ঢাকা: রাজধানী কাকরাইলে উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুলের বেতনের সঙ্গে টিকাটুলির লিটল জুয়েল কিংবা আর, কে মিশন রোডের স্পার্কেল, ফুলকুড়ি স্কুলের শিক্ষার্থীদের বেতন কাঠামোর যেমন কোনো মিল খুঁজে পাওয়া যাবে না, তেমনি ভর্তি ফি, পড়াশোনার ধরনেও রয়েছে বিস্তর ফাঁরাক। অভিভাবক কিংবা স্টুডেন্টদের সুবিধার তোয়াক্কা না করে নিজেদের ইচ্ছামত বেতন ঠিক করার পাশাপাশি ভর্তি ফিও নির্ধারণ করে একেকটি স্কুল। এবার এই সুযোগের দিন শেষ হচ্ছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান চালু করতে যেমন নিতে হবে একাডেমিক স্বীকৃতি এবং নিবন্ধন, তেমনি বেতন কাঠামোও নির্ধারিত হবে সরকারের নির্দেশনায়। এমন সব বিধান রেখে সংশোধন হতে যাচ্ছে ‘বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় বিধিমালা ২০১১’।
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা সচিব ফরিদ আহাম্মদ জানিয়েছেন, দেশের প্রায় ৫৭ হাজার বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে বিধিমালার আওতায় আনতে যাচ্ছে সরকার। যা এখন মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের অনুমোদনের অপেক্ষায়।
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুযায়ী, সারাদেশে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ৬৫ হাজার ৫৬৬টি। আর বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা প্রায় ৫৭ হাজার।
সূত্রমতে, বেসরকারি এ সব বিদ্যালয়ের ৯০ ভাগেরই সরকারি একাডেমিক স্বীকৃতি ও নিবন্ধন নেই। সরকারি নিবন্ধন না থাকায় এই বেসরকারি প্রাথমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর শিক্ষার্থীদের বেতন নিয়ে নানা অরাজকতার অভিযোগ রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ কাকরাইলের উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুলে পঞ্চম শ্রেণির বেতন গত জানুয়ারিতে নেওয়া হয়েছিল ৩ হাজার ৪৬০ টাকা, কিন্তু মার্চে তা বাড়িয়ে করা হয় ৩ হাজার ৬’শ ৩০ টাকা। আর মে মাসে ৬ হাজার ১৭০ টাকা নেওয়া হলেও অক্টোবরের জন্য নির্ধারণ করা আছে ৪ হাজার ৩০ টাকা। বছর বছর বেতন বৃদ্ধিই শুধুই নয়, বেশিরভাগ বেসরকারি প্রাথমিকেই এভাবে প্রতি মাসে বেতনের মাত্রা ওঠানামা করে। আবার স্কুলের মাধ্যমে বই কিনতে বাধ্য করা হয় শিক্ষার্থীদের। যা বাজারের চেয়ে দ্বিগুণ দাম নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ভর্তির মৌসুমের সময়ে বেতন ও ভর্তি ফি’তে বেশ রদবদল আনা হয়।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্কুলটির একজন শিক্ষক সারাবাংলাকে জানান, স্কুলের জনপ্রিয়তা স্টুডেন্টদের আর্থিক অবস্থা দেখে বেতন কিংবা ফি অনেক ক্ষেত্রে নির্ধারণ করা হয়। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে কম অর্থ সম্পন্ন স্টুডেন্টরা।
সরকার এই বৈষম্য দূর করে স্কুলগুলোতে শৃঙ্খলা ফেরাতে চায়। সে উদ্দেশ্যেই ২০১১ সালে এমন একটি বিধিমালা প্রণয়ন করা হয়েছিলো।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ওই বিধিমালায় নানা ধরনের প্রতিবন্ধকতা থাকায় সেটি সংশোধন করে নতুন আঙ্গিকে করা হচ্ছে। নতুন বিধিমালার মাধ্যমে এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে নিবন্ধনের আওতায় আনতে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় এরই মধ্যে খসড়া চূড়ান্ত করেছে। যা মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে পাঠানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা সচিব ফরিদ আহাম্মদ।
তিনি সারাবাংলাকে বলেন, ‘আমরা মনে করি আমাদের সরকারি বিদ্যালয়ের প্রায় কাছাকাছি সংখ্যা বেসরকারি প্রাথমিক স্কুলগুলোর। এগুলোর ওপরে একটি সমন্বিতভাবে একটি শৃঙ্খলার মধ্যে নিয়ে আসার জন্য এই বিধিমালাটি সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।’
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা সচিব আরও বলেন, ‘নতুন বিধিমালায় সরকারকে না জানিয়ে কোনো বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় বেতনভাতা ঠিক করতে পারবে না।’
নতুন বিধিমালাটি বেসরকারি প্রাথমিক ( বাংলা ও ইংরেজি) বিদ্যালয় নিবন্ধন বিধিমালা-২০১১ (সংশোধন) নামে অভিহিত হবে। এ বিধিমালা অনুযায়ী বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বেতন কাঠামো ঠিক করে দেবে সরকার। বিদ্যালয় চালুর পূর্বে সরকারের স্বীকৃতি ও নিবন্ধন করা বাধ্যবাধকতা রাখা হয়েছে। এছাড়া প্রতিটি বিদ্যালয় সংরক্ষিত তহবিল এবং একটি সাধারন তহবিল অর্থাৎ দুইটি তহবিল রাখার বাধ্যবাধকতা রাখা হয়েছে।
বিদ্যালয়ের নিবন্ধনের ক্ষেত্রে বলা হয়েছে, বেসরকারি প্রাথমিক ( বাংলা ও ইংরেজি মাধ্যম) বিদ্যালয় নিবন্ধন বিধিমালা-২০১১ ( সংশোধন) অনুযায়ী, নিবন্ধনের প্রাথমিক অনুমতির জন্য মেট্রোপলিটন ও বিভাগীয় শহরের বিদ্যালয়গুলোকে ৫ হাজার এবং জেলা শহরে ৩ হাজার এবং উপজেলা সদরসহ অন্যান্য স্থানের স্কুলগুলোকে ২ হাজার টাকা দিয়ে নির্দিষ্ট ফরমে আবেদন করতে হবে।
আবেদনের ৬০ দিনের মধ্যে সংশ্লিষ্ট বিভাগীয় উপ- পরিচালক প্রয়োজনীয় ডকুমেন্টস্ যাচাই- বাছাই করে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ে সুপারিশ পাঠাবে। সব ঠিক থাকলে মন্ত্রণালয়ের মূল্যায়ন আবেদন করা বিদ্যালয়কে ১ বছরের জন্য প্রাথমিক অনুমতি দেবে। প্রাথমিক অনুমতি পাওয়ার এক বছরের মধ্যে অস্থায়ী নিবন্ধনের জন্য আবেদন করতে হবে স্কুলগুলোকে। এক্ষেত্রে মেট্রোপলিটন ও বিভাগীয় শহরের বিদ্যালয়কে ১৫ হাজার, জেলা শহরের ১০ হাজার এবং উপজেলা সদরসহ অন্যান্য স্থানের বিদ্যালয়কে ৮ হাজার টাকা দিয়ে নির্দিষ্ট ফরমে আবেদন করতে হবে।
সংশোধিত বিধিমালায় বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপনের জন্য নিজস্ব মালিকানায় অথবা ভাড়ায় মেট্রোপলিটন এলাকার জন্য ৮ শতাংশ, পৌরসভা এলাকায় ১২ শতাংশ এবং অন্যান্য এলাকায় ৩০ শতাংশ জমি থাকতে হবে। বিদ্যালয়গুলোকে দুইটি তহবিল রাখার কথা বলা হয়েছে বিধিমালায়। একটি সংরক্ষিত এবং একটি সাধারণ তহবিল রাখতে হবে। সংরক্ষিত তহবিলের নাম হবে ‘বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় সংরক্ষিত তহবিল’। এ তহবিলে মেট্রোপলিটন এলাকার বিদ্যালয়ের জন্য এক লাখ, জেলা সদরে ৭৫ হাজার, উপজেলা সদর ও পৌরসভায় ৫০ হাজার এবং ইউনিয়ন পর্যায়ে অবস্থিত বিদ্যালয়ের জন্য ২৫ হাজার টাকা রাখতে হবে। বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা কমিটির অনুমোদন ছাড়া এ তহবিলের অর্থ ওঠানো যাবে না। আর শিক্ষার্থীদের বেতন-ভাতা, সরকারি- বেসরকারি অনুদান এবং অন্য উৎস থেকে আয়ের অর্থ সংরক্ষিত থাকবে সাধারণ তহবিলে। আর বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রতি ৩০ জন শিক্ষার্থীর জন্য একজন শিক্ষক থাকতে হবে। কোনো শ্রেণীতে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৩০ জনের বেশি হলে শাখা খোলা যাবে।
সংশোধিত বিধিমালায় প্রতিটি বিদ্যালয়ে একটি ব্যবস্থাপনা কমিটি গঠনের কথা বলা হয়েছে। বিদ্যালয় পরিচালনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করবে এই কমিটি। এছাড়া প্রত্যেক বিদ্যালয়ে একটি করে গ্রন্থাগার, বিশুদ্ধ পানি ও টয়লেটের ব্যবস্থা, ইংরেজি ভাষা ও তথ্য প্রযুক্তির ওপর গুরুত্বারোপ, চিকিৎসা, খেলাধুলা সামগ্রী, শিক্ষা সফর ও বনভোজনের ব্যবস্থা এবং জাতীয় কর্মসূচিতে বাধ্যতামূলক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে সংশোধিত নিবন্ধন বিধিমালায়।
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা সচিব ফরিদ আহাম্মদ জানান, বিধিমালাটি চূড়ান্ত করে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে পাঠানো হয়েছে। আশা করা যায়, শিগগিরই অনুমোদন মিলবে।