Friday 17 July 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment
English

ছাত্রী নিপীড়নে তোলপাড় স্কলাস্টিকাস্, শিক্ষক গ্রেফতার

স্টাফ করেসপন্ডেন্ট
১২ জুন ২০২৪ ১৮:২৯ | আপডেট: ১২ জুন ২০২৪ ২৩:০৭

চট্টগ্রাম ব্যুরো: ছাত্রী নিপীড়নের ঘটনায় চট্টগ্রামের সেন্ট স্কলাস্টিকাস্ গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছেন। ইতোমধ্যে নিপীড়নে অভিযুক্ত দুই শিক্ষকের মধ্যে একজনকে পুলিশ গ্রেফতার করেছে।

তাদের স্থায়ী চাকরিচ্যুতি ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চেয়ে নগরীর পাথরঘাটায় বিদ্যালয়টিতে বুধবার (১২ জুন) সকাল থেকে বিক্ষোভ হয়েছে। শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা সম্মিলিত সইসহ এসব দাবি প্রতিষ্ঠানটির কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দিয়েছেন। তাদের অভিযোগ, অভিযুক্ত শিক্ষকদের যৌন নিপীড়নের ঘটনা জেনেও ব্যবস্থা না নিয়ে প্রধান শিক্ষিকা উল্টো তাদের রক্ষার চেষ্টা করেছেন।

বিজ্ঞাপন

এর আগে, মঙ্গলবার (১১ জুন) সকালে কোতোয়ালি থানায় যৌন নিপীড়নের অভিযোগ এনে দুই শিক্ষকের বিরুদ্ধে মামলা করেন ভিকটিম ছাত্রীর মা। পরে অভিযান চালিয়ে মামলায় অভিযুক্ত রকিব উদ্দিন (৩৫) নামে এক শিক্ষককে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় নগরীর বাকলিয়া এলাকা থেকে গ্রেফতার করে পুলিশ।

অভিযুক্ত অন্যজন সুরজিৎ পাল (৩৩)। এছাড়া অভিযুক্ত দুই শিক্ষককে সহযোগিতা করায় ওমর ফারুক নামে আরেক শিক্ষকেরও শাস্তি দাবি করেছেন শিক্ষার্থীরা।

বুধবার সকালে সরেজমিনে দেখা যায়, স্কুলের সামনে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা ভিড় করে আছেন। যৌন নিপীড়নকারী শিক্ষকদের শাস্তির দাবিতে গণস্বাক্ষর সংগ্রহ করছেন তারা। অভিভাবকরা স্কুলের ভেতরে ঢুকে প্রধান শিক্ষিকা শিল্পী সেলিনা কস্তার সঙ্গে দেখা করতে চাইলে তিনি দেখা করেননি। পরে ৩৪ নম্বর পাথরঘাটা ওয়ার্ডের কাউন্সিলর পুলক খাস্তগীর ও এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক গিয়ে প্রধান শিক্ষিকার সঙ্গে দেখা করেন।

জানতে চাইলে পাথরঘাটা ওয়ার্ডের কাউন্সিলর পুলক খাস্তগীর সারাবাংলাকে বলেন, ‘আইনিভাবে যা যা করা দরকার আমরা সব করছি। ভিকটিমকে আমি নিজে নিয়ে গিয়ে মামলা করিয়েছি। ওই দুই শিক্ষককে স্কুল থেকে সাসপেন্ড করা হয়েছে। মামলা করার পর এক শিক্ষক গ্রেফতার হলেও অন্য একজন এখনও পলাতক। তাকে ধরতেও পুলিশ অভিযান চালাচ্ছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘এ ঘটনায় একটি তদন্ত কমিটি হয়েছে। আজ (বুধবার) সকালে স্কুলের সামনে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা বিক্ষোভ করেছে। আমি গিয়ে তাদের বলেছি দুই নরপিশাচের জন্য এত বছরের একটি ঐতিহ্যবাহী স্কুলের সুনাম ক্ষুণ্ন হতে পারে না।’

‘সবাই যেন স্কুলের আগের পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে সহযোগিতা করে সেজন্য আহ্বান জানিয়েছি। পুলিশকে বলেছি যাতে ভিকটিম জিজ্ঞাসাবাদে কোনো ভয় না পায়। এ স্কুল তো আমাদের। স্কুলের ছাত্রীই আমার মেয়ের মতো।’

সেন্ট স্কলাস্টিকাস্ গার্লস স্কুলের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী সুষ্মিতা দে সারাবাংলাকে বলেন, ‘আমাদের স্কুলে ২০১৭ সাল থেকে এ ঘটনা ঘটে আসছে। আমরা বারবার স্কুল কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানিয়েছি। কিন্তু তারা কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। উলটো তারা অভিযুক্ত শিক্ষকদের রক্ষা করেছে, যেখানে আমাদের রক্ষা করার কথা তাদের। স্কুলের মেয়েদের নানা হুমকি দিয়ে বিষয়টি চাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে।’

‘এক শিক্ষককে এ বিষয়ে যখন তিনবার সাময়িক বরখাস্ত করা হয় সে শিক্ষক এ কাজ আবার করে। প্রধান শিক্ষিকাও আমাদের এ বিষয়ে কোনো সহযোগিতা করেনি। আমাদের দাবি, যে তিন জন শিক্ষকদের বিরুদ্ধে এ অভিযোগ উঠেছে তাদের যাতে স্কুল থেকে একেবারে বহিষ্কার করা হয়।’

দীপেন্দ্রী শর্মা নামে আরেক ছাত্রী সারাবাংলাকে বলেন, ‘আমি নবম শ্রেণি থেকে এ স্কুলে। এখন কলেজে উঠেছি। উনাদের চোখের দৃষ্টি অনেক খারাপ। মেয়েদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক যদি এরকম হয় আমরা কোথায় যাব। স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা প্রথম থেকেই তাদের রক্ষা করছে। উনারই দোষ।’

‘স্কুল কর্তৃপক্ষই যদি ভালো না থাকে মেয়েরা সেইভ ফিল কীভাবে করবে। আমরা এখানে নিরাপদ না। আমরা এটার সুষ্ঠু তদন্ত চাই। ওই স্যাররা আমাদের সঙ্গে এ কাজ আগেও করেছে। আমরা এর ভুক্তভোগী। দুই জন শিক্ষকের জন্য পুরো স্কলাসটিকাস’র নাম খারাপ করা যাবে না।’

জেসমিন পিয়া নামে এক অভিভাবক সারাবাংলাকে বলেন, ‘বাচ্চাদের নিরাপত্তাই আমাদের মূল দাবি। স্কুলের শিক্ষকরাই যদি আমাদের কোমলমতি বাচ্চাদের সঙ্গে এরকম আচরণ করে তাহলে বাচ্চারা কী শিখবে। এটা আমরা কীভাবে সহ্য করব। আর অধ্যক্ষ সব জানার পরও চুপ ছিলেন। উনি কীভাবে বিষয়টিকে ধামাচাপা দিয়ে গেল।’

‘ওই তিন শিক্ষককে তিনি কীভাবে রক্ষা করে গেলেন। রকিব উদ্দিন, সুরজিৎ পাল ও তাদের সহায়তাকারী ওমর ফারুক নামে তিন শিক্ষককে আমরা চাই না। আমরা চাই তাদের তিন জনকে পুরো বাংলাদেশে শিক্ষকতা থেকে বহিষ্কার করা হোক। তারা যাতে আর শিক্ষকতা করতে না পারে।’

এ বিষয়ে জানতে সেন্ট স্কলাসটিকাস্ গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজের প্রধান শিক্ষিকা শিল্পী সেলিন কস্তার মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও তিনি কল ধরেননি।

এদিকে, মামলার এজাহারে অভিযোগ করা হয়েছে, অভিযুক্ত শিক্ষক রাকিব চতুর্থ শ্রেণির বিজ্ঞান এবং সুরজিত পঞ্চম শ্রেণির একই বিষয়ের শিক্ষক। ভুক্তভোগী ওই শিক্ষার্থীকে প্রায় দেড় বছর ধরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে শুরু করে ক্রমাগত বিভিন্নভাবে যৌন হয়রানি ও নিপীড়ন করে আসছেন এ দুই শিক্ষক।

সর্বশেষ গত ৯ জুন সকাল ১০টার দিকে টিফিন বিরতির সময় অভিযুক্ত দুই শিক্ষক কৌশলে ভুক্তভোগী ওই ছাত্রীকে ছয় তলার বাথরুমের পাশে নিয়ে যান। সেখানেই অবাঞ্ছিতভাবে ওই ছাত্রীকে স্পর্শ করে শ্লীলতাহানি করেন। তাদের এমন আচরণে ভয় পেয়ে চিৎকার দিলে ওই ঘটনা কাউকে না জানানোর হুমকি দিয়ে কৌশলে ঘটনাস্থল থেকে চলে যান তারা। ভুক্তভোগী ছাত্রী ভয়ে বিষয়টি কাউকে জানায়নি। স্কুল ছুটির পর বাসায় এসে কান্নাকাটি শুরু করে। পরবর্তী সময়ে ছাত্রীর মা কান্নার কারণ জানতে চাইলে ঘটনার বিস্তারিত বলে।

কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ওবায়দুল হক সারাবাংলাকে বলেন, ‘মঙ্গলবার সকালে ভিকটিমের মা বাদী হয়ে থানায় মামলা করেন। এরপর অভিযান চালিয়ে আমরা এক শিক্ষককে গ্রেফতার করেছি। তাকে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। অন্য একজনকে ধরতেও আমাদের অভিযান চলছে।’

শিক্ষকদের বিরুদ্ধে এর আগেও যৌন নিপীড়নের কোনো অভিযোগ এসেছে কি না? এমন প্রশ্নে ওসি ওবায়দুল হক বলেন, ‘সব তদন্ত করা হচ্ছে। তদন্তের পর সব বলা যাবে।’

সারাবাংলা/আইসি/পিটিএম