার হাত ধরে। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া মেয়েদের জন্য উপবৃত্তি এবং অবৈতনিক শিক্ষা কর্মসূচি ব্যাপকভাবে শুরু করেছিলেন। এই উদ্যোগের ফলে মাধ্যমিক স্তরে নারী শিক্ষার হার অবিশ্বাস্যভাবে বেড়ে যায় এবং সারা বিশ্বে এটি একটি রোল মডেল হিসেবে স্বীকৃতি পায়। তবে পরবর্তী সরকারগুলোর সময়ে এই কর্মসূচির মূল কাঠামো এবং নাম অনেক ক্ষেত্রে পরিবর্তিত ও পরিমার্জিত হয়েছে। বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে দাবি উঠেছে, জিয়া পরিবারের এই ঐতিহাসিক অবদানকে তার আদি মহিমায় ফিরিয়ে আনার।

বিমান বাহিনীর ঘাঁটি ও সিটি কর্পোরেশনের প্রকল্প

ঢাকার কুর্মিটোলায় অবস্থিত বিমান বাহিনীর বঙ্গবন্ধু ঘাঁটির (বিএএফ বাশার) ভেতর কিছু স্থাপনার সাথে আরাফাত রহমান কোকো’র নাম জড়িয়ে ছিল, যা মহাজোট সরকারের আমলে সরিয়ে ফেলা হয়। একইভাবে ঢাকার উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের কিছু কমিউনিটি সেন্টার বা পার্কের প্রাথমিক নকশায় বা প্রস্তাবনায় তার নাম ব্যবহারের আলোচনা থাকলেও পরবর্তীতে সেগুলো বদলে ফেলা হয়। বর্তমান সময়ে এই প্রতিটি ছোট-বড় প্রকল্পের নাম পুনরুদ্ধারের বিষয়টি প্রশাসনিক স্তরে বিবেচনার দাবি রাখছে।

আরাফাত রহমান কোকো স্পোর্টস কমপ্লেক্স: ক্রীড়াঙ্গনের স্বীকৃতি

সাভারে অবস্থিত বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের (বিকেএসপি) ভেতরে অবস্থিত আধুনিক স্পোর্টস কমপ্লেক্সটির নাম ছিল ‘আরাফাত রহমান কোকো স্পোর্টস কমপ্লেক্স’। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর প্রশাসনিক আদেশে এই নাম পরিবর্তন করা হয়। তবে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এই কমপ্লেক্সের নাম পুনরায় ‘আরাফাত রহমান কোকো স্পোর্টস কমপ্লেক্স’ করার সিদ্ধান্ত নেয়। এটি জিয়া পরিবারের সদস্যদের নামে থাকা স্থাপনাগুলোর মধ্যে অন্যতম যা ইতিমধ্যে তার আদি নাম ফিরে পেয়েছে।

বিটিভি ও বেতারে জিয়ার উপস্থিতি

বিটিভি বা বেতারের আর্কাইভ থেকে জিয়ার অনেক ভাষণ ও প্রামাণ্যচিত্র যা সরিয়ে ফেলা হয়েছিল, সেগুলো উদ্ধারের কাজ চলছে। সাধারণ মানুষের জন্য এখনো এগুলো উন্মুক্ত না হলেও, প্রশাসনিক পর্যায়ে এই ‘ইতিহাস উদ্ধারের’ প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে বলে জানা যায়।

জিয়া শিশু পার্ক

ঢাকার ফুসফুস হিসেবে পরিচিত শাহবাগের ‘জিয়া শিশু পার্ক’ ছিল বাংলাদেশের প্রথম আধুনিক বিনোদন কেন্দ্র। ২০১৮ সালে উন্নয়নের দোহাই দিয়ে এটি বন্ধ করে নাম থেকে ‘জিয়া’ শব্দটি সরিয়ে কেবল ‘শাহবাগ শিশু পার্ক’ করার প্রস্তাব নেওয়া হয়েছিল। এমনকি গত আট বছর যাবত সংস্কারের কথা বলে এই পাকর্টি বন্ধ রাখা রয়েছে। এই পার্কটি ফিরিয়ে আনার দাবি জোরালো, তবে এটি এখনো ঝুলে থাকা সিদ্ধান্তের তালিকায় রয়ে গেছে।

‘নতুন কুঁড়ি’: সুপ্ত মেধা বিকাশের নতুন সূর্যোদয়

জিয়াউর রহমানের সবচেয়ে সৃজনশীল উদ্যোগ ছিল ‘নতুন কুঁড়ি’। ১৯৭৬ সালে বিটিভিতে শুরু হওয়া এই রিয়্যালিটি শোটি ছিল দেশের শিশু-কিশোরদের মেধা অন্বেষণের প্রধান মঞ্চ। আওয়ামী লীগ আমলে এটি কার্যত বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বিশেষ আগ্রহে বিটিভি আবারও ‘নতুন কুঁড়ি’কে পূর্ণাঙ্গ রূপে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিয়েছে। এটি কেবল একটি অনুষ্ঠান নয়, বরং একটি প্রজন্মের সাংস্কৃতিক ভিত্তি হিসেবে পুনরায় মাথা তুলে দাঁড়াচ্ছে।

ভবিষ্যতের পথে জিজ্ঞাসা

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার এক সাম্প্রতিক ভাষণে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ কথা বলেছেন: “অতীত নিয়ে সবসময় পড়ে থাকলে এক চোখ অন্ধ আর অতীতকে ভুলে গেলে দুই চোখই অন্ধ। সুতরাং অতীতকে একদমই ভুলে থাকলে যেমন চলবে না, আবার অতীত নিয়ে পড়ে থাকতে গিয়ে সেটি যেন আমাদের ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাওয়ার পথে বিঘ্ন সৃষ্টির কারণ না হয়ে দাঁড়ায়।”

তারেক রহমানের এই ভারসাম্যপূর্ণ বক্তব্য এখন দেশের রাজনৈতিক মহলে বড় এক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। একদিকে জিয়া পরিবারের মুছে ফেলা নামগুলো পুনরুদ্ধারের একটি দৃশ্যমান তোড়জোড় শুরু হয়েছে, যেমনটা আমরা বিকেএসপি বা ‘নতুন কুঁড়ি’র ক্ষেত্রে দেখলাম। কিন্তু অন্যদিকে, তিনি কি অতীতের এই ‘নাম পরিবর্তনের রাজনীতি’তেই মনোনিবেশ করবেন, নাকি প্রতিহিংসার ঊর্ধ্বে উঠে কেবল দেশের বৃহত্তর উন্নয়ন ও সংস্কারের কাজেই নিজেকে নিমগ্ন রাখবেন? জিয়া শিশু পার্কের মতো ঝুলে থাকা সংস্কারের কাজগুলো কি দ্রুত পূর্ণতা পাবে, নাকি প্রশাসনিক দীর্ঘসূত্রিতার আড়ালে পড়ে থাকবে? তারেক রহমান কি জিয়া পরিবারের হারানো গৌরব পুনরুদ্ধারের সংগ্রাম আর নতুন বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্নের মধ্যে সমন্বয় করতে পারবেন? নাকি ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাওয়ার তাগিদে অতীতের এই ক্ষোভগুলোকে পেছনে ফেলে শুধুই দেশ গড়ার কাজে নিজেকে উৎসর্গ করবেন? এই প্রশ্নের উত্তর সময়ের গর্ভেই লুকিয়ে আছে।

লেখক: সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট, সারাবাংলা ডটনেট

বিজ্ঞাপন

আরো

ফারহানা নীলা - আরো পড়ুন
সম্পর্কিত খবর